- দোকান নির্মাণের জন্য কাটার অপেক্ষায় রয়েছে গাছগুলো।
জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : চট্টগ্রাম নগরের টেক্সটাইল এলাকায় অর্ধশতাধিক গাছ কেটে সড়কের দুইপাশের ফুটপাতে ৪৫টি দোকান নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক); দোকানগুলোর নির্মাণকাজ এখন শেষ হওয়ার পথে।
এই সুযোগে একটি সংঘবদ্ধ চক্র আরও সেখানে ২০টি অতিরিক্ত দোকান নির্মাণ করছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাছ কেটে ফুটপাতে সবমিলিয়ে ৬৫টি দোকান নির্মাণ নিয়ে চসিকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে ফুটপাতে দোকান বরাদ্দ দেওয়া ও নির্বিচারে গাছ কাটতে কর্পোরেশনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ চসিকের একজন কাউন্সিলর। তবুও গাছ কেটে ফুটপাতে দোকান নির্মাণের কাজ থেমে নেই।
টেক্সটাইল মােড় থেকে চন্দ্রনগরমুখী সড়কের দুই পাশের ফুটপাতে যেখানে বর্তমানে দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে ২০২০ সালের ১৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজনের নির্দেশে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে দখলমুক্ত হয় ২ কিলোমিটারেরও বেশি জায়গা।
সিটি মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি উচ্ছেদ করা সেই ফুটপাতেই দোকান বরাদ্দ দেন এম রেজাউল করিম চৌধুরী।

চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে টেক্সটাইল গেটসহ উচ্ছেদকৃত বেশ কয়েকটি এলাকার ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে নতুন করে দোকান বরাদ্দের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। চসিকের প্রকৌশল বিভাগের চিহ্নিত করা এসব জায়গা এস্টেট শাখার আওতায় দোকানগুলো বরাদ্দ ও ভাড়া আদায়ের কথাও উল্লেখ করা হয় সেই চিঠিতে।
এদিকে, একুশে পত্রিকার হাতে আসে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও এস্টেট অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মাে. জসীম উদ্দিন চৌধুরী স্বাক্ষরিত দোকান বরাদ্দ সংক্রান্ত অপর একটি চিঠি। গত ২১ সেপ্টেম্বরের সেই চিঠিতে দেখা যায়, মালিকদের নিজস্ব খরচে নির্মাণের শর্তে এসব দোকান বরাদ্দের বিনিময়ে উন্নয়ন চার্জের (সেলামি) নামে বর্গফুট প্রতি ৩ হাজার টাকা করে, ৬০ বর্গফুটের জন্য ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিচ্ছে চসিক।
অস্থায়ী ভিত্তিতে বরাদ্দকৃত এসব দোকানের জন্য বর্গফুট প্রতি ১০ টাকা হারে ৬শ’ টাকা মাসিক ভাড়া নিচ্ছে সিটি কর্পোরেশন। ইতিমধ্যে দোকানদারের তালিকার কাজ শেষ হয়েছে ওই এলাকায়। শর্ত মেনে গত ৫ অক্টোবর পে-অর্ডারে মেয়র বরাবর টাকাও পরিশোধ করেছেন তালিকাভুক্তরা। যদিও যে কোনো সময় দোকানের বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছে চসিক।
অন্যদিকে, প্রায় ১ বছর আগে উচ্ছেদ অভিযান চালানাে ওই ফুটপাতের জায়গায় নতুন করে সিটি করপোরেশনের দোকান বরাদ্দ দেওয়া ও শতবর্ষী গাছ কাটা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ফুটপাতে যেকোনো ধরনের দোকানই অবৈধ। আর একারণেই ওই এলাকায় উচ্ছেদ করেছিল চসিক। কিন্তু চসিক থেকেই ফের ফুটপাতে দোকান বরাদ্দ দেওয়া ও নির্বিচারে গাছ কাটাতে কর্পোরেশনের অনুমতি দেওয়ার ঘটনায় হতবাক তারাও।

সম্প্রতি টেক্সটাইলসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে দোকান নির্মাণের কাজ তদারকিতে গিয়ে নানা অসংগতি নিয়ে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানান চসিকের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন। গাছ কাটার ও অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশন নিয়ম মেনেই কি অনুমোদন দিয়েছে, এখানে বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি কি এবং তারা কি করছে- সেটা দেখার জন্যই আমি মেয়র মহোদয়ের নির্দেশক্রমে সেখানে গিয়েছি। আমি সরেজমিনে যতটুকু দেখেছি সেখানে সামনে ৮ ফুট ফুটপাত থাকার কথা থাকলেও কোথাও তা নেই। আবার কিছু জায়গা আছে যেখানে দোকানগুলো যেনতেন ভাবে করে ফেলছে।’
গাছ কাটার বিষয়ে কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘স্থানীয়দের কাছ থেকে আমি জানতে পেরেছি, এখানে বেশকিছু গাছ ছিল। যার এখন কোন চিহ্ন-ই নেই। আমিও দেখেছি দোকানের সামনে গাছ ও পেছনে কিছু গাছ কাটা অবস্থায় আছে। পুরো বিষয়টি আমি মেয়র মহোদয়কে জানাবো।’

সরেজমিনে দেখা যায়, দু’পাশের ফুটপাতের উপর দোকান নির্মাণের কাজ চলছে। সেখানে কাজ করছে অন্তত ৫০ জন শ্রমিক। ৪৫টি দোকান করার অনুমোদন থাকলেও প্রায় ৬৫টি দোকান সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে অবকাঠামো তৈরির কাজ। এ কাজ করতে গিয়ে অর্ধশতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। বেশ কয়েকটি দোকানে দেখা গেছে ফ্লোর ঢালাই দেওয়া হয়েছে।
তড়িঘড়ি করে ফ্লোর ঢালাই করার ব্যাপারে কথা হয় কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তারা জানান, কেটে ফেলা গাছের নিচের অংশ (গোড়ালি) ঢাকতেই রাতারাতি ফ্লোর ঢালাই দেওয়া হয়েছে। আজ রোববার কাজের চাপ আরও বেশি। কারণ আরও কিছু গোড়ালি এখনও দেখা যাচ্ছে। সেগুলো জনসম্মুখে আসার আগেই ঢেকে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ সময় প্রতিবেদক দেখতে পান, বেশি কিছু গোড়ালি ঢেকে দেওয়া হয়েছে- বালু, সিমেন্ট, সিমেন্টের বস্তা, ক্রংকিট, ঢেউ টিন দিয়ে। এসব সরাতেই একের পর এক বেরিয়ে আসতে থাকে শতবর্ষী গাছ কাটার নমুনা। দোকানের পিছনে নালায় দেখা মেলে বেশ কয়েকটি গাছের মাটির নিচের অংশ। লোকচক্ষুর আড়াল করতেই সেগুলো সুকৌশলে পেছনের ড্রেনে ফেলে রেখে সংঘবদ্ধ চক্রটি। এছাড়া একটি দোকানের কাঠামোর ভেতরে এক সাথেই রয়েছে দুটি শতবর্ষীসহ মোট তিনটি গাছ। গাছকে ঘিরে দোকান নির্মাণের এমন আয়োজন দেখে বোঝা যায় অতি শীঘ্রই এ গাছগুলো কেটে সেখানে ঢালাই দেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা লেয়াকত আলী বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশন প্রথমত ফুটপাতের উপর দোকান বরাদ্দ দিয়েছে। তার উপর রাতের আঁধারে একের পর এক কাটা হচ্ছে শতবর্ষী গাছ। রাতারাতি গাছগুলো সরিয়ে ফেলেছে তারা। আর এর পেছনের মূল হোতা মো. নুরুনবী ও তোফায়েল। তাদের যোগসাজশে চলছে সবরকমের অনিয়ম। সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোন তদারকিও দেখতে পাচ্ছি না। এমনটা চলতে থাকলে বাকি গাছগুলোও সাবাড় করে ফেলবে চক্রটি।’
জানতে চাইলে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘গাছ কাটার বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। তবে এতটুকু বলতে পারি সিটি করপোরেশন কাউকে গাছ কাটার অনুমতি কিংবা অধিকার দেয়নি। বেশকিছু শর্তসাপেক্ষে শুধুমাত্র দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছি। আর যারা এখন আমাদের পে-অর্ডারে টাকা পরিশোধ করেছে শুধুমাত্র তারাই দোকান নির্মাণ করতে পারবে। আমার জানা মতে, কয়েকজন ছাড়া অন্যরা এখনও টাকা পরিশোধ করেননি।’
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বলেন, ‘বরাদ্দকৃত দোকানের বাইরে কোনো বাড়িতে দোকান করার সুযোগ নেই। যদি এমনটা হয়ে থাকে তা অন্যায়। এমন অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না। আমি আগামীকালই ওই জায়গায় গিয়ে এ বিষয়ে তদারকি করবো। যদি আসলেই গাছ কাটা হয়ে থাকে এবং চসিকের শর্ত লঙ্ঘন করা হয়, অবশ্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
এ বিষয়ে জানতে দোকান বরাদ্দ ও তদারকির দায়িত্বে থাকা চসিকের এস্টেট অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মাে. জসীম উদ্দিন চৌধুরীর মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

