‘মোনালিসা’ শিল্পকর্মের চিত্রকর কে জানেন না চবি উপ-উপাচার্য!

আবছার রাফি : বিশ্ববিখ্যাত ‘মোনালিসা’ শিল্পকর্মের চিত্রকর ইতালিয় রেনেসাঁসের কালজয়ী চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি। কিন্তু এই ‘মোনালিসা’ চিত্রকর্মটি স্প্যানিস চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো এঁকেছেন বলে এক বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) প্রফেসর বেনু কুমার দে। উপ-উপাচার্যের এমন বক্তব্যে মুখ চেপে হেসেছেন অনুষ্ঠানে আগত অন্যান্য অতিথি, চারুকলা শিল্পী-শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা।

বলাবাহুল্য, কয়েক শতাব্দি ধরে রহস্যময় হাসির কারণে সারা দুনিয়ায় আলোচনার বিষয় ‘মোনালিসা’ চিত্রকর্মটি। বহু শিল্পী, চলচ্চিত্রনির্মাতা, সংগীতশিল্পী এবং লেখকদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে লিওনার্দো ভিঞ্চির এই শিল্পকর্ম।

সারা দেশের স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বই, যে কোনো সাধারণ পরীক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের পরীক্ষা, এমন কি বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষায়ও থাকে এই অমর শিল্পকর্ম ‘মোনালিসা’ প্রসঙ্গ নিয়ে নৈর্ব্যক্তিক বর্ণনামূলক প্রশ্ন। ফলে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের কাছেই বিষয়টি কেবল মুখস্থ নয়, অনেকটা ঠোঁটস্থ বলে ধরা নেওয়া হয়।

এমন একটি সাধারণ তথ্য কিনা জানেন না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি। তার মুখ থেকে এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় শিক্ষিক-শিক্ষিত মহলে।

ঘটনাটি গত ৫ অক্টোবরের হলেও একুশের নজরে আসে সম্প্রতি। ওইদিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিল্পী রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারিতে ‘সময়-স্মৃতি-অস্তিত্ব’ শিরোনামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন উপ-উপচার্য বেনু কুমার দে। সেই বক্তব্যের পুরো ভিডিও ক্লিপ সংরক্ষিত আছে একুশে পত্রিকার কাছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ শুধুই কি চিত্রশিল্প? ভাস্কর্য, স্থাপত্য, সংগীত শিল্পের প্রতিটি আঙ্গিকই স্পর্শ করে গেছেন লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি। দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য শিল্প-চারুকলা চর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে শিল্প-চারুকলা চর্চার অন্যতম স্থান আমাদের চবি চারুকলা ইনস্টিটিটিউ। যেখানে এই শিল্পচর্চায় লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চিকে পথিকৃৎ-পুরোধা ধরা হয়, সেখানে তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়া অনভিপ্রেত, অপরিশীলিত।’

চবির এই প্রো-ভিসির এমন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য চারুকলা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করেন তারা।

অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রণব মিত্র চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন, কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মহীবুল আজিজ, চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শিল্পী কে. এম. আবদুল কাইয়ূম প্রমুখ।

সেদিন বক্তৃতায় বেনু কুমার দে আরও বলেন, ‘আমার এক বন্ধু আছে তার সাথে আমার প্রায় লেগে যেত। আমি বললাম যে দেখ, আমাদের আশপাশে কত সুন্দর সুন্দর মহিলা আছে। আমার ছোটাবেলায় মনরোর (আগে পরে কী নাম আছে) ছবি দেখে আমি হা করে তাকিয়ে থাকতাম। কিন্তু পিকাসো কী দেখে মোনালিসার ভেতরে এত বড় একটা ছবি এঁকে পুরস্কাএ পেয়ে গেছেন, বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন। এখন অভিজাত ফ্যামিলির বাসায় দেখি যে, সেই পিকাসোর ছবিটা আছে। কেন তারা কী মনরোর ছবি আঁকতে পারে নাই? তারা কী আমাদের হিরন্ময়ীর ছবি আঁকতে পারে নাই? তারা কী আমাদের ঐশ্বরিয়ার ছবি আঁকতে পারে নাই?’

তিনি বলেন, ‘আমার মামা বিয়ে করেছেন, কালো একটা মেয়ে। তো, আমাদের কারো পছন্দ হয় নাই। তো, মামার বন্ধুকে বললাম মামা মামা, আমার কী সুন্দর একটা মামি আছে। ব্যাটা, তুই ও তো ভাগিনা মামার মতো হইছস। কেন? কয়, এটা কী মামি হলো? জিজ্ঞেস কর মামাকে; তোর মামা বলছে যে, আমার দুইটা চোখ যদি খুলে তোর দুই চোখে বসিেয় দিতে পারতাম তাহলে বুঝতি ওই কালো মেয়েটা কত সুন্দর। আমার সেই অন্তরদৃষ্টি নাই। দুই বন্ধু একসাথে হেঁটে যাচ্ছি জারুল ফুল আর কৃষ্ণচূড়ার ফুলের পাশ ধরে। আমি কৃষ্ণচূড়া ফুলের প্রশংসা করছি। আর আমার বন্ধু বলছে জারুল ফুল কী সুন্দর!

আমি বলছি, কৃষ্ণচূড়া ফুল সুন্দর লাগছে না। কয়, তোমার কোনো সৌন্দর্য জ্ঞানই নেই। আমার কোনো সৌন্দর্য জ্ঞানই নেই, সে ঠিকই বলছে। আমি ক্লিওপেট্রার কোনো চুলও দেখি নাই। মোনালিসার কোনো সৌন্দর্যবোধ দেখার হয়তো যোগ্যতা নাই আমার। ওটা বোঝার মতো চোখ নাই। তাহলে আমার মতো একজন মানুষকে এই অনুষ্ঠানে আনা মানে অনুষ্ঠান পণ্ড করা না?’