বুধবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ১৩ মাঘ ১৪২৮

ব্যাংকার মোরশেদের আত্মহত্যা মামলায় ধীরগতির অভিযোগ

প্রকাশিতঃ রবিবার, নভেম্বর ২৮, ২০২১, ৫:৫১ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার ছয় মাসেও আলোচিত ব্যাংকার মোরশেদের আত্মহত্যার ঘটনার আসল রহস্য বের করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

মামলার বাদি মোরশেদের স্ত্রী ইসরাত জাহানের অভিযোগ, তদন্ত চলছে ধীরগতিতে। ইতোমধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত চার আসামির মধ্যে তিনজন হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে গেছেন। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে তদন্তকারী কর্মকর্তার দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। মামলা তুলে নিতে আসামিরা তাকে চাপ দিচ্ছেন। তাদের হুমকির মুখে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

এর আগে চলতি বছরের ৭ এপ্রিল নগরের পাঁচলাইশ থানার হিলভিউ আবাসিক এলাকার বাসায় মোরশেদ চৌধুরী আত্মহত্যা করেন। মোরশেদের আত্মহত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী ইসরাত জাহান চৌধুরী বাদি হয়ে গত ৮ এপ্রিল পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন। মামলায় মোরশেদের দুই ফুফাতো ভাই জাবেদ ইকবাল চৌধুরী, পারভেজ ইকবাল চৌধুরীসহ চারজনকে আসামি করা হয়। অজ্ঞাত আসামি করা হয় ৮জনকে। ঘটনার নেপথ্যে হুইপপুত্র শারুন চৌধুরী জড়িত মর্মে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

স্বামীর মৃত্যুর ১৭ দিন পর ২৪ এপ্রিল স্ত্রী ইশরাত জাহান ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলন করে মোরশেদের মৃত্যুর জন্য হুইপপুত্র শারুনকে দায়ী করে বলেছিলেন, বছর দেড়েক আগে চট্টগ্রামের হোটেল রেডিসন ব্লুতে মোরশেদকে দেখা করতে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন হুইপপুত্র শারুন চৌধুরী।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ইন্সপেক্টর কামরুল ইসলাম জানান, মামলার এজাহারভুক্ত চারজনের মধ্যে আসামি পারভেজ ইকবাল, জাভেদ ইকবালসহ তিনজন উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত আছে। মামলার বাদিকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি জানা নেই।

এর আগে শুরুতে মামলাটি তদন্ত করে নগরের পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। পরে নগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) মামলাটি তদন্ত করে। স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ব্যাংকার মোরশেদের স্ত্রী ইসরাত জাহান চৌধুরী। স্বামী হারিয়ে মানসিক যন্ত্রণা আর অর্থকষ্টে আছেন পাঁচলাইশ ফ্লোবেল একাডেমির শিক্ষিকা ইশরাত জাহান।

ইসরাত জাহান চৌধুরী বলেন, ‘অর্থকষ্টে এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছি। বাসার ভাড়া ২৬ হাজার টাকা। স্কুলের বেতনছাড়া আমার আর কোনো আয় নেই। স্বামীর আত্মহননে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইন্ধন ও প্ররোচনা দিয়েছেন তাদের বিচার দেখে যাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’

ইসরাতের দাবি, আসামিদের হুমকি ও চাপে আমার স্বামী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে। পিবিআইয়ের তদন্তে যেন আসল রহস্য উদঘাটিত হয়।’

জানা গেছে, আত্মহত্যার আগে মোরশেদ চার পৃষ্ঠার একটি ‘সুইসাইড’ নোট লিখে যান। তার একটি অংশে লেখা ছিল, ‘আরেকটু দেখি, আরেকটু দেখি করতে করতে দেনার গর্তটা অনেক বেশি বড় হয়ে যাচ্ছে। যারা কোনো টাকাই পেত না, তাদের দিতে গিয়ে এখন সত্যিকারের দেনায় জর্জরিত। বেঁচে থাকলে এ দেনা আরও বাড়বে। তাছাড়া পরিচিতগুলোই এখন চেপে ধরেছে বেশি। এ লোড আমি আর নিতে পারছি না, সত্যি পারছি না।’

এজাহারে বলা হয়, পারভেজ ও জাবেদ বাদির স্বামীর ফুফাতো ভাই। ব্যবসার জন্য তাদের কাছ থেকে মোরশেদ ২৫ কোটি টাকা নিয়েছিলেন। সুদসহ ৩৮ কোটি টাকা তিনি পরিশোধ করেন। আরও টাকা দাবি করে অস্ত্রের মুখে তারা ৮৪টি চেক ও ছয়টি স্ট্যাম্পে জোর কওে মোরশেদের সই নেন। টাকা প্রাপ্তি সংক্রান্ত একাধিক মুচলেকাও নেন তারা। এরপরও ২০১৯ সালে বাসায় গিয়ে তারা হুমকি দেন। এসময় সেখানে পারভেজ ও জাভেদ ছাড়া হুইপের ছেলে শারুন ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরশেদুল আলম বাচ্চু উপস্থিত ছিলেন। সবশেষ যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা শহীদুল হক রাসেল ফোন করে মোরশেদকে হুমকি দেন। মূলত এসব কারণেই শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

মামলার ১৯দিন পর আসামি পারভেজ ইকবালের প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক আরাফাত হোসেন নামে একজনকে গত ২৭ এপ্রিল গ্রেপ্তার করে ডিবি। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি মুখ খোলেননি।

তদন্ত সংস্থা পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকার মোরশেদের আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলার আসামিদের কোটি কোটি টাকার গোপন ব্যবসার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। হুইপপুত্র শারুন চৌধুরী কীভাবে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হলেন, তা অনুসন্ধান করা হবে। আত্মহত্যার আগের দিন মুঠোফোনে আলাপচারিতায় মোরশেদ যুবলীগ নেতা শহীদুল ইসলাম রাসেলকে বার বার বলতে থাকেন এক ‘কাস্টমারের’ কথা। সেই কাস্টমারের খোঁজে পিবিআই কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর কামরুল ইসলাম।

সূত্রটি জানায়, মামলার আসামি যুবলীগ নেতা রাসেল ছাড়াও হুইপপুত্র শারুন ও আরশেদুল আলম বাচ্চুর টাকা মোরশেদের মাধ্যমে শেয়ারবাজার, কলমানি, খাতুনগঞ্জভিত্তিক ডিও ব্যবসা ও গার্মেন্টসের স্টকলট ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। এ বিনিয়োগের টাকা এবং লাভের অতিরিক্ত টাকা ফেরত পেতেই মোরশেদকে ‘রাজনৈতিকভাবে চাপ’ দেওয়া হয়। আর অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরেই আত্মহননের পথ বেছে নেন মোরশেদ।

মোরশেদের আত্মহত্যার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে হুইপ সামশুল হকপুত্র শারুন চৌধুরী বলেন, আমি মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার। মোরশেদ চৌধুরীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তার কাজিন পারভেজ আমার পরিচিত। ২০১৯ সালে আরও তিন-চারজনের সাথে আমি একটা সালিশে গিয়েছিলাম। সেখানে ১০-১৫ মিনিট ছিলাম। তারপর মোরশেদকে আমি আর দেখিওনি। মোরশেদের সঙ্গে আমার কোনও আর্থিক লেনদেনও ছিল না।’