বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ৬ মাঘ ১৪২৮

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বান্দরবানের পর্যটন শিল্প

প্রকাশিতঃ রবিবার, ডিসেম্বর ৫, ২০২১, ৭:৩১ অপরাহ্ণ


রিজভী রাহাত, বান্দরবান : করোনার কারণে দীর্ঘদিন পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় ধস নামে জেলার পর্যটন খাতে। কিন্তু বিপর্যয় কাটিয়ে ধীরে ধীরে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পাহাড়ের পর্যটন শিল্প। শীত যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জন্য। শীতের আগমনে বদলাতে শুরু করেছে জনশূন্য পর্যটন স্পটগুলোর চিত্র। ভ্রমণপিপাসু মানুষদের আনাগোনা বেড়েছে দর্শনীয় স্থানগুলোতে। ধস কাটিয়ে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে চাঙ্গা হয়ে উঠছে পাহাড়ের অর্থনীতিও।

বাংলাদেশের ভূ-স্বর্গ খ্যাত পাহাড়ি জেলা বান্দরবান। পাহাড়ের স্নেহ-ছায়ায় গড়ে ওঠা এক স্বপ্নীল জনপদ। নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং এ জেলায় বসবাসকারী বাঙালিসহ ১১টি জাতি-গোষ্ঠির অকৃত্রিম জীবনাচরণ অনেকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। বান্দরবানের এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে বান্দরবানের পর্যটন স্পট নীলাচল, মেঘলা, প্রান্তিক লেক, চিম্বুক, নীলগিরি, বগালেক, নাফাকুম, দেবতাকুমসহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। শীতে কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকা বান্দরবানের পাহাড়গুলো দূর থেকে দেখে মনে হয় বরফের স্তুপ। প্রকৃতি যেন সবটুকু উজাড় করে দিয়ে পেখম মেলে বসে আছে। আর শীত মৌসুমই হলো পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের দুর্গম অঞ্চলের দর্শনীয় স্থানগুলো ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। যান্ত্রিক জীবনের নানা কর্মব্যস্ততা ভুলে প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপভোগের জন্য শীত মৌসুমে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন পর্যটন নগরী বান্দরবানে।

শীতের হিমেল পরশে সজীবতা এসেছে পাহাড়ের প্রকৃতিতে। শীত যেন পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ভ্রমণপিপাসু মানুষদের আনা-গোনা বেড়ে যাওয়ায় চাঙ্গা হয়ে উঠছে পাহাড়ের অর্থনীতিও। পাহাড়ে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবন জীবিকা।

জেলার আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হস্তশিল্পের তৈরি পণ্য, কোমর তাঁতের কাপড়সহ ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাগুলোর বেচা-বিক্রিও জমে উঠতে শুরু করেছে। পর্যটকবাহী গাড়িসহ পরিবহন ব্যবসাও অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে ক্ষতি কাটিয়ে উঠছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

হলি ডে ইন রিসোর্ট ও ইকো সেন্স রিসোর্টের মালিক জাকির হোসেন বলেন, ‘পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেয়ার পর থেকে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে। বান্দরবানে আমাদের বিজনেস আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। আশা করছি আস্তে আস্তে করোনার যে ক্ষতি হয়েছে সে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব ইনশাআল্লাহ। তবে আমাদের প্রাকৃতিক যে সৌন্দর্য্য সেটি সংরক্ষণ করা জরুরি। পরিবেশ-প্রতিবেশের যাতে কোন ক্ষতি না হয় সরকারকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘শীত মৌসুম আসলে ঝিরি-ঝর্ণা থেকে পাথর উত্তোলন শুরু হয়, গাছ কাটা শুরু হয়। এর ফলে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি হয়। দেখা যাবে একসময় রেমাক্রী, নাফাকুমের পানি শুকিয়ে গেছে। কারণ রেমাক্রী নাফাকুমের সৌন্দর্য্য দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক আসেন বান্দরবানে। তাই প্রকৃতি যদি সুরক্ষিত রাখা না যায় একসময় আর পর্যটক আসবে না।

স্বপ্ন বিলাস রিসোর্ট এর পরিচালক বিশ্বজিৎ দাশ বাপ্পা বলেন, ‘শীতের আগমনে বান্দরবানে পর্যটক বেড়েছে, যার ফলে আমাদের ব্যবসাও ভালো হচ্ছে। তবে পর্যটকদের জন্য এখানে সন্ধার পরে বিনোদনের তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। তাই তারা এখানে এসে বেশী দিন থাকতে চান না। পর্যটকদের জন্য সরকারিভাবে বিনোদনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তারা বান্দরবান এসে আরও বেশি সময় কাটাতে পারতেন।’

আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সদস্য ও ব্যবসায়ী লাল পিয়াম বম বলেন, ‘পাহাড়িদের তৈরি কোমর তাঁতের পোশাক, বাঁশ ও কাঠের তৈরির হস্তশিল্পের বিভিন্ন জিনিসপত্রের প্রধান ক্রেতা হচ্ছেন পর্যটক। বেড়াতে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকরাই এসব জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যায়। শীতের শুরুতে পর্যটকরাও আসতে শুরু করেছেন। মোটামুটি বেচা-বিক্রিও ভালো হচ্ছে। এবার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে মনে করছেন পাহাড়ের ব্যবসায়ীরা।’

বান্দরবান চাঁদের গাড়ি শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কামাল বলেন, ‘পর্যটকবাহী প্রায় তিনশ’ গাড়ি রয়েছে বান্দরবানে। গাড়িগুলোর সঙ্গে জড়িত কয়েকশ’ শ্রমিক প্রায় ছয় মাস ধরে ভীষণ কষ্টে দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু শীত পড়তে শুরু করায় পর্যটকরাও আসতে শুরু করেছেন। তাদেরও ইনকামের রাস্তা খুলে গিয়েছে।’

রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘পর্যটকের ওপর এখানকার রেস্টুরেন্টগুলো অনেকটা নির্ভরশীল। পর্যটক আসায় রেস্টুরেন্টগুলোতে আবারও বেচা-বিক্রি বেড়েছে।’

বান্দরবান আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘পাহাড়ের অর্থনৈতিক চালিকা শক্তির অন্যতম খাত হচ্ছে পর্যটন শিল্প। করোনার কারণে ধস নামে এখানকার পর্যটন শিল্পে। কিন্তু শীতের শুরুতে পর্যটকদের আনা-গোনা বাড়ায় আবারো ঘুরে দাড়াচ্ছে পর্যটন শিল্প। চাঙ্গা হয়ে উঠছে এ অঞ্চলের অর্থনীতিও।’

তিনি বলেন, ‘পর্যটন শিল্পের বিকাশে বান্দরবানে আবাসিক হোটেলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রেস্টুরেন্ট এবং হস্তে শিল্পের তৈরি পণ্য, কোমর তাঁতের কাপড়ের দোকানসহ পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। এছাড়াও সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে আধুনিক সুবিধা সম্বলিত রিসোর্ট। শুধু জেলা শহর নয় বিভিন্ন উপজেলাতেও পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে নতুন নতুন পর্যটন কেন্দ্র এবং সেগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট। একসময় শুধু বান্দরবান জেলা শহরে পর্যটকদের থাকার জন্য হোটেল ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন উপজেলাতে পর্যটকদের থাকার সুব্যবস্থা হয়েছে। এর ফলে পর্যটন খাত সম্প্রসারিত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে।’

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে জেলায় ৭০ টি আবাসিক হোটেল-মোটেলে দৈনিক পাঁচ হাজারের বেশি পর্যটক আসে। পর্যটকদের সেবায় প্রায় ১ হাজার ২৫০ জন কর্মী, পাঁচ শতাধিক ট্যুরিস্ট গাইড, পাঁচ শতাধিক গাড়ি চালক ও চালকের সহকারি এবং খাবারের দোকানের কর্মচারিদের কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। সে হিসেবে পর্যটন খাতে প্রতিদিনই কমপক্ষে অর্ধ কোটি টাকার লেনদেন হয়। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গেল অর্থ বছরে করোনার কারণে পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছিল হোটেল ব্যবসা থেকে ১৫ লক্ষ টাকা। পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেয়ার পর পর্যটকের আগমন ঘটায় চলতি বছর অক্টোবর পর্যন্ত হোটেল ব্যবসা থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩৮ লক্ষ টাকা।’

তবে শীত মৌসুমে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আরও বাড়বে বলেন জানান বান্দরবানের রাজস্ব কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, করোনায় হোটেল-মোটেল বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ভালো হয়নি। কিন্তু এখন পর্যটক আসছে। হোটেল ব্যবসায়ীদের ব্যবসাও ভালো হচ্ছে। আশা করি সরকারের রাজস্ব আদায় আরও বেশি হবে।’