ভোটের অধিকার নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলেছে, তারা শাস্তি পেয়েছে : প্রধানমন্ত্রী


ঢাকা : বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার নিয়ে অতীতে যারা ছিনিমিনি খেলেছে, তারা তাদের শাস্তি পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘মানুষই তাদের ক্ষমতা থেকে হটিয়েছে। যারা এদেশকে খুনি, যুদ্ধাপরাধী ও দুর্নীতির রাজত্ব করেছিল- তাদের স্থান বাংলার মাটিতে হবে না। জনগণের অধিকার নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না।’

মঙ্গলবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় যুক্ত হন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেন, তাদের বলব ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কী হয়েছে? সেখানে কত শতাংশ ভোট পড়েছে, মাত্র চার শতাংশ। ভোট কারচুপি করেও খালেদা জিয়া ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি। জনগণের আন্দোলনে বিতাড়িত হয়েছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও ষড়যন্ত্র করে আওয়ামী লীগকে সিটি পেতে দেয়নি। আর জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ সালের ‘হ্যাঁ-না ভোট’ সেটাতেও ‘না’ তে যে ভোট দেয়ার ক্ষমতা কারও ছিল? সবই তো ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ার ছিল। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে তারপর আবার দল গঠন করা হলো। ক্ষমতায় বসে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ঠ বিলিয়ে দল গঠন করা। সেই দলেরই নাম হচ্ছে বিএনপি।’

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে এদেশের উন্নয়নের চাকা ‘গতিশীল থাকবে’।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ভালো কাজ করলেই তার বিরুদ্ধে লেগে থাকা- এটা এক শ্রেণির মানুষের অভ্যাস। কারণ যারা এদেশের স্বাধীনতা চায়নি, যারা খুনিদের নিয়ে এবং যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে দেশ ও দেশের উন্নয়নকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে চেয়েছিল তাদের কিছু প্রেত্মাতা এখনো সমাজে আছে, রাজনৈতিক অঙ্গণে আছে। তারাই এগুলো করে বেড়াচ্ছে।’

দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার পরও এ নিয়ে অপপ্রচার চলছে বলে অভিযোগ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, ‘দয়া করে আমরা তাকে (খালেদা জিয়া) বাসায় থাকতে দিয়েছি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং সব থেকে ব্যয়বহুল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এরপরও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আর তার ছেলে (তারেক রহমান) একজন দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা এবং দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ফ্রিজিটিভ হয়ে গেছেন। বিদেশে পালিয়ে আছেন। কিন্তু ষড়যন্ত্র করছেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে।’

বিএনপির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘শুধু এখানে না বিদেশের কাছে নালিশ করে বেড়াচ্ছে, তাদের কাছে তথ্য দিচ্ছে। যেসব যুদ্ধাপরাধীর এদেশে বিচার ও সাজা হয়েছে- তাদের ছেলে-পেলে এবং যারা পলিয়ে গেছে আর সেই সঙ্গে এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে জেলে রয়েছেন, সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করছে।’

সরকারের বিরুদ্ধে যারা দুর্নীতির নানা অভিযোগ তুলেন, তাদের বিএনপি সরকারের আমলের দুর্নীতির তথ্য নিতে বলেন সরকারপ্রধান।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা আজ দুর্নীতি খোঁজেন- তাদের বলবো ২০০১ সাল থেকে কী পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে! যারা ঋণখেলাপীর কথা বলেন- তাদের বলবো জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর এলিট শ্রেণি তৈরি করার জন্য যে ঋণখেলাপি সৃষ্টি করার কালচার এদেশে তৈরি করে গেছেন- সেই খবরটা আগে নিয়ে নেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ বাংলাদেশ উন্নয়নে কোথায় কম আছে? যারা শুধু এদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আর বলেন, উন্নয়নে না-কী হাজার হাজার কোটি টাকা ধ্বংস হয়েছে! ধ্বংসই যদি হয়ে থাকে তাহলে আজ সারাদেশের মানুষ শতভাগ বিদ্যুৎ পাচ্ছে কীভাবে! ব্যাপকভাবে রাস্তাঘাট, পুল-ব্রিজ হয়েছে। স্কুল-কলেজসহ এই যে এত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হওয়া! আজ দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। করোনাভাইরাসে অনেক উন্নত ও অর্থশালী দেশও বিনা পয়সায় টিকা দেয় না। বিনা পয়সায় পরীক্ষা করে না। আমরা বিনা পয়সায় টিকা দিচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘যদি অর্থ ব্যয়ই না হবে তাহলে এত কাজ হল কীভাবে? এগুলো যারা দেখে না তাদের চোখে খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের ঠুলি পরা। এরা দেশের উন্নয়ন দেখে না। লুটে খেতে পারছে না বলেই তাদের এত জ্বালা। ওই গরিবের হাড্ডিসার, কঙ্কালসার দেখিয়ে বিদেশ থেকে অর্থ এনে খাবে আর লুটপাট করে খাবে! যেটা তারা করে গেছে, সেটাই তাদের কাছে বড় কথা।’

সমালোচকদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘তারা কী এটা উপলব্ধি করতে পারে যে অর্থনৈতিক উন্নতি যদি না হয়ে থাকে তাহলে এত বড় বাজেট আমরা কীভাবে দিয়েছি? আর কীভাবে আমরা এত উন্নয়নের কাজ করে যাচ্ছি? বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলও বলে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। আর আমাদের দেশের কিছু লোক আছে তারা তো ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে। এই ঘেউ ঘেউ তারা করতে থাকুক। এতে আমাদের কিছু আসে যায় না।’

তিনি বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন হয়েছে বলেই আজ আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। আর সেই ডিজিটাল বাংলাদেশ ব্যবহার করে আমাদের বিরুদ্ধে বদনাম করে বেড়াচ্ছে দেশে-বিদেশে। দেশের উন্নয়ন যারা সহ্য করতে পারে না- তাদের মুখেই কেবল ‘কিছুই হলো না, কিছুই হলো না’ কথা। তাদের বলব, নিজেরা আয়নায় একটু চেহারা দেখুন। আর অতীতে কী করেছেন সেটা দেখুন। আর যাদের জন্য মায়াকান্না- একটা হলো দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত, আরেকটা খুনি।’

জাতির পিতা নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম এবং বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতা আমাদের শিখিয়েছেন দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতে। তিনি বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে যে শব্দগুলো তিনি বলেছিলেন যে, তার স্বপ্ন এদেশের মানুষ অন্ন বস্ত্র ও উন্নত জীবন পাবে। সেটাই আমাদের আদর্শ। আমার লক্ষ্য জাতির পিতার সেই স্বপ্ন পূরণ করা।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এটুকু বলব, জাতির পিতা এই সংগঠন নিজের হাতে তৈরি করে দিয়ে গেছেন। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সয়ে আমরা এই সংগঠনকে আবার সুসংগঠিত করেছি। আর একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়, দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের মানুষ মর্যাদা পায়। এটাকে ধরে রাখতে হবে। আর যে উন্নয়নটা আমরা করেছি তার গতিধারাও অব্যাহত রাখতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী আমরা উদযাপন করেছি। জাতির পিতা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। সেই উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব- আজকের দিনে আমাদের সেই প্রতিজ্ঞাই নিতে হবে।’

বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ প্রান্তে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবু আহম্মেদ মন্নাফী প্রমুখ। গণভবন প্রান্ত থেকে সভা পরিচালনা করেন দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ।