বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

কুশিকাটায় স্বপ্ন বুনছেন নারীরা

প্রকাশিতঃ Tuesday, January 18, 2022, 3:27 pm


এম কে মনির, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) : সুই-সুৃঁতোর শৈল্পিক হস্তশিল্পের আরেক নাম কুশিকাটা। হাতের আঙ্গুলে সুঁতো পেঁচিয়ে সুঁই ঘুরানোর কুশিকাটা হস্তশিল্প এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। এছাড়া কুশিকাটার প্রশিক্ষণ নিয়ে বদলে যাচ্ছে নারীদের জীবনও। আত্মনির্ভরশীল ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পাশাপাশি নারীদের হাতে তৈরি কুশিকাটার নানা পণ্য আধুনিক ফ্যাশনেও যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

৭ দিনের হাতে-কলমে কুশিকাটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছেন সীতাকুণ্ডের নারীরা। ইতিমধ্যে সীতাকুণ্ড উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে ৬০ জন নারী হস্তশিল্পের কুশিকাটা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে স্বাবলম্বী হতে শুরু করেছে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রাপ্ত সনদে মিলছে সহজ শর্তে কম সুদের ঋণও।

বাজার থেকে সুঁতা আর সুঁই কিনে গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে তৈরি করছেন ফ্রক, টুপি, মোজা, জুতো, সোয়েটারসহ নানা পোশাক। শুধু পোশাকই নয় ঘর সাজাতে কুশন কাভার, টেবিল রানার, ম্যাট, ফুল, চাবির রিংসহ সৌন্দর্যবর্ধনের নানা পণ্যও তৈরি হচ্ছে। মেধা-মনন আর শৈল্পিকতায় বোনা এসব পণ্য তৈরি করে বিক্রির মাধ্যমে সংসারে বাড়তি আয় যোগ হয়ে ফিরছে স্বচ্ছলতাও। কেউ কেউ কুশিকাটায় ঘুরাচ্ছেন জীবনের চাকা।

কুশিকাটায় প্রশিক্ষিত নারীরা বলছেন, এ কাজ খুব সহজে আয়ত্ত করা ও স্বল্প পুঁজিতেই ব্যবসা শুরু করা যায়। ঘরের কাজে, রান্না-বান্নার ফাঁকে, বিছানায় শুয়ে-বসে, গাড়িতে বা যেকোন অবস্থায় এ কাজ করা যায় বলে বেশ আরামদায়কও। হাতে তৈরি এসব পণ্যের চাহিদা আছে বলে অনলাইনে ফরমায়েশও মিলছে কাঙ্খিত মাত্রায়। এতে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসাকে বড় আকার দিতে উদ্যোগি হচ্ছেন তারা।

আর হস্তশিল্পে নারীদের আরও দক্ষ হিসেবে সম্পৃক্ত করে স্বনির্ভর ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন সীতাকুণ্ডের নারী উদ্যোক্তা মুনমুন ভূঁইয়া ও আয়শা আক্তার। তাদের মধ্যে মুনমুন ভূঁইয়া অস্বচ্ছল নারীদের বাড়িতে গিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সমন্বয়ে নারীদের স্বাবলম্বী করতে সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। ঋণ গ্রহণ করে ব্যবসা শুরু করতে দিয়ে যাচ্ছেন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা-পরামর্শ। কেবল প্রশিক্ষণ নয় তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে নারীদের জানাতে আয়োজন করছেন নিয়মিত ‘তথ্য আপা’ উঠান বৈঠকও। নারীদের উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা করেছেন ট্রাই ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন। যেটি মূলত নারীদের প্রশিক্ষণের আওতায় এনে দক্ষ, স্বনির্ভর ও উপার্জনক্ষম করে গড়ে তুলতেই কাজ করছে।

আরেকজন নারী উদ্যোক্তা আয়শা আক্তার। তিনি নিজেই একজন উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি হস্তশিল্পে নারীকর্মী বাড়াতে কুশিকাটার প্রশিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করছেন জেলা ও উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে। গ্রামে গ্রামে গিয়ে শেখাচ্ছেন সুঁতোর গিঁটে কীভাবে তৈরি করতে হয় নানা রকম পণ্য। শুধু তাই নয় নতুন নারী কর্মীদের তৈরি পণ্য বিক্রিতেও কাজ করছেন তিনি। নিজেই গড়ে তুলেছেন অনলাইন কেনাকাটার প্রতিষ্ঠান “আয়শা হস্তশিল্প”। যা ভোক্তাদের বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক হয়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি উপজেলা ও চট্টগ্রাম মহানগরে অসংখ্য নারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করেছেন সফল এ নারী উদ্যোক্তা। শুধু প্রশিক্ষণ নয় নারীদের তৈরি পণ্যের অনলাইন বাজারজাতকরণ সম্পর্কেও ধারণা দেয়ার মধ্য দিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি।

নারী উন্নয়ন কর্মী মুনমুন ভূঁইয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, কোন ধর্মের কোথাও নারীকে স্বাবলম্বী হওয়ার কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। বিবি খাদিজা (রা.) একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। একমাত্র যোগ্যতা আর মানসিক দৃঢ়তাই পারে নারীকে মুক্তি এনে দিতে। কারও করুণা বা দয়ায় নয় বরং নারীকে এগিয়ে যেতে হবে তার নিজের যোগ্যতায়। প্রমাণ করতে হবে নিজেকে, যে নারী পারে। নারীদের আজকের অবস্থানও কেউ তৈরি করে দেয়নি, তাই আগামীর অবস্থানও কেউ তৈরি করে দিবে না। তাই নারীকে নিজের পথ নিজেই তৈরি করতে হবে। আমাদের দেশের পিছিয়ে পড়া নারীগোষ্ঠীকে কাজ শিখিয়ে দক্ষ সম্পদে পরিণত করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। বর্তমানে অসচ্ছল ও হতদরিদ্র নারীদের জন্য এ ধরণের কাজ খুবই সহায়ক। স্বল্প সময়ে শিখে কম পুঁজিতেই ব্যবসা করে লাভের মুখ দেখা যায়।

আয়শা হস্তশিল্পের স্বত্বাধিকারী নারী উদ্যোক্তা আয়শা আক্তার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নানা টানাপোড়েনে দিন চলছিল আমাদের। ছোটবেলা থেকেই হাতের কাজের প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ ছিল। কুশিকাটা, সেলাই মেশিনে পোশাক তৈরিসহ নানা ধরণের কাজ রপ্ত করি। একসময় এটি শখের থাকলেও এখন পেশাগত। অর্থাভাব ঘুচিয়ে সংসারের চাকা সচল করতে বেশ সহায়ক। কুশিকাটার এ কাজ এখন আমার আয়ের প্রধান মাধ্যম। যা দিয়ে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে সক্ষম হচ্ছি। আমার তৈরি পণ্য বিক্রিও হচ্ছে অনলাইনে। ঘরে বসে তৈরি আবার ঘরে বসেই বিক্রি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমার ব্যবসা চট্টগ্রামের বাইরের কয়েকটি জেলায়ও সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতিমাসে আয়ও হচ্ছে বেশ। চাহিদা অনুযায়ী অনেক সময় যোগান দেয়া সম্ভব হয়না। কারণ এ কাজে দক্ষ কর্মীর অভাব। দক্ষ কর্মী সৃষ্টি করা গেলে একসঙ্গে অনেক পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে। সম্ভব হবে সেসব বিক্রি করে অধিক আয়ও। তাই নারীদের বলব হাত কাজ শেখার মাধ্যমে স্বনির্ভর হয়ে ওঠতে। দক্ষ হয়ে ওঠলে নারীরা সমাজের বোঝা নয় সম্পদে রূপ নিবে। সেইসাথে স্বপ্ন ধরা দিবে অগোচরেই।’

সীতাকুণ্ড উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার মো. শাহ আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। হস্তশিল্পে নিয়োজিত শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ নারী, যাদের অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করার উপর দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই হস্তশিল্পকে একটি সুসংগঠিত উন্নয়ন খাত হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার হস্ত ও কারু শিল্প নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে- এ খাতের উন্নয়ন ও বিকাশে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা প্রদান। এ শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন। জাতীয় আয়ে হস্তশিল্পের অবদান রয়েছে। আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের দক্ষ করে তুলছি। সনদ ও ঋণ সুবিধা প্রদান করছি। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।’

তিনি আরও বলেন, ‘কুশিকাটার কাজ শিখে একজন প্রশিক্ষণার্থী নিজ উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করার পাশাপাশি ফ্যাশন হাউস, বায়িং হাউস ও পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুযোগ পাবেন। কাজের দক্ষতা অনুযায়ী বিদেশেও এ কাজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এছাড়াও নিজেই ফ্যাশন হাউস খুলে ব্যবসা শুরু করতে পারবেন। অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং তো আছেই। এসব প্রশিক্ষণ নারীদের স্বনির্ভরতার গল্পকে সত্যিকারে রূপ দিচ্ছে। যুব সমাজকে এগিয়ে নিচ্ছে কর্মক্ষম জীবনে। চাকরি নয় আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠতেই প্রেরণা যোগাচ্ছে।’