বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

দৈনিক করোনা টিকা দেয়ার কথা ৪০০, দিয়েছেন ১২

প্রকাশিতঃ Thursday, January 20, 2022, 10:13 pm


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : করোনা টিকা দেয়া নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য সহকারী সুমন কান্তি ঘােষের বিরুদ্ধে।

অফিস আদেশ অনুযায়ী, দৈনিক ৪০০ জনকে টিকা দেওয়ার দায়িত্ব দেয়া হয় স্বাস্থ্য সহকারী সুমন কান্তি ঘােষকে। কিন্তু গত ৬ জানুয়ারি ১৪ জন, ১০ জানুয়ারি ১২ জন ও ১৩ জানুয়ারি ২০ জনকে করোনার টিকা প্রদান করেছেন তিনি। যদিও এই ৩ দিনের জন্য টিকা বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ২০০; যার মধ্যে মাত্র ৪৬ জনকে টিকা দিয়েছেন সুমন।

স্বাস্থ্য সহকারী সুমন কান্তি ঘােষের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। দায়িত্বে অবহেলা, স্ব-প্রণোদিত হয়ে টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রাখা, সরকারি চাকুরিবিধি ও আইসিটি আইনের লঙ্ঘনসহ নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয়, অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে নিজের মর্জিমাফিক কাজ করার অভিযোগও রয়েছে সুমনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ার সুবাদের ক্ষমতাসীনদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি এসব অনিয়ম করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সুমনের এমন অপকর্ম ও অনিয়মে ‘অতিষ্ঠ’ উল্লেখ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাবেক ও বর্তমান সিভিল সার্জন বরাবর লিখিতপত্রও পাঠিয়েছেন। কিন্তু মিলেনি কোনো সুরাহা।

সর্বশেষ গত ২০ জানুয়ারি বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিয়মিত ইপিআই ও এম.আর. ক্যাম্পেইনে অসঙ্গতির বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বরাবর লিখিত অভিযোগ জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মােহাম্মদ জিল্লুর রহমান।

এতে তিনি জানান, ১৯ জানুয়ারি নির্ধারিত এলাকার মানুষকে করোনার টিকা না দিয়ে নানাভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন সুমন, এসব অভিযোগ টিকা বঞ্চিতরা জানিয়েছেন। স্বাস্থ্য সহকারী সুমন সাব ব্লকে টিকা প্রদান করেন না, উল্টো জনসাধারণকে জানিয়েছেন, সরকার সাব ব্লকে টিকা প্রদান করা যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছে।

এছাড়াও সুমন এলাকায় আইপিসি’র কাজ করেননি- এ বিষয়েও প্রমাণ পাওয়া গেছে জানিয়ে এ ব্যাপারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরােধ জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মােহাম্মদ জিল্লুর রহমান।

এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি সিভিল সার্জনের কাছে আরও একটি লিখিত অভিযোগ করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। যেখানে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই অনেকটা গায়ের জোরে উপজেলার বিআরডিবি ভবনের হল রুমে বােয়ালখালী স্বাস্থ্য সহকারী এসােসিয়েশনের নামে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন সুমন ও তার সহযোগীরা। এতে এম.আর ক্যাম্পেইন ও ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন রকম ভুল তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি উপজেলার স্বাস্থ্য বিভাগের বিরুদ্ধে বিরুপ মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ উঠে।

সুমন কান্তি ঘােষের বিরুদ্ধে এর আগেও টিকা নিয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বােয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মােহাম্মদ জিল্লুর রহমান তার এসব অনিয়মের বিষয়ে জানিয়ে তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি বরাবর পরপর তিনটি লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।

যার মধ্যে প্রথম অভিযোগটি পাঠানো হয় ২০২০ সালের ৭ এপ্রিল। অভিযোগপত্রে জানানো হয়, ইচ্ছাকৃতভাবে করােনাভাইরাসের অজুহাতে ইপিআই কাজ না করে ৫ ও ৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ভ্যাকসিন ফেরত পাঠান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য সহকারী সুমন কান্তি ঘােষসহ আরও ৩ জন। এ বিষয়ে ৭ এপ্রিল সিভিল সার্জন বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয়।

তার ঠিক একদিন পর ৯ এপ্রিল সুমনের বিরুদ্ধে সিভিল সার্জন বরাবর আরও একটি অভিযোগ পাঠান বােয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। যেখানে বলা হয়, ভ্যাকসিন ব্যবহার না করে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে মৌখিকভাবে সতর্ক করার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করে সুমন কান্তি ঘােষ টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রেখে ওয়ার্ডের জনসাধারণকে টিকাদান কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত করছেন। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধও করা হয়।

এর মাসখানেক পর ১৭ মে তার বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ করে সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ প্রেরণ করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। যেখানে উল্লেখ করা হয়, টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রাখার বিষয়ে অভিযোগের পর থেকেই সুমন ফেসবুকে উক্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে অসত্য, কুরুচিপূর্ণ ভাষায় বিভিন্ন ধরনের খারাপ মন্তব্য করেছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি চাকুরিবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।

একই দিন, স্বাস্থ্য সহকারী সুমনকে কৈফিয়ত তলব করে চিঠি পাঠানো হয়। যেখানে স্বাস্থ্য বিভাগের ডিজি এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ খারাপ মন্তব্য করে মানহানি এবং সরকারি চাকুরিবিধি ও আইসিটি আইনের লঙ্ঘন করায় সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিমালা ২০১৮ সালের এসআরও নং-১১০-আইন ২০১৮ এর ২ এর (খ) মােতাবেক কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না এর সন্তোষজনক জবাব স্মারক জারির তিন কর্মদিবসের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এত অভিযোগের পরও এর কারণ খতিয়ে দেখা কিংবা কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি সুমন কান্তি ঘােষের বিরুদ্ধে। এরমধ্যে একজন সিভিল সার্জন গেছেন, নতুন আরেকজন এসেছেন। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন স্বাস্থ্য সহকারী সুমন।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত সুমন কান্তি ঘােষ একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি টিকা দিতে না চায় তাহলে আমার কী করার আছে। আর বেশিরভাগই টিকা দিয়ে দিয়েছে। আর টিকা কার্যক্রমের পাশাপাশি আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের ওজন ও উচ্চতা পরিমাপের কাজ দেওয়া হয়েছে। যার কারণে আমরা দুপুর ১টার পর টিকা কার্যক্রম বন্ধ রেখে সেই কাজটা করি। এরপরও অভিযোগ আসলে কী করা যেতে পারে বলুন।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগের বিষয়ে আমি জানি না। আমার কাছে শুধু একটি কপি এসেছিল যেখানে আমার কৈফিয়ত তলব করা হয়েছিল। আমি এর জবাব দিয়েছি। একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আপনারা সত্যিটা খুঁজে বের করুন, শুধু অভিযোগ দিলে হবে না।’

এ প্রসঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মােহাম্মদ জিল্লুর রহমান একুশে পত্রিকাকে অসহায়ত্বের সুরে বলেন, ‘তিনি (সুমন) অফিসিয়াল কোনো নিয়মই মানছেন না। যা ইচ্ছা তাই করছেন। আমি নিজেই এর ভুক্তভোগী। আমি আমার জায়গা থেকে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে (সিভিল সার্জন) এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবহিত করে আসছি। কিন্তু কেন এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তা আমি বুঝতে পারছি না।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অফিসিয়াল বিষয়গুলোতেও যদি আপনারা হস্তক্ষেপ করেন আমরা কোথায় যাবো? আমি অফিসিয়াল কথা সবার সাথে শেয়ার করি না। এ সমস্ত বিষয়ে আপনাদের কাছে কেন বিচার যাবে? যদি অভিযোগ পেয়ে থাকেন তা আমাকে লিখিতভাবে দিন। মৌখিক কথার উপর আমি কোনো ব্যবস্থা নিই না। আর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি হয়নি তা আপনি জিল্লুর সাহেবকে জিজ্ঞেস করুন। আমার পথ আমি ঠিকই ধরেছি।’