ভেজাল ওষুধে সয়লাব বাজার

একুশে প্রতিবেদক : ওষুধের ফার্মেসিগুলোতে ভেজাল ওষুধে সয়লাব হয়ে উঠেছে। এসব নকল ওষুধ সেবন করে রোগীরা আক্রান্ত হচ্ছে জটিল ও কঠিন রোগে। অনেক সময় এসব ওষুধ সেবনের কারণে মারা যায় রোগী। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও বন্ধ করা যাচ্ছে না ভেজাল ওষুধের দৌরাত্ম্য।

খাগড়াছড়িতে কিছুদিন আগে একটি দুর্ঘটনায় আহত হন এক ব্যক্তি। মোহাম্মদ কামরুজ্জামান নামের একজন ফিজিওথেরাপিস্টের অধীনে বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কার্টিজেন ফোর্ট প্লাস নামের একটি ভারতীয় ওষুধ সেবন করার জন্য ফিজিওথেরাপিস্ট কামরুজ্জামান আমাকে প্রেসক্রিপশনে লিখে দিয়েছেন। ওষুধটি শুধুমাত্র খাগড়াছড়ি আদালত সড়কের করিম ড্রাগ হাউজে পাওয়া যায়। ৩০টি ট্যাবলেট ১২শ’ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। কিন্তু কেনার পর ওষুধ দেখে আমার সন্দেহ হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর ভারত থেকে কার্টিজেন ফোর্ট প্লাস নামের ওষুধটি কিনে আনি। তখন দেখতে পাই, খাগড়াছড়ি থেকে কেনা ওষুধ ও ভারত থেকে আনা ওষুধের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। দুইটির প্যাকেট দুই রকম, ওষুধও দুই ধরনের। ভারতীয় নাগরিকদের কাছ থেকে জেনেছি, কার্টিজেন ফোর্ট প্লাস ওষুধটি নাকি খুবই ভালো কাজ করে। এ কারণে হয়তো দেশের চিকিৎসকরাও ওষুধটি লিখছেন।’

বিদেশি নকল ওষুধ বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে করিম ড্রাগ হাউসের মালিক আব্দুল করিম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি নকল ওষুধের ব্যবসা করি না। এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয়।’

এদিকে গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে এক কোটি টাকার যৌন উত্তেজক ও শক্তিবর্ধক ভারতীয় ওষুধ জব্দ করে বিজিবি। সীমান্ত পিলার ২২০৩ এর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমতলী নামক স্থানে যৌন উত্তেজক এসব ওষুধ জব্দ করে ৪ বিজিবি ফেনী ব্যাটালিয়নের অলিনগর ক্যাম্প। উদ্ধার করা ১৩ লাখ ৫০ হাজার পিস ওষুধের বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা।

দেশে এভাবে বিদেশি অবৈধ ওষুধ চলে আসছে। বিদেশী এই অবৈধ ওষুধের প্রবেশ আদৌ বন্ধ হবে কি না তা নিয়ে রয়েছে বিস্তর সন্দেহ। তাছাড়া এই অবৈধ ওষুধ শুধু রোগীর জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে তাই নয়, একই সঙ্গে দেশীয় ওষুধ শিল্পের বাজারকেও করছে ক্ষতিগ্রস্ত। আর এসব ঘটছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের নাকের ডগার ওপর দিয়ে। গোটা দেশে ছড়িয়ে অবৈধ ওষুধ জীবনরক্ষাকারী ওষুধের নামে হাজার কোটি টাকার নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে নানা পন্থায় এসব ওষুধ আসছে। স্থানীয় পর্যায়েও ভেজাল ও মানহীন ওষুধ উৎপাদন করে নামসর্বস্ব কিছু প্রতিষ্ঠান বিদেশী মোড়কে বাজারজাত করছে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর।

ভারত, চীন, পাকিস্তান, মালায়েশিয়া থেকে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি হচ্ছে এসব ওষুধের একটি বড় অংশ। ব্যাগেজ-লাগেজে ওষুধ আনার তথ্য দিয়েছেন বিমানবন্দরে কাজ করা শুল্ক গোয়েন্দারা। এ ছাড়া সীমান্তপথে চোরাচালানের মাধ্যমে ভিনদেশী কোম্পানির ওষুধ আনার কথাও বলছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পদস্থ কর্মকর্তারা।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাজারে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ওষুধের এক-দশমাংশই নিম্নমানের। দেশের অতিলোভী একশ্রেণীর চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের সুবাদে এসব ওষুধের চাহিদা ও বিপণন ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট পৃথক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজধানীতেই প্রায় দেড় শতাধিক ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠান ভেজাল ওষুধ তৈরি ও নিষিদ্ধ ওষুধ আমদানির সঙ্গে জড়িত। খাবার স্যালাইন থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সারের ওষুধসহ সব ধরনের ওষুধই তৈরি করছে এরা। এদিকে অর্থের বিনিময়ে কিছু সংখ্যক চিকিৎসক এসব ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লেখার ফলে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রসাশনের অনুমতি ছাড়াই বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক মানের খ্যাতি ও বাজার সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেও বিদেশী ওষুধের প্রতি সাধারণ ভোক্তাদের আস্থা ও আগ্রহ বরাবরই বেশি। কিন্তু আমদানিকৃত ওষুধের বেশিরভাগই আসছে চোরাই পথে, যার অধিকাংশই ভেজাল, নকল ও নিুমানের। অধিক কার্যকর বিবেচনা করে বড় বড় ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন নিয়ে অনেক বেশি মূল্যে এসব ওষুধ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন রোগীরা। এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের ভূমিকা একেবারে নির্বিকার। তারা শুধু দু-একবার এসব ওষুধের উৎপাদন, মজুদ, বিক্রি, বিতরণ ও বিপণন স্থগিত করার বিজ্ঞাপন দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করছেন। এ ছাড়া মাঝে মধ্যে দু-একবার এর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও এসব ওষুধ বন্ধে তাদের নেই কোনো ফলপ্রসূ তদারকি কার্যক্রম।

ওষুধের মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন আমদানিকৃত জীবন রক্ষাকারী ওষুধসহ বিপুল পরিমাণ ভেজাল ও নকল ওষুধে বাজার সয়লাব হয়ে পড়ায় তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে একটি ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থাকলেও তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে। কখনো কখনো ভেজালবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভেজাল, নকল ও অবৈধ ওষুধ জব্দ হওয়ার খবর প্রকাশিত হলেও নকল ও ভেজাল ওষুধ তৈরি, বাজারজাতকরণ এবং চোরাই পথে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ প্রবেশ বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

এদিকে চট্টগ্রামে ওষুধের বাজার ঘুরে অধিকাংশ ফার্মেসিতে বিক্রয় নিষিদ্ধ ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। গত ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অনুমোদনহীন ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উদ্ধার করা হয়েছে। ওইদিন বিকেলে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) চট্টগ্রাম মেট্রো, ঔষধ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন যৌথ অভিযান চালিয়ে পাঁচলাইশ থানার বিবিরহাট এলাকার ৩ তলা একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে এসব ওষুধ উদ্ধার করে। সেখানে মোট তিনটি অবৈধ গোডাউনে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ ও পণ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। এ ঘটনায় মো. হারুন (৩২) নামে একজনকে আটক করা হয়। পরে অবৈধ ও অনুমোদনবিহীন ওষুধ মজুদ ও বিক্রয়ের অপরাধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মাদ আতিকুর রহমানের ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেন।

এদিকে ফার্মেসিতে আমদানি নিষিদ্ধ বিদেশী ওষুধ বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। এর মধ্যে গ্রাইপ ওয়াটার অন্যতম। গ্রাইপ ওয়াটার শিশুদের গ্যাসজনিত পেট ব্যথায় খাওয়ানো হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, গ্রাইপ ওয়াটারের মধ্যে অ্যালকোহল থাকার কারণেই শিশুরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘুমিয়ে পড়ে। পরে ঘুম থেকে জেগে উঠলেও তাদের মধ্যে ঝিমুনিভাব থেকেই যায়। নিষিদ্ধ ওষুধ নিমেসুলাইড সেবন করলে হাত-পায়ে পানি জমে ও কিডনি জটিলতা দেখা দেয়। ব্যথানাশক রফিকক্সিব সেবন করলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন চিকিৎকরা। বমির ওষুধ সিসাপ্রাইড সেবনে রোগীর স্নায়ুতন্ত্রে জটিলতা সৃষ্টির পাশাপাশি হৃদরোগ, কিডনিতে পানি জমা, কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দেয়। এই ওষুধ গর্ভবতী মায়েরা সেবন করলে গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকে।

হাজারীগলির একজন ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, নিষিদ্ধ এই ওষুধটি এখনও কোনো কোনো শিশু চিকিৎসক প্রেসক্রিপশনে লেখেন। তাই চাহিদা থাকায় ভারত ও পাকিস্তান থেকে চোরাইপথে প্রাইপ ওয়াটার দেশে আসছে। অবৈধ ওষুধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের বাইরে অবৈধভাবে এসব ওষুধ বাজারে আসায় একদিকে রোগীরা প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের ওষুধ শিল্প ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে অবৈধ আমদানিকারকদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, ওষুধ প্রশাসনের নির্লিপ্ততার কারণে নকল ওষুধ প্রস্তুতকারীদের বেড়েই চলেছে। এদিকে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি সূত্রে জানা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক টেট্রাসাইক্লিনের কাঁচামালের সঙ্গে বরিক এসিড, গ্লিসারিনের সঙ্গে সরবিটল, রিবোফ্লাবিন ভিটামিন বি-২ এর সঙ্গে ডাইকালার মিশিয়ে অহরহ বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া নিম্নমানের উপাদানে তৈরি ক্যানিকিড ইনজেকশন, ইনফেরন ইনজেকশন, হিমোগ্লোবিন সিরাপ, ট্রাইডাল ইনজেকশন, জেনটোসিনাস ইনজেকশন, ডাইক্লোফেনাক, বেটনোভেট, মেথারজিন ট্যাবলেট, ইনসুলিন, নিউরোবিয়ান, রেনিটিডিন, জেনটামাইসিন বাজারে বিক্রি হচ্ছে। ওষুধকে জীবন রক্ষাকারী পণ্য না ভেবে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী অন্য পণ্যের মতোই লাভজনক পণ্য হিসেবে বাণিজ্য করার লক্ষ্যে ওষুধের অনুমোদন নেয়। সরকারের তরফ থেকেও এর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

এদিকে প্রতারণার আরেক নাম ফুড সাপ্লিমেন্ট বাণিজ্য। ওষুধের নামে দেশজুড়ে চলছে ফুড সাপ্লিমেন্টের জমজমাট ব্যবসা। অত্যাধুনিক মোড়কে প্লাস্টিক বোতলভর্তি বিদেশী ফুড সাপ্লিমেন্ট আসছে বৈধ ও অবৈধ পথে। এমনকি দেশের খ্যাতনামা চিকিৎসকরাও প্রেসক্রিপশনে লিখে দিচ্ছেন ওষুধ হিসেবে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘ব্যবসা’ ও ‘রোগীদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ’ বলে মন্তব্য করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০০ সাল থেকে আমদানি হচ্ছে ফুড সাপ্লিমেন্ট। প্রথম দিকে কেবল ‘ভিটামিন’ ও ‘ক্যালসিয়ামের’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে এর পরিধি বাড়তে থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ড্রাম অথবা বস্তাভর্তি খাদ্য হিসেবে ফুড সাপ্লিমেন্ট আমদানি করা হচ্ছে। এর জন্য বিএসটিআই কিংবা ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন নিতে হয় না। দেশে এনে এগুলো ওষুধ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমদানি হয় কানাডা, ফিনল্যান্ড, চীন, কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান ও ভারত থেকে। তবে অবৈধ পথেই আসে সবচেয়ে বড় চালান। আর তা আসে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে। এর মধ্যে বেশি ওষুধ আসে ভারত থেকে।

বৈধ ও অবৈধ পথে আসা ফুড সাপ্লিমেন্টের মধ্যে আছে ফ্রেশ গোল্ড, জে-কল প্লাস, এমজি-৩ প্লাস, অ্যামিনো-১০০০, অ্যামিনো-৭৫০ থার্টিসাইজ সফটসেল, ক্যাসপো-১৫, ক্যাসপো-৩০, অ্যাপনা-১৫, অ্যাপনা-৩০, হাইলোন-৩০, হাইলোন-৬০, এক্সট্রা ফিলেক্স-৩০, ওস্টিপ্লাস-৩০, ভি মেক্স-৩০, প্রি-মাক্স-৬০, অ্যামিনো প্লাস, বোন ফুল প্লাস, গাবা এসআর, সোলারি ইত্যাদি। বাজারে ১২০ টাকার নিচে ফুড সাপ্লিমেন্টের কোনো কৌটা নেই। সর্বাধিক ২৫০০ টাকাও দাম নেয়া হয়।

এগুলো বাংলাদেশের ওষুধ নীতিমালায় ওষুধ হিসেবে স্বীকৃত না হলেও চিকিৎসকরা অহরহ তা লিখছেন। সাধারণের হয়রানি/ওষুধ মূল্যে বিস্তর তফাৎ দেশে মানসম্পন্ন একই ওষুধ থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত একটি চক্র রোগীদের বিদেশী ওষুধ ধরিয়ে দিচ্ছে, যেমন খুশি দাম রেখে আরও অসহায় অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে তাদের। বড় বড় অনেক হাসপাতাল চিকিৎসা ‘প্যাকেজের’ আওতায় রোগীকে বিদেশী ওষুধ ব্যবহার করতে বাধ্য করে।

দেখা গেছে, ওই বিদেশী ওষুধ শুধু হাসপাতালেই সরবরাহ করেছে চক্রটি, দোকানে তা পাওয়া যাচ্ছে না। রোগী বা তার পরিবার জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় খোঁজখবর না নিয়েই দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে ওষুধ কিনতে বাধ্য হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটির মূল টার্গেট থাকে জরুরি, দুরারোগ্য বা কঠিন রোগে আক্রান্ত রোগীরা। চক্রটি স্থানীয় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ওষুধের ক্ষেত্রেও ইচ্ছা মতো দাম আদায় করে থাকে। এ ক্ষেত্রে সরকারি কোনো নজরদারি না থাকায় রোগী ও তার পরিবার চিকিৎসার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়।

অন্যদিকে প্রশাসনের তালিকা মতে, নগরীর হাজারী গলিতে নকল-ভেজাল ও ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ সরকারি ওষুধ বেচাকেনার সাথে জড়িত বেশকিছু ফার্মেসির গোডাউন চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- হাজারী গলি বিজয় বিতান মার্কেটের নিচ তলায় মেসার্স শামস ফার্মেসির মালিক সুজত দাস বাবুর ৩টি গোডাউন, জিসি মার্কেটের নিচ তলায় মেসার্স অনপমা ড্রাগের মালিক জুয়েলের ২টি গোডাউন, রাজ লক্ষী মার্কেটের নিচ তলায় শান্তি ফার্মেসির মালিক শিবু প্রসাদের ১টি এবং মোহাম্মদীয় মার্কেটের নিচ তলায় ১টি গোডাউন, আজম প্লাজা মার্কেটের নিচ তলায় পপুলার মেডিকেল হলের মালিক বিক্রম দাশের ১টি গোডাউন, সূর্য মার্কেটের নিচ তলায় মুনস্টার ফার্মেসির মালিক সরুপ দাশের ওই মার্কেটের ২য় তলা ও ৩য় তলায় ২টি গোডাউন, খাজা মার্কেটের নিচ তলায় রুদ্র ফার্মেসির মালিক অলক দাশের ১টি গোডাউন, আর এস প্লাজার নিচ তলায় বিএন মেডিকোর মালিক রাজু দের ১টি গোডাউন, ছবিল কমপ্লেক্সের ২য় তলায় নূরজাহান ফার্মেসির মালিক মোহাম্মদ ইমরানের ৪টি গোডাউন, জহুর শপিং মার্কেটের নিচ তলায় মা ফাতেমা ফার্মেসির মালিক মো. শাহজাহানের ২টি গোডাউন, রশিদ মার্কেটের নিচ তলায় নিবারণ ফার্মেসির ২টি গোডাউন, মসজিদ গলির নিচ তলায় মকবুল ফার্মেসির মালিক মো. হেলালের ২টি গোডাউন, শাপলা বিতানের নিচ তলায় দ্য ইস্টার্ন ট্রেডার্সের মালিক মানিক চন্দ্র দের ১টি গোডাউন,রাজ লক্ষী মার্কেটের নিচ তলায় রাজিব ড্রাগের ১টি গোডাউন, ছবিল কমপ্লেক্সের ২য় তলায় অংকন ফার্মেসির মালিক দিলীপ সুশীলের ১টি এবং এই মার্কেটের ২য় তলায় প্যাসিফিকের ২টি গোডাউন, মোহাম্মদীয় মার্কেটের নিচ তলায় জনতা সার্জিক্যাল দোকানের উপরে গোডাউন, জহুর শপিং মার্কেটের নিচ তলায় যমুনা ফার্মেসির মালিক লিটন দাশের ২টি গোডাউন, জিসি মার্কেটের নিচ তলায় জ্যোতি ফার্মেসির ২য় তলায় গোডাউন, হার্ডিস প্রেস মার্কেটের নিচ তলায় লুনা মেডিকোর ২য় তলায় গোডাউন, একই মার্কেটের নিচ তলায় কেয়ার এন্ড কিউ দোকানের ২য় তলায় গোডাউন, রনধীন মার্কেটের ২য় তলায় ভোলা নাথ মেডিকোর মালিক তপন দাশের দোকানের উপরে গোডাউন, জহুর শপিং মার্কেটের নিচ তলায় সুজয় ফার্মেসির মালিক সুজয় দাশের ৩টি গোডাউন, খাজা মার্কেটের নিচ তলায় মেসার্স পিউ ড্রাগের মালিক সজল চৌধুরীর ১টি গোডাউন, রশিদ মার্কেটের নিচ তলায় নিউ ফেয়ারের মালিক লিটন দাশের দোকানের ভিতরে লাকেসের মাল, এবং পুরান গির্জা কমিউনিটি সেন্টারের নিচে সুমন ফার্মেসির ৩টি গোডাউন।

চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসনের সহকারি পরিচালক সালমা সিদ্দিকা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে আমরা সবসময় অভিযান পরিচালনা করেছি। হাজারী গলির সব ওষুধের দোকান কিন্তু নকল ও ভেজাল ওষুধ বিক্রির সাথে জড়িত না। এখানে অনেক ওষুধের দোকান আছে কম মূল্যে ভালো ওষুধ পাওয়া যায়। তবে কিছু দোকান রয়েছে যারা এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। তাদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ পেলেই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুহম্মদ হাসানুজ্জামান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, অনুমোদনহীন ও নকল ওষুধ যারা উৎপাদন ও বিপণন করছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময় আমরা অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করছি। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় এসব অপরাধমূলক কাজ বন্ধ করা সম্ভব।’