
মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের কারখানা। সেখানে শ্রমিকরা কখনও মরছে লোহার উত্তপ্ত লাভায় পড়ে, কখনও তরল লোহার ট্যাঙ্কে বিস্ফোরণ ঘটে, কখনো লোহার পাত পড়ে। এ কারখানায় শ্রমিকের মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। নির্মম মৃত্যুর পাশাপাশি অসংখ্য শ্রমিক আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
সবশেষ বৃহস্পতিবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে জিপিএইচ ইস্পাত কারখানার ভেতরে পরিত্যক্ত মালামাল কাটার সময় বিস্ফোরণ হলে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় রঞ্জন দাশ নামের এক শ্রমিক। নিহত রঞ্জন দাশ কুমিরা জেলেপাড়া এলাকার শ্রীমাদ দাশের ছেলে।
জিপিএইচ ইস্পাতের কারখানায় বারবার এভাবে শ্রমিকের মৃত্যু কেন ঘটছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে জিপিএইচ ইস্পাত কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার জন্য উল্টো শ্রমিকদের দায়ী করছে। তাদের দাবি, আগুনে দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় কিছু শ্রমিকের অবহেলা ও গাফিলতি আছে৷ কিছু শ্রমিক আছে যারা গরমের কারণে মাথায় সেফটি হেলমেট পড়েন না। অনেকে বুট জুতা পড়েন না।
এদিকে গত ২৭ জানুয়ারি শ্রমিক রঞ্জন দাশের মৃত্যুর ঘটনা খতিয়ে দেখতে শনিবার (২৯ জানুয়ারি) জিপিএইচ ইস্পাত কারখানার ‘রিসাইক্লিং পয়েন্ট’ পরিদর্শনে যাচ্ছেন কল-কারখানা অধিদপ্তরের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল আব্দুল্লাহ আল সাকিব। আজ শুক্রবার বিকেলে তিনি নিজেই বিষয়টি একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন।
ওই কারখানার একাধিক শ্রমিক জানায়, জিপিএইচ ইস্পাত কারখানায় ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও অনেক ঘটনাই চাপা পড়ে যায়। এ কারখানায় দগ্ধ অনেক শ্রমিক হাসপাতাল থেকেই পোড়া শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। এই কারখানায় শ্রমিকের জীবন যেন মূল্যহীন।
অভিযোগ আছে, জিপিএইচ কারখানায় একের পর এক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলেও তা নিয়ে কারও যেন ম্যাথা ব্যথা নেই। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যে সরকারি সংস্থার তাদের ঘুম যেন ভাঙছেই না। এ কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না পরিবেশ ও কারখানা অধিদপ্তর। শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানা পুলিশও দায় সারছে সাধারণ ডায়েরি লিপিবদ্ধ করে।
বারবার ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না শ্রমিকরা। কোন কোন ঘটনায় মামলা হলেও পুলিশের তদন্তে গতি থাকে না। অপরদিকে এসব ঘটনা ‘নিছক দুর্ঘটনা’ বলে দায় এড়িয়ে যায় কর্তৃপক্ষ।
এর আগে ২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর এই কারখানায় ছয় শ্রমিক দগ্ধ হয়। তারা হলেন- চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর এলাকার হাফেজ জাকির হোসেনের পুত্র মফিজুর রহমান (২৮), বাগেরহাট জেলার রামপাল থানার গাবোনিসা এলাকার ছালাম শেখের পুত্র আবু সাঈদ (৩৭) এবং সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া মুহুরীপাড়া এলাকার রবীন্দ্র দাশের পুত্র শিমুল দাশ (২৯)।
এ ঘটনা ঘটে যাওয়ার এক মাস আগে ২২ সেপ্টেম্বর একই কারখানায় লোহা গলানোর সময় সাতজন শ্রমিক দগ্ধ হন উত্তপ্ত লাভায়। তারা হলেন শাহীন আলম (২৭), টিপু সুলতান (৩২), শহীদুল ইসলাম (২৭), নুরুজ্জামান (৪০), আমীর হোসেন (২৭), রবীন্দ্র (৪০) ও ভারতীয় নাগরিক কেওয়াল সিং চৌহান (৪৬)।
২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জিপিএইচ ইস্পাত কারখানায় দুর্ঘটনার শিকার হন আরিফ নামের এক শ্রমিক। কারখানার গলিত লোহায় প্রায় পুরো শরীর ঝলসে যায় তার। আরিফ মুন্সিগঞ্জের ক্ষির মন্দির এলাকার আল আমিন সওদাগরের ছেলে।
এরপর ২০ দিনের মাথায় ২৯ সেপ্টেম্বর ঘটে আরও দুটি দুর্ঘটনা। জিপিএইচ ইস্পাতের কারখানায় কাজ করার সময় পীযূষ দে (২৪) ও শফিউল বাশার (২৮) নামের দুজন মারাত্মক আহত হন। অন্যদিকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মো. নাজিম (২৫) নামে আরেক শ্রমিকও আহত হন। পীযূষ দে মৌলভীবাজার একা মধু থানা রাজনগরের ধীরন্দ দের পুত্র। শফিউল বাশার কুমিল্লা জেলার ছোট বারেরা থানা বরুড়া এলাকার নজরুল ইসলাম এর পুত্র ও মো. নাজিম সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া এলাকার আবুল বাশারের ছেলে।
এর আগে ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট জিপিএইচ ইস্পাতের কারখানায় ফার্নেস চুলার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে কারখানার সুপারভাইজারসহ সাতজন শ্রমিক গুরুতর আহত হন। এর মধ্যে তিনজনের অবস্থা ছিল গুরুতর। ওই সময় অগ্নিদগ্ধরা হলেন- কুড়িগ্রাম পুরাতন স্টেশন এলাকার শংকর কুমার রায়ের ছেলে জয়ন্ত কুমার রায় (৩৬), চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড কুমিরা মসজিদ্দা এলাকার মৃত অনু মিয়ার ছেলে আলী আশরাফ (৪১), ফটিকছড়ি নারায়ণহাট পাকানিয়া এলাকার সুলতান আহম্মদের ছেলে মো. আবু তৈয়ব (২৫), কুমিল্লা লাঙ্গলকোট হেয়াপোরা এলাকার মৃত আনিসুল হকের ছেলে সুপারভাইজার মো. শাহজাহান (৫২), গাইবান্দা পশ্চিম গুপ্ততলা এলাকার মো. আব্বাস আলীর ছেলে মো. রাসেল (২১)। বাকি দুজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
জিপিএইচ ইস্পাত কারখানায় বারবার দুর্ঘটনায় শ্রমিক মৃত্যুর কারণ গভীরে গিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোন অনুসন্ধান হয় কিনা, জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ আজ শুক্রবার বিকালে একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি সীতাকুণ্ড থানার দায়িত্ব নিয়েছি এক বছর আগে। এই এক বছরে জিপিএইচ ইস্পাত কারখানায় গতকালের দুর্ঘটনায় এক শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনাটি প্রথম। তবে আমার জানামতে জিপিএইচ ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই কাজ করছে। তবু গতকালের ঘটনায় যেহেতু মামলা হয়েছে সেহেতু বিষয়টির গভীরে গিয়ে তদন্ত করে দেখা হবে। জিপিএইচ ইস্পাত কারখানায় শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা পুলিশের তদন্ত রহস্যজনক কারণে চাপা পড়ে যাওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।’
এদিকে জিপিএইচ ইস্পাত কারখানায় দুর্ঘটনায় বারবার কেন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটছে তা খতিয়ে দেখতে শনিবার ওই কারখানার রিসাইক্লিং পয়েন্ট পরিদশনে যাওয়ার কথা আজ বিকালে একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন কল-কারখানা অধিদপ্তরের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল আব্দুল্লাহ আল সাকিব। তিনি বলেন, ‘গতকাল বৃহস্পতিবার ওই কারখানায় শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা প্রাথমিক তদন্ত করেছে আমাদের একটি টিম। শিগগিরই আমরা শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করতে জিপিএইচকে আমরা চিঠি দেব। তাদের কোন গাফিলতি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযেগের বিষয়ে জানতে চাইলে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলমাস শিমুল আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখার জন্য আলাদা একটি ইউনিট আছে। চট্টগ্রামে অন্যান্য ইস্পাত কারখানায়ও দুর্ঘটনায় শ্রমিক হতাহত হয়। বিএসআরএম, আরএসআরএম, বায়েজিদ স্টিল এর মতো চার দেয়ালে ঘেরা ইস্পাত কারখানায় প্রায় সময় দুর্ঘটনায় শ্রমিক হতাহতের ঘটনা ঘটে। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি উপকূলের উন্মুক্ত এলাকায়। ফলে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে সাংবাদিকরা সহজেই তথ্য পেয়ে যান। ৪০০ শ্রমিকের ইস্পাত কারখানা আর ৮ হাজার শ্রমিকের ইস্পাত কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটার পরিমাণ এক নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এতবড় একটা প্রতিষ্ঠান যেখানে কোন দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেদিকে কড়া দৃষ্টি রাখা হয়। তবু কিছু শ্রমিকের অবহেলা ও গাফিলতি আছে৷ কিছু শ্রমিক আছে যারা গরমের কারণে মাথায় সেফটি হেলমেট পড়েন না। অনেকে বুট জুতা পড়েন না। আমাদের নজরে এলে সঙ্গে সঙ্গে সেফটি রুল মেনে চলতে বাধ্য করি। বিশ্বের এমন কোন দেশ নেই যে যেখানে শ্রমিক দুর্ঘটনা ঘটে না। আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন লাখ লাখ টন ইস্পাত উৎপাদন হয়।’
‘জিপিএইচের মতো বড় কারখানায় দুর্ঘটনা যে ঘটবে না এর নিশ্চয়তা কেউ কি দিতে পারে? তবু আমাদের আন্তরিক চেষ্টা থাকে হতাহতের শিকার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার, তাদের এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াবার।’
