
একুশে প্রতিবেদক : বহুল আলোচিত মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যতম আসামি বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এখন কারাগারের কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। এমন পুলিশ কর্মকর্তার সাজা পাওয়ার ঘটনায় আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে, যে টেকনাফে ‘ক্রসফায়ার’ বাণিজ্য করে যাদের জন্য এত বিত্ত-বৈভব গড়েছেন সেই স্ত্রী-পুত্র, স্বজনরা আজ কোথায়? শুধু টেকনাফ নয়, এর আগে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় দায়িত্বপালনকালে জমি দখল, বিধবাকে মারধর, ইয়াবা দিয়ে যুবককে ফাঁসানো, শিল্পপতিকে হয়রানিসহ প্রদীপের বিরুদ্ধে আছে নানা অপকর্মের অভিযোগ। টেকনাফের মতো চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুরেও ছিল প্রদীপের ‘জলসাঘর’।
ভাইবোনের দ্বন্দ্ব ‘সাজানো’ নাটক
প্রদীপের মায়ের নাম যুগল রাণী প্রজাপতি। তার প্রথম স্বামীর নাম প্রেম লাল প্রজাপতি। ১৯৫৭ সালে তিনি মারা যান। তার প্রথম স্বামীর সংসারে এক মেয়ে। যার নাম রত্না বালা প্রজাপতি। এ রত্না বালা চাকরি করতেন চট্টগ্রাম ওয়াসায়। কিন্তু ওয়াসার সংস্থাপন শাখা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) অনুসারে তার নাম রত্না প্রভা প্রজাপতি। তার স্বামীর নাম রঞ্জিত চৌধুরী। স্বামীকে নিয়ে তিনি থাকতেন চট্টগ্রাম ওয়াসা এলাকার তোলা পুকুর লেইনে। তার একমাত্র ছেলের নাম সুমন চৌধুরী।
প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর বোয়ালখালীর বাসিন্দা হরেন্দ্র লাল দাশকে বিয়ে করেন প্রদীপের মা যুগল রাণী প্রজাপতি। কিন্তু দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করার আগে যুগল রাণী নগরের মুরাদপুরে প্রেম লালের সব সম্পত্তি বিভিন্ন জনের কাছে বিক্রি করে দেন। পশ্চিম ষোলশহর মৌজার বিএস ১৫১৩০ দাগের জমি খতিয়ানে লিপিবদ্ধ আছে যুগল রাণী প্রজাপতির প্রথম সংসারের মেয়ে রত্না বালা প্রজাপতির নাম।
প্রদীপের সাথে তার বোন রত্না বালা প্রজাপতির দ্বন্দ্বের বিষয়টি সাজানো নাটক বলে মন্তব্য করেছেন কেএম আলী আকবর; অবৈধভাবে জায়গা দখলের প্রতিবাদ করায় কে এম আলী আকবরকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়ে ওসি প্রদীপ ৯ মাস জেল খাটিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। কেএম আলী আকবর জানান, যুগল রাণী প্রজাপতি দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের আগে মুরাদপুরে স্বামী প্রেম লাল প্রজাপতির মালিকানাধীন এক একর সম্পত্তি বিক্রি করে বোয়ালখালী চলে যান। দেশ স্বাধীনের পর ওই সম্পত্তি ভুলভাবে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ‘খ’ তফসিলভুক্ত হয়ে যায়।
মুরাদপুরের জায়গা দখলে নিতে ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে আঁতাত
বিএস খতিয়ানে প্রদীপের সৎবোন রত্না বালা প্রজাপতির নাম লিপিবদ্ধ থাকার সুবাদে মা যুগল রাণী প্রজাপতির বিক্রি করা সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া হয়ে উঠেন রত্না। ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন বিভাগের ওসি পদে থাকাকালীন সৎভাই প্রদীপের সঙ্গে হাত মেলান রত্না। মায়ের বিক্রি করা সম্পত্তি উদ্ধার করতে ২০১৪ সালে ৭ নং পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর ইকবাল হোসেনের কাছ থেকে জন্মনিবন্ধন এবং ওয়ারিশ সনদ নেন রত্না বালা প্রজাপতি।
মুরাদপুরের ১৭ গন্ডা সম্পত্তি উদ্ধারের পর নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিতে সৎবোন রত্মার সাথে চুক্তিবদ্ধ হন প্রদীপ। কথা ছিল জোরপূর্বক উদ্ধার করে দিতে পারলে সেখান থেকে ছয় গন্ডা জায়গা প্রদীপকে দেওয়া হবে, বাকি ১১ গন্ডা নিজের দখলে রাখবেন রত্না। জায়গা দখলে নিতে মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার সঙ্গে আঁতাত করেন প্রদীপ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাতে পাঁচ শতাধিক ক্যাডার এবং পুলিশ দিয়ে জোরপূর্বক মুরাদপুরের ১৭ গন্ডা জায়গাটি দখল করেন প্রদীপ। অভিযোগ আছে, জায়গা দখলে লোক জোগাড় থেকে শুরু করে নানাভাবে প্রদীপকে সহযোগিতা করেছিলেন তার অন্যতম সহযোগী কনস্টেবল সাগর দেব ও মিঠুন ভৌমিক।
প্রদীপের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশের ওসির জিডি
২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরে ওই ঘটনায় প্রদীপের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানার তৎকালীন ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ থানায় জিডি করেন। সেখানে বলা হয়, ‘বহিরাগতদের নিয়ে একজন পুলিশ পরিদর্শক (প্রদীপ) জায়গা দখল করায় পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে।’ পরে এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও প্রতিবেদন দেন ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ।
ভুক্তভোগী কেএম আলী আকবরের দাবি, ক্রয়সূত্রে মুরাদপুরের ওই ১৭ গন্ডা জায়গার মালিক জনৈক ফরিদ আহমদ, মহিউদ্দিন চৌধুরী, নেছার আহমেদ সওদাগর ও নাছির চৌধুরী। ওই জায়গায় বর্তমানে চারতলা ভবন আছে। ভবনটিতে ‘ফরিদ ম্যানশন’ নামের একটি সাইনবোর্ড আছে। ক্রয়সূত্রে চারতলা ভবনের মালিক মনোয়ারা বেগম নামে এক নারী।
কেএম আলী আকবর জানান, ১৭ গন্ডা জায়গাটি প্রদীপের দখলমুক্ত করতে তিন বছর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকেন মনোয়ারা বেগম। অবশেষে প্রদীপ ও তার বোনের কব্জা থেকে জায়গাটি পুনরুদ্ধার করতে ২০১৭ সালে তাকে (কেএম আলী আকবর) প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন মনোয়ারা।
যুগল রাণী প্রজাপতি কাছ থেকে ১৭ গন্ডা সম্পত্তির ক্রেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ‘খ’ তফসিল থেকে সেসব সম্পত্তি বাদ দেয়া হয়। এরপর হাল ছেড়ে দেন প্রদীপ। এদিকে প্রদীপ কর্তৃক জায়গা দখলের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের সিকিউরিটি সেলসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন আলী আকবর। বিষয়টি জেনে আলী আকবরের ওপর প্রচণ্ড ক্ষেপে যান প্রদীপ।
এদিকে আইনি পথ ধরে ফরিদ ম্যানশনের দুটি ছাড়া বাকি সব ফ্ল্যাট দখলে নেন আলী আকবর। কারণ ওই দুটি ফ্ল্যাটের দখলে ছিলেন প্রদীপের বোন রত্না বালা প্রজাপতি।
প্রদীপের ‘ভুল’ স্বীকার কৌশল
আলী আকবরের দাবি, মনোয়ারা বেগমের প্রতিনিধি হিসাবে চার ভবনের প্রায় সবকটি ফ্ল্যাট দখলে নেয়ায় তার বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন মহলে মিথ্যা অভিযোগ দেন রত্না। ফটোশপের মাধ্যমে নারীর সাথে আকরের আপত্তিকর অবস্থার ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেন রত্না। জোরপূর্বক জায়গা দখলের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জেনে যাওয়ায় অবস্থা বেগতিক হয় প্রদীপের। এক পর্যায়ে আকবরের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দেন প্রদীপ। এতে মধ্যস্থতা করেছিলেন মিলন শর্মা নামের এক ব্যক্তি।
পূর্বকোণ পত্রিকা অফিস সংলগ্ন এলাকায় মিলন শর্মার বাসায় ২০১৭ সালের মে মাসে বৈঠকে বসেন আকবর ও প্রদীপ। শুধু খতিয়ানে বোনের নাম লিপিবদ্ধ থাকার সুবাদে মুরাদপুরের ১৭ গন্ডা জায়গা দখল করা ‘অন্যায়’ হয়েছে বলে বৈঠকে আকবরের কাছে স্বীকার করেন প্রদীপ। আকবরের দাবি, মূলত তাকে ফাঁসাতেই প্রদীপের ‘অন্যায় স্বীকার’ একটি কৌশল ছিল।
এদিকে মুরাদপুরের চারতলা ভবনটি পুনরুদ্ধারে প্রদীপ ‘হাল ছেড়ে’ দিলে ২০১৮ সালে পুনরায় সেটি দখলে নেয়ার চেষ্টা করেন রত্নার ছেলে প্রদীপের ভাগিনা সুমন। ভবনটি দখলে নিতে গিয়ে নিলুফার আক্তার নামে এক গৃহকর্মীকে শ্লীলতাহানি এবং মারধর করেন সুমন ও তার কিছু সহযোগী। এ ঘটনায় সুমনসহ আরও দুইজনকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ধারায় আদালতে সিআর মামলা (৪৭২/১৮) দায়ের করেন ভুক্তভোগী নিলুফার। আলী আকবরের দাবি, মায়ের সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলের প্রতিবাদ করায় মামা প্রদীপই ভাগিনা সুমনকে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলায় জড়িয়েছেন বলে যে অভিযোগ সেটি পুরোপুরি মিথ্যা। মূলত সুমনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিলেন ভুক্তভোগী নিলুফার। মামলাটি এখন বিচারাধীন।
‘চারতলা ভবন দখলে নারীর সাথে হাত মেলান প্রদীপ
২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে মনোয়ারার প্রতিনিধি আলী আকবরকে মুচলেখা দিয়ে ফরিদ ম্যানশনের দুটি ফ্ল্যাটের দখল ছেড়ে দেন রত্না বালা প্রজাপতি। নন জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করলেও পরে তা অস্বীকার করে আকবরের বিরুদ্ধে আদালত এবং পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন রত্না ও তার মেয়ে বেবী চৌধুরী। আদালতের আদেশে থানায় দায়ের করা মামলাটি চলমান থাকে। সিআইডি’র তদন্তে আলী আকবরের বিরুদ্ধে আনা জালিয়াতির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি আকবরের। অবশ্য এর আগে ভাড়া আদায়ের জন্য রত্নার বিরুদ্ধে আদালতে অপর একটি মামলা দায়ের করেন আকবর। এবার চুক্তি ভঙ্গ করে ফরিদ ম্যানশন থেকে আকবরকে উচ্ছেদ করতে প্রদীপের সাথে হাত মেলান মনোয়ারা বেগম, তার ছেলে ও মেয়ে জামাই। আলী আকবরের অভিযোগ, প্রদীপ ও মনোয়ারা মিলে ভবনসহ জায়গাটা পুনরায় দখলের পরিকল্পনা করেন। ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে দখলযজ্ঞ চালায় তারা। নেপথ্যের ভূমিকায় ছিলেন প্রদীপ। দখলকাণ্ডের আগেরদিন আলী আকবর পাঁচলাইশ থানায় জিডি করে রাখায় প্রদীপের পরিকল্পনা ফের ভেস্তে যায়।
আকবরের বিরুদ্ধে ‘ফিটিং’ মামলা
মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর মামলাকে পুলিশের ভাষায় ফিটিং মামলা বলা হয়। আকবরের অভিযোগ, ২০১৯ সালের শেষের দিকে অক্সিজেন নয়াবাজার এলাকায় এক ব্যক্তির জায়গা দখলকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোন ‘অ্যাকশনে’ যাবে না মর্মে মোটা অংকের বিনিময়ে ‘চুক্তি’ করেছিলেন বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশের তৎকালীন এক কর্মকর্তা। কিন্তু তার (আলী আকবর) কারণে জায়গা দখলে ব্যর্থ হয় নয়াবাজার এলাকার একটি চক্র। এ কারণে আকবরের ওপর চরম ক্ষেপে যান টেকনাফ থানা থেকে বদলি হয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় আসা পুলিশের ওই কর্মকর্তা। অন্যদিকে মুরাদপুরে চারতলা ভবনের জায়গা দখলের সব চেষ্টা বিফলে যাওয়ায় আকবরকে ফাঁসাতে নানা ফন্দি করতে থাকেন প্রদীপও। প্রদীপ তখন টেকনাফ থানার ওসি। দুজনে মিলে আকবরকে ফাঁসাতে এক নারীকে দিয়ে ফাঁদ পাতেন প্রদীপ এবং ওই পুলিশ কর্মকর্তা। বায়েজিদের টেক্সটাইল এলাকায় বসবাসরত ওই নারী তার স্বামী কর্তৃক চরম ‘নির্যাতনের’ শিকার হচ্ছেন বলে একদিন আকবরের কাছে সাহায্য চান। একদিন সন্ধ্যার পর ওই নারী আকবরকে তার বাসায় ডেকে পাঠান। সেখানে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকে পুলিশ। নারীর বাসায় যাওয়ার পর অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার অভিযোগে আকবরকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরদিন ৩ হাজার ২০০ ইয়াবা দিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আকবরকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ। মাদকের মামলায় ৯ মাস পর জামিনে মুক্তি পান আকবর। ‘চক্রান্ত করে আমার বিরুদ্ধে ফিটিং মামলা দিয়েছিলেন প্রদীপ। ওই মামলা এখন বিচারাধীন’ বলেন আকবর।
মুরাদপুরে প্রদীপের ‘জলসা ঘর’
২০১৪ সালে চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুরে ‘ফরিদ ম্যানশন’ নামের চারতলা ভবনটির পাশাপাশি ১ নং রেল গেইট এলাকায় মায়ের বিক্রি করা প্রথম স্বামী প্রেম লাল প্রজাপতির আরও কিছু সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলে নিয়েছিলেন প্রদীপ। নেছার আহমদ সওদাগর মসজিদের পশ্চিম পাশে বিএস জরিপের ১৫০০৪ দাগের জায়গাটি দখলে নিয়ে সেটিকে ‘জলসা ঘর’ বানান প্রদীপ। স্থানীয়রা জানান, প্রায় সময় সন্ধ্যার পর ‘জলসা ঘরে’ মদ, জুয়া ও নারীর আসর বসাতেন প্রদীপ। তখন প্রদীপ ছিলেন চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন বিভাগের ওসি। প্রদীপের ওই জলসা ঘর দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন স্থানীয় তপু ও নবী নামের দুই যুবক। গত শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদের পশ্চিম পাশে অবস্থিত জায়গাটির চারপাশে সীমানা দেয়াল। ভেতরে টিনশেড সেমিপাকা তিন-চারটি ঘর। স্থানীয়রা জানান, ওই বাড়িতে বৃদ্ধ এক নারী বসবাস করেন। তার সাথে কথা বলতে মূল ফটকে এই প্রতিবেদক একাধিকবার নক করলেও ভেতর থেকে কেউ আসেননি।
প্রদীপের ‘ছায়াসঙ্গী’
শুধু কক্সবাজার নয়, চট্টগ্রামে কর্মরত থাকাকালে যেসব পুলিশ সদস্য তার ‘ছায়াসঙ্গী’ ছিলেন তারাও আজ নেই তার পাশে। অথচ চাকরি, পদ-পদবি পাইয়ে দিতে তাদের জন্য প্রদীপ ওপর মহলে কত দেন-দরবার করেছিলেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চট্টগ্রামে বিভিন্ন থানায় কর্মরত থাকাকালে নানা অপকর্মের জন্ম দেন প্রদীপ। টেকনাফের মতো চট্টগ্রামেও তার ছিল নিজস্ব ‘বলয়’। তিনি যেখানে যেতেন সেখানেই তার ‘সঙ্গীদের’ পোস্টিং বাগিয়ে নিতেন। ভুক্তভোগী আলী আকবর অভিযোগ করে বলেন, ‘পাঁচলাইশ, বায়েজিদ থানা ও নগর ডিবি পুলিশে দায়িত্বপালনকালে কনস্টেবল সাগর দেব, মিঠুন বড়ুয়া ছাড়াও প্রদীপের ‘ছায়াসঙ্গী’ ছিলেন কনস্টেবল মহিম, কনস্টেবল অভি চৌধুরী, এসআই দীপক বিশ্বাস ও এসআই অসীম। তার (প্রদীপ) আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব পুলিশ সদস্যরাও দাপিয়ে বেড়াতেন।
বাদ যায়নি বিধবার জমিও
২০০৪ সালে নগর পুলিশের কোতোয়ালী থানার সেকেন্ড অফিসার ছিলেন প্রদীপ। সে সময় পাথরঘাটায় এক হিন্দু বিধবা নারীর জমি দখলের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হন তিনি। নানা ঘটনায় বিতর্কিত হলেও ঔদ্ধত্য কখনো থেমে থাকেনি তার। বরখাস্ত হওয়ার আগে তার হাতে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্থরা প্রতিবাদ করার সাহসও করেননি। ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হরতাল চলাকালে এক যুবককে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করার ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে আলোচিত-সমালোচিত হন প্রদীপ। বাদুরতলা এলাকায় এক বয়োবৃদ্ধাকে পিটিয়ে জখম করে বেশ সমালোচিতও হয়েছিলেন প্রদীপ।
২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি মামলায় রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা করায় এক আইনজীবীকে লালদীঘির পাড় থেকে ধরে নিয়ে থানায় আটকে রাতভর নির্যাতন চালান প্রদীপ। ওই আইনজীবী ২৯ জানুয়ারি আদালতে ওসি প্রদীপসহ ৮ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন। জানা গেছে, ২০২০ সালের ৬ আগস্ট কারাগারে যাওয়ার পর ২৮ দিনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে প্রদীপের বিরুদ্ধে হত্যাসহ নানা অভিযোগে মামলা হয়েছে অন্তত ১২টি।
স্বামী গুনছেন মৃত্যুর প্রহর, দুঃসময়ে পাশে নেই স্ত্রী চুমকি
স্বামী কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে মৃত্যুরপ্রহর গুনলেও হদিস নেই তার স্ত্রী চুমকি কারণ ও তার সন্তানদের। প্রায় চার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি চুমকি। এ মামলায় দ্বিতীয় আসামি প্রদীপ। ঘটনার পরপরই আত্মগোপনে চলে যান চুমকি। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রদীপের যাবতীয় সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে আছে।’
‘লক্ষীকুঞ্জ’ আছে ‘লক্ষী’ নেই
চট্টগ্রামের পাথরঘাটার গির্জা থেকে কয়েক’শ গজ দূরে সেন্ট প্লাসিডস স্কুল। অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে প্রদীপের মালিকানাধীন ‘লক্ষীকুঞ্জ’ ভবনটি। মেজর (অব.) সিনহা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর থেকে প্রদীপ দাশের এ বাড়িতে সুনসান নিরবতা বিরাজ করছে। সিনহা হত্যা মামলায় কারাবন্দি হওয়ার পর থেকে প্রদীপকে কারাগারে বা আদালতে দেখতে যাননি তার স্ত্রী-সন্তানরা। ‘লক্ষীকুঞ্জে’ ভাড়াটিয়া ছাড়া কেউ থাকেন না। টেকনাফ থানার ওসি থাকাকালে মাঝেমধ্যে এ ভবনে আসতেন প্রদীপ।
প্রদীপের ভাগিনার অভিযোগ
প্রদীপের বড় বোন রত্না বালা প্রজাপতির ছেলে রঞ্জন চৌধুরী ওরফে সুমন চৌধুরীর দাবি, প্রদীপ তার মায়ের সৎভাই। মুরাদপুর এলাকায় তার মায়ের সূত্রে পাওয়া ৩২ শতাংশ জায়গা অর্পিত সম্পত্তি আইনে চলে যায়। জায়গাগুলো উদ্ধার করে দিলে তার মামাকে (প্রদীপ) ছয় গন্ডা জায়গা দেওয়া হবে। কিন্তু উদ্ধারের পর জায়গা রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে প্রদীপ নিজে ২৪ শতাংশ এবং অন্য এক ব্যক্তির মাধ্যমে আরও ৬ শতাংশ জমি দখল করেন। ঘটনার সময় প্রদীপ শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পুলিশের অভিবাসন শাখায় পরিদর্শক ছিলেন।
সুমনের অভিযোগ করেন, তার মায়ের পশ্চিম ষোলশহর এলাকার জায়গাটি আত্মসাতের জন্য তার মামা প্রদীপ এক নারীকে দিয়ে তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলা করিয়েছেন। এ মামলায় তাঁকে ১৬ দিন কারাবাস করতে হয়েছে এবং এখনো আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। ওই নারীকে তিনি চেনেন না। নির্দোষ প্রমাণিত হলে ওই নারী ও প্রদীপের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে জানান সুমন। প্রদীপের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগ দিয়েছেন তার সৎবোন রত্না বালা প্রজাপতি।
তার মা রত্না বালা প্রজাপতি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রদীপ সম্পত্তি দখলে নিতে আমার ছেলে বিবেক সুমনকে সাজানো নারী নির্যাতন মামলার আসামি করেছে। নিলুফা নামে টেকনাফের এক নারীকে দিয়ে আমার ছেলের বিরুদ্ধে এ মামলাটি করা হয়। এ মামলায় আমার ছেলেকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। আমার মেয়ে বেবী চৌধুরীকেও নানা লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। এমনকি তাদের হামলায় বেবী চৌধুরী আহত হয়ে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছে।’
