বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

এক অদম্য নারীর পথচলা

প্রকাশিতঃ Tuesday, March 8, 2022, 5:13 pm


রিজভী রাহাত, বান্দরবান : চাকরি জীবনের শুরুতেই আপন মানুষ ছেড়ে বহু দূরে ছিলেন ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি। এজন্য অনেকেই নানা কথা বলেছিলেন, সেসব কানেই তোলেননি তিনি। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হয়েছেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক (ডিসি)।

২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি বান্দরবান জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়া ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজির জন্ম পাহাড়ি এলাকায়। তাঁর বাড়ি রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায়। কাপ্তাই ও চট্টগ্রামেই বেড়ে ওঠেছেন তিনি। বাবা সৈয়দ শামসুদ্দীন আহমদ তিবরীজিও ছিলেন বিসিএস কর্মকর্তা। চাকরিজীবনে বাবার বদলির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া ও থাকা হয়েছে তাঁর।

চট্টগ্রাম নগরের নাসিরাবাদ সরকারি মহিলা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়ালেখা করেন তিবরীজি। মূলত হোস্টেল সুবিধার কারণেই এই কলেজে লেখাপড়া করেছেন তিনি। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিষয়ে প্রথম বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান উচ্চশিক্ষা জন্য। সেখানে, ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘গভরনেন্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসি’ বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি ২২তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। চাকরিজীবনের শুরুতে বরিশাল বিভাগের পিরোজপুরে পদায়ন করা হয় তাকে। সেসময় পিরোজপুরে তিন বছর কাজ করেছেন তিনি। ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি ২০১২ সনের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বান্দরবান সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উপসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বান্দরবানের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হওয়ার বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন- জানতে চাইলে ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, ‘প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে করছি। ইতিহাসের পাতায় বান্দরবানের জেলা প্রশাসক হিসেবে আমার নাম লেখা থাকবে, এটা নিশ্চয়ই আমার জন্য অনেক আনন্দের বিষয়।’

নারী হিসেবে কর্মক্ষেত্রে কখনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন-প্রশ্নে ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও স্পিকারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে এখন নারী। দেশে নারীর ক্ষমতায়নে অনেক প্রসার হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারীদের ক্ষমতায়নকে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ের সব নারীই সাহস ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারছেন। একসময় নারী সম্পর্কে মানুষের মনে যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, এখন সেই ধারণা নেই। তাই কর্মক্ষেত্রে আমার কোনও সমস্যা হয়নি বা হচ্ছেও না। এখানকার স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসন সবাই আমাকে সহযোগিতা করছে। তারা আমাকে পজিটিভলি নিয়েছেন এ কারণেই আমি কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখছি না। এছাড়া একজন মানুষ দীর্ঘদিন সরকারি চাকরি করেই জেলা প্রশাসক হন। তার মানে, তাকে অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে এ জায়গায় আসতে হয়েছে।’

এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, ‘আমার স্বামী আমাকে সবসময় সহযোগিতা করেছেন। তিনি সহযোগিতা করেছেন বলেই আমি এতদূর এসে কাজ করতে পেরেছি। আশেপাশের মানুষ যতই তার জন্য মায়াকান্না করুক না কেন, ওনি আমাকে সুযোগ দিয়েছেন বলেই আমি পিরোজপুরে তিন বছর কাজ করতে পেরেছি।’

পরিবারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পেয়ে আসছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সফলতা তো আসলে এক সিঁড়ির বিষয় নয়। এটা অনেক সিঁড়ির বিষয়। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়, অনেক কষ্ট থাকে। এই সফলতার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য অর্থাৎ বাবা-মা, ভাই-বোনের সহযোগিতা থাকে। সহযোগিতা থাকে বলেই মানুষ সফলতা পায়। আমার পরিবারও সবসময় আমার পাশে ছিল। আমার যে লক্ষ্য ছিল, সে লক্ষ্য পূরণে আমাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছে, এজন্যই আমি এ জায়গায় আসতে পেরেছি।’

বান্দরবানে আগের চেয়ে পর্যটক-সেবা বেড়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটন কেন্দ্র মেঘলায় কায়াকিং বোট যুক্ত হয়েছে, প্রান্তিক লেকে কায়াকিং বোটের পাশাপাশি বেশকিছু সোলার বোটও দেওয়া হয়েছে। মেঘলায় প্রথমবারের মতো ‘ব্রেস্ট ফিডিং’ জোন করা হয়েছে; সেখানে মায়েরা বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি নারীদের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমি চেষ্টা করেছি বান্দরবানের বাসিন্দা বা পর্যটক কাউকেই যাতে হয়রানির শিকার হতে না হয়। এক্ষেত্রে পর্যটন স্পটগুলোতে পূর্বের তুলনায় সেবা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করেছি। মেঘলায় কায়াকিং বোট দিয়েছি। প্রান্তিক লেকে কায়াকিং বোটের পাশাপাশি বেশকিছু সোলার বোট দিয়েছি যাতে একসাথে বেশ কয়েকজন লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘নীলাচল মসজিদে আগে পানির সমস্যাসহ বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। আমি সম্পূর্ণ মসজিদটিকে টাইলস করে দিয়েছি এবং সবসময় যাতে পানি থাকে সেই ব্যবস্থাও করে দিয়েছি। আর বান্দরবানে দুটো ভিআইপি কটেজ ছিল। যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। আমি সেই কটেজে যাওয়ার রাস্তায় আলোকায়ন করার পাশাপাশি কটেজগুলো সংস্কার করে নতুন করে সেগুলো চালু করেছি।’

তিনি আরও বলেন, বান্দরবানে জেলা প্রশাসন পরিচালিত মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রের মাতৃছায়া নামে নারীদের জন্য নির্মিত ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের প্রবেশ মুখেই স্থাপন করা হয়েছে একটি আকর্ষণীয় এবং দৃষ্টিনন্দন ভাষ্কর্য, যেখানে একজন মা পরম যত্নে তার শিশুকে জড়িয়ে রাখার একটি ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ মাতৃস্নেহের আবহ তুলে ধরা হয়েছে।

পরম মমতায় মায়ের কোলে আশ্রয় নিয়েছে শিশু- এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে খুব কমই পাওয়া যাবে। দুগ্ধ পান করে এমন শিশুদের নিয়ে মায়েরা মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স আসলে যেন তারা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারেন, বাচ্চাকে দুগ্ধ পান করাতে পারেন এবং নামায আদায় করতে পারেন সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে তৈরি করেছেন ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ও মায়েদের নামাজের স্থান “মাতৃছায়া”।

প্রতীকী একটি ভাস্কর্যের মাধ্যমে মায়েদের জন্য জেলা প্রশাসনের এ ক্ষুদ্র উদ্যোগ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি। তিনি বলেন, এখন থেকে মাতৃদুগ্ধ পান করে এমন শিশুদের নিয়ে মেঘলা পর্যটন স্পটে এসে কোনো মা বিব্রতবোধ করবেন না-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সকল মায়ের সন্তানেরা নিরাপদ ও সুস্থ থাকুক।

‘পার্বত্য বান্দরবান পর্যটন নগরীর পর্যটন কেন্দ্র নীলাচলে ব্র্যান্ডিং বান্দরবান নামে একটি স্টল খোলা হয়েছে। নতুন এই ব্র্যান্ডিং এই স্টলে বান্দরবানের ১২টি জাতি গোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পাশাপাশি জীবনধারনে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন আসবাবপত্র সংরক্ষণ এবং বিক্রি করা হবে।’

বান্দরবানের সংস্কৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কৃষি নিয়ে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছেন জানিয়ে জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভীন তিবরীজ বলেন, ‘বাঙালি ছাড়া আরও ১১টি নৃগোষ্ঠী এই জেলায় বসবাস করে। কিন্তু নানা কারণে ধীরে ধীরে তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত জিনিসগুলো হারিয়ে যেতে শুরু করেছে।

তাদের সৃষ্টি ও সংস্কৃতি যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য একটি মিউজিয়াম করার পরিকল্পনা করেছেন বলে জানান বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি। তিনি বলেন, ‘উক্ত মিউজিয়ামে পার্বত্য নৃগোষ্ঠীর সকল ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করা হবে। শুধু তাই নয়, বান্দরবানের কিছু কৃষি পণ্য আছে যেগুলোর চাহিদা সারা দেশে রয়েছে।

‘মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে, চাষীরা যাতে ন্যায্যমূল্যে এসব কৃষিপণ্য অনলাইনে বিক্রি করতে পারে সেজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা কথা বলছি। কৃষকরা যাতে অনলাইনে কৃষি পণ্য বিক্রি করতে পারে সেই বিষয়ে একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা আমার আছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কিছু বিভাগ কাজ শুরু করেছে।’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘বান্দরবানের পাহাড়, খাল ও ঝিরি-ঝর্ণা থেকে অবৈধভাবে বিভিন্নসময় পাথর উত্তোলন করা হয়, যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই পাথর উত্তোলন বন্ধ করার জন্য আমরা খুবই শক্ত অবস্থান নিয়েছি। প্রত্যেকটি উপজেলায় এজন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি।’