
আবছার রাফি : মো. জসিম উদ্দিন। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই। কিন্তু এতদিন তিনি জানতেন না নিজের ‘রক্তের গ্রুপ’ কী। আজ সোমবার রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়ায় খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিং নির্ণয় অনুষ্ঠানে এসে রক্তের গ্রুপ ‘বি পজিটিভ’ জানতে পেরে দারুণ খুশি জসিম উদ্দিন।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু জাফরও নিশ্চিত ছিলেন না তাঁর রক্তের গ্রুপের বিষয়ে। ফলাফল এ পজিটিভ নাকি বি পজিটিভ হবে; এমন শঙ্কার ভেতরে এ নেগেটিভ নিশ্চিত হলেন তিনি। বললেন দেখুন, এতদিন আমার রক্তের গ্রুপ কী সেটাও এতদিন জানা ছিলো না।
রেনু আকতার (৩০) ছোট দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করতে। সম্পূর্ণ বিনা খরচে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করাতে পেরে রেনু বলেন, নিজের রক্তের গ্রুপের পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের গ্রুপও জেনে নিলাম। অনেক আত্মীয়-স্বজন রক্তের প্রয়োজনে ফোন দেয়। কিন্তু গ্রুপ জানা না থাকায় দিতে পারি না।’ এ রকম একটি মানবিক উদ্যোগের জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
আদরি নামে এক প্রতিবন্ধীও ছুটে এলো ক্যাম্পিং স্থলে। পরিচিত একজন তাকে নিয়ে এলেন পরীক্ষা করাতে। জানতে চাইলে তিনি জানান, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা করতে আসা সারি সারি লোকজন দেখে সে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। জানায়, সেও পরীক্ষা করাবে। তাই ভবঘুরে আদরিকে বিনা খরচে পরীক্ষা করাতে নিয়ে এসেছেন তিনি। ওই ব্যক্তি বলেন, প্রতিবন্ধী হওয়ায় কখন কোথায় থাকে, কী করে না করে সেটার কোনো হিসেব নেই। কিন্তু অসুখ-বিসুখ হলে তো রক্তের গ্রুপ জানা থাকা দরকার হয়; তাই নিয়ে আসা।
স্কুলের টিফিন ছুটির সময় ছুটে আসে একঝাঁক শিক্ষার্থী। তাদের একজন মাইশা, ৫ম শ্রেণীতে পড়ে। সে জানাল, শিক্ষক তাদেরকে পাঠিয়েছে। রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করতে পেরে মাইশাও অনেক খুশি। মা-বাবাও জীবনে প্রথমবারের মতো রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করেছে এখান থেকে। এভাবে আড়াইশ’র বেশি মানুষের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয়েছে এই ‘ব্লাড ক্যাম্পিং এবং কার্ড প্রদান’ অনুষ্ঠানে।
সোমবার (২১ মার্চ) সকালে রাঙ্গুনিয়া উপজেলাধীন পদুৃয়া ইউনিয়ন পরিষদের পুরাতন অফিস প্রাঙ্গণে খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সকাল ১১ টা থেকে শুরু হওয়া রক্তের গ্রুপ নির্ণয় পরীক্ষা ও কার্ড প্রদান কর্মসূচিতে সর্বনিম্ন ৪ বছরের নারী-শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত অংশগ্রহণ করেছেন। দুপুরের দিকে পাশ্ববর্তী স্কুল-মাদরাসার শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দলবেঁধে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকের উপস্থিতিও ছিল নজর কাড়ার মতো।
এর আগে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন পদুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবু জাফর।অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন প্রবীণ শিক্ষাবিদ, এলাকার কৃতী সন্তান প্রফেসর কাজী খায়রুল হক, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. বদিউজ্জমান বদি, সহ সভাপতি এম শাহ আলম, কোকোলোকো’র কর্ণধার সাজিদুল হক, চট্টগ্রাম আইটি ফেয়ারের কর্ণধার মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ। ২নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. সায়েদুল আলম সায়েদ।
সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী, সাবেক সেনা সদস্য মো. তারেক সোহেল ও ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি দিদারুল আলম, জসিম উদ্দিন।
ইউপি চেয়ারম্যান আবু জাফর বলেন, মরহুম আলহাজ্ব খায়ের আহমেদ তালুকদার ছিলেন; এই এলাকার অন্যতম প্রথম শিক্ষিত ব্যক্তি। ওনাকে চেয়ারম্যান প্রার্থী করার জন্য সমস্ত এলাকার মানুষ উঠে পড়ে লাগতো, কিন্তু তিনি কখনোই চেয়ারম্যান হতে চাননি। বরং ওনি নিঃস্বার্থভাবে পদুয়ার মানুষের সেবায় কাজ করে গেছেন। তিনি একজন জনদরদী মানুষ। ওনার একটা বিষয় শিক্ষণীয় যে, শহরে যাক বা দূরে কোথাও যাক; সাথে যারা যেত তাদের কাউকেই একটাকাও খরচ করতে দিতেন না।
‘খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশন ওনার পরিবারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক ব্যাপার; এটা প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত ছিল আমাদের পদুয়ার জনসাধারণের পক্ষ থেকে। কারণ যে দেশে গুণী মানুষের সমাদর নেই, সেখানে গুণী মানুষ জন্মায় না।’

তিনি আরও বলেন, আজকে মানুষজন নিজের রিজিকের জন্য ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু ওনি আজীবন জনগণের রিজিকের জন্য ব্যস্ত ছিলেন। পরিবার দেখেননি, জনগণকে দেখেছেন। আজকে আমরা পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। এমন নেতৃত্ব আজ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। যেটা চলে যাচ্ছে আর ফিরে আসছে না। যারা পরিবার-পরিজন নিয়ে ব্যস্ত, এরকম নেতা সৃষ্টি হচ্ছে।
খায়ের আহমেদ তালুকদারের মাঝে কখনো কোনও লোভ ছিল না, অসম্ভব পরোপকারী মানুষ ছিলেন তিনি। দলমত নির্বিশেষে একজন জনদরদী মানুষ ছিলেন। ওনি শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের দারুণভাবে উৎসাহিত করতেন। আমার ছেলে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর তাকে যেভাবে উৎসাহ দিয়েছেন তাতে আমার মনে হয়েছে, আমার ছেলেটা প্রচণ্ড অনুপ্রেরণা পেয়েছে। আজকে ওনার পরিবার মানুষের জন্য যা করছে, তা আমাদের উজ্জীবিত করছে।
বদিউজ্জমান বদি বলেন, আজকের অনুষ্ঠান খুবই ভালো লাগছে। আসলে এ ধরনের কাজ তো কেউ করে না, এটা খুবই মহৎ উদ্যোগ। এখানে অনেক মানুষের রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে ধারণাও নেই। কিন্তু এসব দেখতে দেখতে মনে একটা ধারণা হবে যে, প্রয়োজনে রক্ত দেওয়া এবং নেওয়ার সঠিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে। আমি বলবো, এটা অবশ্যই প্রশংসনীয় উদোগ।
খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশন সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্লাড গ্রুপিং পরীক্ষার কর্মসূচিতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। সেবা নিতে আসা বেশিরভাগ মানুষই জীবনে প্রথমবারের মতো তাদের রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে জেনেছেন; এটা দেখে খুবই ভালো লেগেছে ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানব-হিতৈষী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবেন উল্লেখ করে তারা বলছেন, খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গণপাঠাগার তৈরি হচ্ছে। শিগগির তা উন্মুক্ত করা হবে। এ অঞ্চলের শিক্ষা, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করার প্রয়াসে এই ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ব্লাড গ্রুপিং এবং কার্ড প্রদান করেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইচ্ছা মানব উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি মো. আরিফুল ইসলাম হৃদয়, কোষাধ্যক্ষ আনিকা আকতার, রক্ত টিমের সমন্বয়ক জয় দাশ, বাধন ও তামিমা।
