‘প্রতারক’ বাদশানামা


মোহাম্মদ রফিক : ইসমাইল হোসেন বাদশা- কখনো আইনজীবী, কখনো আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দিয়ে বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে নানা প্রতারণার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। মামলাবাজ হিসেবেও পরিচিত বাদশার বিরুদ্ধে নিজের স্ত্রীকে পর্যন্ত হত্যার অভিযোগ আছে; স্বজনরা যেদিন ওই নারীর জন্য ‘মাছ ফাতেহার’ আয়োজন করেন সেদিনই বাদশা আরেকজনকে বিয়ে করে ঘরে তুলেন। তবে হত্যার সেই অভিযোগ বাদশা ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন বলে আলোচনা আছে।

ইসমাইল হোসেন বাদশা চট্টগ্রাম নগরের বালুছড়া কাঁঠাল বাগান এলাকার আবদুচ সামাদের ছেলে। তিনি আইনজীবী এনেক্স ভবনের নিচতলার ২৮ নম্বর কক্ষে বসেন বলে অভিযোগ আছে। তার প্রতারণা নিয়ে ভুক্তভোগী কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের মামলা দিয়ে হয়রানির হুমকি দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিচারপ্রার্থীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে ২০১৯ ও ২০২১ সালে আইনজীবী সমিতির নেতারা হাতেনাতে বাদশাকে আটক করেন। একবার তাকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। কিন্তু বারবার মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়ে যান বাদশা। কিছুদিন পর আদালত অঙ্গণে ফিরে আবার নেমে পড়েন প্রতারণায়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাদশার ফাঁদে পড়ে আদালত অঙ্গণে প্রতিনিয়ত নাকাল হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। ন্যায়বিচারের আশায় আদালতে এসে আইনি সহায়তা নিতে গিয়ে এই টাউটের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেকে। তার কারণে পেশাগত হয়রানির শিকার হচ্ছেন আইনজীবীরাও। এখন পুলিশের হাতে তুলে দিতে তাকে খুঁজছেন চট্টগ্রামের আইনজীবী নেতারা।

অভিযোগ আছে, ইসমাইল হোসেন বাদশার সঙ্গে ‘সখ্যতা’ আছে বিভিন্ন আদালতের পেশকার, ওমেদারদের সঙ্গে। তার টার্গেট থাকে বিশেষ করে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি এলাকার বিচারপ্রার্থী। মামলা করিয়ে দেবেন, আসামি ধরিয়ে দেবেন, খালাস করিয়ে দেবেন, মামলা নিষ্পত্তি করিয়ে দেবেন- এ ধরনের নানান প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছে টাকা আত্মসাত করে নেন তিনি।

বাদশার বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, পেশকারদের সঙ্গে ‘ভালো’ যোগাযোগ থাকার সুবাদে নগরের বালুছড়া কাঠালবাগান এলাকার বাসাকে তিনি ‘মিনি সেরেস্তা’ বানিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ মামলার ফাইলপত্র ওই বাসায় নেয়া হয়।

একজন ভুক্তভোগী বাদশাকে ‘মামলাবাজ’ উল্লেখ করে বলেন, ‘বাদশা নিজের ভাইদের বিরুদ্ধেও করেছেন একাধিক ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা। উদ্দেশ্য ভাইয়ের জমিজমা আত্মসাত করা।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচএম জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘ইসমাইল হোসেন বাদশা ভয়ংকর এক টাউট। তিনি কোন আইনজীবীও না, মুনশিও না। বিচারপ্রার্থীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে এর আগে একাধিকবার আমাদের হাতে ধরা পড়েছিল। কিন্তু জরিমানা এবং মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পায়। এবার তাকে আর ছাড় দেব না। তাকে আমরা হন্যে হয়ে খুঁজছি। পেলেই তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা করব।’

জানা গেছে, বাদশা নগরের কোতোয়ালী থানা এলাকায় অবস্থিত আবাসিক হোটেল ‘সৌদিয়া’র ম্যানেজার হিসেবেও কর্মরত। অসামাজিক কার্যকলাপ পরিচালনার অভিযোগে হোটেলটিতে পুলিশ তালা লাগিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কেতোয়ালী থানার ওসি নেজাম উদ্দিন।

পুলিশ সূত্র জানায়, এর আগে ওই হোটেল থেকে নারীসহ একাধিকবার ‘আটক’ হয়েছিলেন ইসমাইল হোসেন বাদশা। তবে প্রতিবারই নানা ‘কায়দায়’ রেহায় পেয়ে যান বাদশা। হোটেলটি এখন কার্যত বন্ধ থাকলেও সারাদিন আদালত পাড়ায় ঘুরে বেড়ান বাদশা। কখনো কালো কোর্ট-টাই পরে, কখনো আইনজীবী সেজে তিনি প্রতারণা করে আসছেন।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির এক নেতা জানান, বাদশার মতো দালাল-টাউটের কারণে আইনজীবীদের পেশাগত ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতে হাজির করার নিয়ম রয়েছে। আসামির আত্মীয়-স্বজনরা আইনজীবী নিয়োগ করার আগেই বাদশা মামলার নাম্বার সংগ্রহ করে আসামির নাম-ঠিকানা লিখে ওকালতনামা স্বাক্ষরের জন্য পাঠায়। এসময় অনেক আসামি কিছু না বুঝে সেই ওকালতনামায় স্বাক্ষর করে দেন।

অন্যদিকে আসামির স্বজনদের নিয়োজিত আইনজীবী ওকালতনামা স্বাক্ষরের জন্য কারাগারে পাঠান। সেখানেও আসামি স্বাক্ষর করেন। এরপর আদালতে শুনানি করতে গেলে দেখা যায়, আসামির স্বাক্ষরিত ভিন্ন ভিন্ন আইনজীবীর দুটি ওকালতনামা। তখন বিপাকে পড়েন বিচারক। এ কারণে মামলায় একাধিক ওকালতনামা থাকায় বিচারক জামিন বা রিমান্ড শুনানি করতে চান না। সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক তা নিষ্পত্তি করার জন্য চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতিতে পাঠিয়ে দেন। ফলে আসামিদের জামিন বা রিমান্ড শুনানি করতে অনেক সময় লেগে যায়। এসময় আসামিরা অযথা কারাগারে বিনাবিচারে আটকে থাকেন।

সমিতির আরেক নেতা জানান, মামলার অভিযোগ যত বড় হোক না কেন, দুয়েকদিনের মধ্যে জামিন করিয়ে দেয়ার চুক্তিতে ও শতভাগ নিশ্চয়তার আশ্বাস দিয়ে বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে ওকালতনামায় স্বাক্ষর রাখেন বাদশা। এরপরই শুরু হয় তার আসল প্রতারণা। বছর ঘুরে এলেও আসামির জামিন আর মেলে না।

জানা গেছে, বাদশা আদালতের কর্মচারীদের মতো প্রতিদিন সকালে আদালতপাড়ায় আসেন। আর বিকালে চলে যান। তিনি বিচারপ্রার্থীদের নানাভাবে হয়রানিও করে থাকেন। আইনজীবীদের কাছে থাকা মামলাও বিভিন্ন কৌশলে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন বাদশা। আবার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিচারকের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে মামলায় জামিন করিয়ে দেয়ার কথা বলে থাকেন এই টাউট।

এদিকে চট্টগ্রাম আদালত এলাকা থেকে টাউট উচ্ছেদ করতে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি আছে জেলা আইনজীবী সমিতির। ওই কমিটির আহ্বায়ক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী এরশাদুর রহমান রিটু।

ইসমাইল হোসেন বাদশা সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা আইনজীবী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এরশাদুর রহমান রিটু আজ বৃহস্পতিবার সকালে বলেন, ‘বাদশা নামের এক প্রতারক দীর্ঘদিন ধরে আদালত অঙ্গণে কখনও আইনজীবী, কখনও আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দিয়ে বিচারপ্রাথীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন। আমরা তাকে খুঁজে পেলে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করব।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে বাদশার বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।