
জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারকে আইন অনুষদের ডিন বানাতেই ওই পদে নির্বাচন করছেন সদ্য রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক; এমন খবর চাউর হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে।
না হয়, আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক ড. জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে উপাচার্য শিরীণপন্থি হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক কেনই–বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন- এমন প্রশ্ন রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
একাধিক শিক্ষক একুশে পত্রিকা বলেছেন, ডিন নির্বাচিত হলেও আব্দুল্লাহ আল ফারুক রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবেন, নির্বাচিত না হলেও যোগ দিবেন। সেখানে যোগ দিলে ডিন পদে আব্দুল্লাহ আল ফারুকের থাকার কোনো সুযোগ নেই। ডিন পদে জয়ী হলে আইন অনুযায়ী আব্দুল্লাহ আল ফারুককে উপাচার্যের হাতে ডিনের দায়িত্ব হস্তান্তর করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিলিজ নিতে হবে।
এদিকে ডিন নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ‘অনুচিত প্রভাব’ খাটাচ্ছে উল্লেখ করে আইন অনুষদের আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের প্রার্থী অধ্যাপক জাকির হোসেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি রেজিস্ট্রার বরাবর দেওয়া লিখিত আবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করছেন বলেও অভিযোগ তুলেছেন।
বুধবার (৩০ মার্চ) নির্বাচন হলেও আগের দিন মঙ্গলবার (২৯ মার্চ) ডিন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে এসব বিষয় উল্লেখ করে নির্বাচন না করার ঘোষণা দেন তিনি।
অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘আগামী ৩০ মার্চ আইন অনুষদের ডিন নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত আছে। উক্ত নির্বাচনে আমি মো. জাকির হোসেন ও অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক প্রার্থী রয়েছি। গত ২৩ মার্চ মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুককে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তিনি উপাচার্য হিসাবে যোগদান না করে আইন অনুষদের ডিন নির্বাচনে তাঁর প্রার্থীতা বহাল রেখেছেন।’
তিনি বলেন, ‘কাউকে উপাচার্য নিয়োগের আগে তাঁর কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত চাওয়া হয়। চাহিদা অনুযায়ী জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার মানে তিনি নিয়োগে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছেন। তাই নিয়োগের রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপন জারির পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের বরাবরে লিখিতভাবে না জানানোর আগ পর্যন্ত তিনি এই নিয়োগ গ্রহণ করেছেন বলে পরিগণিত হয়।’
গত ২৭ মার্চের দুইটি গণমাধ্যমে দেওয়া চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয়ের রেজিস্ট্রার ও ডিন নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার প্রফেসর ড. মনিরুল হাসানের বক্তব্যের বিষয়ে উল্লেখ করে জাকির হোসেন চিঠিতে লিখেন, ‘আপনি পত্রিকা দুইটিতে বলেছেন, অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক আপনাকে জানান যে, তিনি রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে যোগদান করবেন না। এতে প্রতীয়মান হয় যে, উপাচার্য হিসাবে যোগদানের চেয়ে ডিন পদ অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুকের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।’
চিঠিতে জাকির হোসেন আরও বলেন, ‘আমি ও অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত শিক্ষকদের ফোরাম হলুদ দলের সদস্য। হলুদ দল আমাকে ডিন নির্বাচনের প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দিলে অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেন। এতেও প্রমাণিত হয় ডিন পদের প্রতি অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুকের গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ডিন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইন আনুষদের সহকর্মীদের মধ্যে ভয়ঙ্কর বিভেদ, বিদ্বেষ ও শত্রুতার এমন এক অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যেখানে সহকর্মীদের মধ্যে ওয়ার্কিং রিলেশনও হুমকির মুখে পড়েছে। অনুষদের সহকর্মীদের সম্পর্কের বুনন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কয়েকজন সহকর্মী তাঁদের বিব্রতকর অবস্থা ও মনেকষ্টের কথা আমাকে জানিয়েছেন। সহকর্মীদের মাঝে সালাম-শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময়েও বিভেদ-বিদ্বেষের প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।’
অধ্যাপক জাকিরের অভিযোগ, ‘আইন অনুষদের ডিন নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কোনো কোনো কর্তাব্যক্তিও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ায় সহকর্মী ভোটারদের মাঝে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। আইন বিভাগের একজন শিক্ষক সহকর্মীদের কাউকে কাউকে ডেকে দফায় দফায় নির্বাচন বিষয়ে অনুচিত প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন যার ফলে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ বাংলাদেশের মধ্যে একটি অনন্য আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সহকর্মীদের মাঝে বিদ্বেষের বিষাক্ত পরিবেশের কারণে অনুষদের শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একটি নির্বাচনের কারণে শিক্ষার পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেয়া গর্হিত অপরাধ। যে নির্বাচন সহকর্মীদের একে অপরের শত্রুতে পরিণত করে, আইন শিক্ষার অনন্য উচ্চতার প্রতিষ্ঠানকে ‘কাশিম বাজার কুঠিতে’ রূপান্তরিত করে, কোনো বিবেকবান মানুষ সেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের অংশীজন থাকতে পারেন না। কাজেই এমন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আমি সমীচীন মনে করি না। আইন অনুষদের বৃহত্তর স্বার্থে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সকল বিভেদ-বিদ্বেষ-শত্রুতা ও বিবব্রতকর অবস্থা অবসানের লক্ষ্যে এবং শিক্ষার সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের স্বার্থে ডিন নির্বাচন থেকে আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সহকর্মীদের আমাকে ভোট না দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক জাকির হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী হয় তিনি যোগদান করবেন না-হয় লিখিতভাবে জানাতে হবে যে তিনি যাবেন না। কিন্তু মুখে যাই বলুক না কেন আজ পর্যন্ত তিনি লিখিতভাবে মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে কিছুই জানাননি। তার মানে তিনি ভিসি হিসেবে যোগদান করবেন। যদি তাই হয়ে থাকে তিনি তো ডিন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা অবশ্যই অন্যায়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ‘দলের মনোনয়ন পেয়েই অধ্যাপক জাকির প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে গেলেন আব্দুল্লাহ আল ফারুক। বললেন- তিনি ভিসি ম্যাডামের প্রার্থী। এতোসব ঘটনার পর বোঝাই যাচ্ছে যে, তিনি নির্বাচনে যদি জয়ী হন এরপর রাঙামাটিতে যোগদান করেন তাহলে পদটি আবার খালি হবে৷ তখন ভিসি ম্যাডাম ভারপ্রাপ্ত ডিন হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করবেন। পরবর্তীতে তিনি নিজের খুশিমতো যে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে দিবেন। এটাই হচ্ছে চালাকি।’
উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘ভিসি ম্যাডাম একটি পক্ষ নেওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে ভয়ংকর বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে গেছে। তিনি (উপাচার্য) কারও কথা শুনছেন না। তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তিনি চাচ্ছেন তাঁর লোক আসুক, যাতে তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে একনায়কতন্ত্র চলছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশাসন একটা পক্ষ নেওয়ায় স্বাধীন ভোটাধিকারের পরিবেশ নেই।’
জানতে চাইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মনিরুল হাসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চিঠিতে তিনি (অধ্যাপক জাকির হোসেন) যা জানিয়েছেন, এটা তাঁর মতামত। প্রার্থী যা মনে করেছেন তিনি সেভাবে লিখেছেন। যে অভিযোগগুলো করেছেন সেগুলো ওনার নিজস্ব ব্যাপার। আর প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আছেন ততক্ষণ পর্যন্ত এই পদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে তাঁর আইনগত কোনো বাধা নেই।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তিনি (অধ্যাপক জাকির হোসেন) প্রার্থীতা প্রত্যাহারের যে কথাটা বলেছেন, সেটা তিনি করতে পারবেন না। কারণ এটা নিয়মের মধ্যে পড়ে না৷ প্রার্থীতা প্রত্যাহারের একটা নির্দিষ্ট সময় আছে, সে সময়ের মধ্যে প্রত্যাহার করতে হয়। পরে আর প্রার্থীতা প্রত্যাহার হয় না।’
