- ইউএনও বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা
একুশে প্রতিবেদক : ১৯১৭ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানা গঠিত হয়। এরপর ১৯৮৩ সালে থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। উপজেলায় রূপান্তরের পর ২০২১ সাল পর্যন্ত ২৭ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দায়িত্ব পালন করেন; যাদের সবাই পুরুষ।
২০২১ সালের ৮ জুলাই সাতকানিয়ার ইউএনও পদে যোগদান করেন বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা; এর মধ্য দিয়ে ৩৯ বছরে প্রথম একজন নারী ইউএনও পায় সাতকানিয়া উপজেলাবাসী।
এরপর থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস সময় ধরে মেধা, যোগ্যতার সর্বোচ্চ দিয়ে সাতকানিয়ায় দায়িত্ব পালন করছেন বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা; এই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে কোন সমালোচনা শোনা যায়নি।
উল্টো অনেকেই এ সরকারি কর্মকর্তাকে অনুকরণীয় হিসেবে উদাহরণ দিচ্ছেন। বিশেষ করে সাতকানিয়ার নারী সমাজ ইউএনও বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরাকে ‘আইকন’ হিসেবে দেখছে।
সাতকানিয়া সদরের বাসিন্দা রহিমা বেগম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ হচ্ছে ইউএনও। দেশের বিভিন্ন উপজেলায় অনেক আগে থেকে নারী ইউএনও’রা কাজ করছিলেন। কিন্তু সাতকানিয়ায় নানা কারণে নারী ইউএনও দেয়া হয়নি। অবশেষে ২০২১ সালে এসে আমরা একজন নারীকে ইউএনও হিসেবে পেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘ইউএনও বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা কয়েকদিন আগে সাতকানিয়া আদর্শ মহিলা কলেজের একটি অনুষ্ঠানে যান। সেদিন ওনাকে দেখে, কথা শুনে মেয়েরা অনুপ্রাণিত হন। তিনি আসলেই অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। ওনাকে আইকন হিসেবে দেখছেন সাতকানিয়ার মেয়েরা।’
সাতকানিয়ার কেরানিহাটের ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘টিসিবির পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে যাতে কোন অনিয়ম না হয়, সেজন্য সাতকানিয়া এলএসডিতে প্যাকেজিংসহ সব কার্যক্রম কঠোর নজরদারিতে রেখেছেন ইউএনও ফাতেমা-তুজ-জোহরা। তিনি সুনিপুণভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। মানুষের সাথে খুব সহজেই মিশে যেতে পারেন তিনি। কথা বলেই জটিল সমস্যার সহজ সমাধান দেন।’
সাতকানিয়ার ইতিহাসে প্রথম নারী ইউএনও হিসেবে যোগদান করা বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা বিসিএস ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনে সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় ই-নামজারিতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা; এ কারণে সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ এসিল্যান্ড হিসেবে সম্মানিতও হন।
ব্যক্তিগত জীবনে এক সন্তানের মা বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা। লক্ষীপুর জেলা তার গ্রামের বাড়ি। তার স্বামীও বিসিএস ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। সাতকানিয়ার ইউএনও হিসেবে যোগ দেয়ার আগে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা।
সাতকানিয়ার ইউএনও পদে প্রথমবারের মতো একজন নারীর অংশগ্রহণ করার বিষয়ে জানতে চাইলে বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কাজ করার বিষয়ে আমি সবসময় ইতিবাচক মানসিকতায় বিশ্বাসী। সাতকানিয়ার মতো জায়গায় অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। শুরুর দিকে আমি অনেক কিছুর সম্মুখীন হয়েছি। অনেকেই বলেছেন যে আপনি নারী হয়েও এতো পরিশ্রম করেন। নারী হওয়ার বিষয়টিকে অন্যভাবে ট্রিট করতে চায় অনেক মানুষ। কিন্তু আমি মনে করি কাজের মাধ্যমে আমি সেটাকে ওভারকাম করে নিই। আমি সবসময় সবাইকে একটি বার্তা দিই নারী-পুরুষ বলতে আলাদা কোন বৈষয়িক কিছু নয়। আমরা নিজেদেরকে সেভাবেই তৈরি করেছি।’
‘একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমরা মানুষকে সেবা দিই। সেক্ষেত্রে নারী হিসেবে আমাকে ট্রিট করে এমনটা ভাবার কারণ নেই যে আমি নারী তাই কাঙ্খিত সেবা দিতে পারব না। এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। আমি একজন অফিসার তথা প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে চব্বিশ ঘন্টা মানুষকে সেবা দিতে প্রস্তুত।’
গত ২৮ মার্চ মির্জারখীল দরবারের কাছে বাংলাবাজার সড়কের জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান ইউএনও বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা; এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন কোন অভিযোগ করেন তখন আমরা তা সমাধান করার চেষ্টা করি। মানুষ এখনও প্রশাসনে আস্থা রাখে। আমরা তাদেরকে (মির্জারখীল দরবার শরীফ) মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি জানিয়েছি। বুঝাতে সক্ষম হয়েছি যে তারা এটি ভালো করছেন না। এটি মানুষের জন্য দুর্ভোগের। তাই তারা আমাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে দখল সরিয়ে নিয়েছেন। এ অবস্থা আমাদের প্রশাসনের প্রতি আস্থার জায়গা থেকে তৈরি হয়েছে।’
- বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমি আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সনদ নিচ্ছেন ফাতেমা-তুজ-জোহরা।
সরকারি রাস্তা দখল করে মির্জারখীল দরবারের গেইট নির্মাণ করায় জনভোগান্তি তৈরি হয়েছে। বাংলাবাজার সড়ক দখলমুক্ত করার পর উচ্ছ্বসিত স্থানীয়রা বলছেন, সাহসী ও জনবান্ধব ইউএনও’র পক্ষেই সম্ভব দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব থেকে গেইটটি অপসারণ করে জনচলাচলের জন্য রাস্তাটি খুলে দেওয়া।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইউএনও বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা বলেন, ‘গেইটের বিষয়ে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি। এ রকম অভিযোগ কেউ যদি আমাদেরকে দেয়, আমরা যদি দেখি এটি সরকারি জায়গা, তাহলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা এখনও রয়েছে। বুঝিয়ে বললে অনেকেই নিজেদের সংশোধন করে নেন।’
প্রশাসন ক্যাডারে আসার কারণ জানতে চাইলে ইউএনও বেগম ফাতেমা-তুজ-জোহরা বলেন, ‘প্রশাসন ক্যাডার এমন একটি ক্যাডার যেখানে প্রতিটি সেক্টরের প্রতিটি বিভাগের সাথে কানেক্টিভিটি বাড়িয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এবং প্রান্তিক পর্যায়ের একজন মানুষকে যদি সেবা দিতে চান, তাও প্রশাসন ক্যাডারে সম্ভব। গ্রামের একজন হতদরিদ্র, প্রতিবন্ধীর সুযোগ-সুবিধা দেখা, গ্রামীণ শিক্ষা, কৃষক, আইনশৃঙ্খলা বিষয়- নিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে সেবা দেয়ার একটি চমৎকার সুযোগ প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তার রয়েছে।’
‘সাধারণ মানুষের সাথে এখানে একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটি মানুষের দোয়া পাওয়ারও একটি ক্ষেত্র। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সুযোগ এখানে পাওয়া যায়। এসব জায়গা থেকেই আমার কাছে মনে হয়েছে প্রশাসন ক্যাডার আমার জন্য উপযুক্ত। কেননা মানুষের সেবা করা আমার ইচ্ছে ছিল।’


