ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশনে চলছে ‘চোরাই’ তেল বিক্রি!


আবছার রাফি : দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক ‘রিসিভার’ নিয়োগ না দিয়ে উল্টো চোরাই তেল সরবরাহ ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম নগরের সল্টগোলা ক্রসিং এলাকার মেসার্স ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশনের বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয়, নির্দেশনা উপেক্ষা করে যমুনা অয়েল কোম্পানির কর্মকর্তাদের যোগসাজশে রিটেইলার ডিলারশীপ লাইসেন্সও নিয়েছিলেন ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশনের কর্মকর্তারা। যে অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। পরে লাইসেন্স বাতিল হলেও এখনো থামছে না তেল সরবরাহ ও বিক্রি।

অন্যদিকে রিটেইলার ডিলারশীপ লাইসেন্স নেওয়ার সময় যমুনা অয়েলের দেওয়া মালামাল অক্ষত অবস্থায় গত ১৫ মার্চের ভেতর পুনরায় প্রতিষ্ঠানটির বিপপণ বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু এখনো এসব মালামাল বুঝে নিতে পারেনি যমুনা অয়েল।

জানা গেছে, ফিলিং স্টেশনটির রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রথম ডিলার ছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ইমাম শরীফ। ইমাম শরীফের মৃত্যুর পর থেকে ফিলিং স্টেশনটি পরিচালনা করে আসছেন তার ভাই মুসলিম খান। তবে মহসিন খানসহ অন্য ভাইদের বঞ্চিত করে ব্যবসা পরিচালনা করার কারণে মুসলিম খানের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন ভাইয়েরা।

১৯৯৮ সালে হাইকোর্ট ফিলিং স্টেশনটিতে রিসিভার নিয়োগ করে লভ্যাংশ ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে বলেছে। তবে প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও আদালতের সেই আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি। হাইকোর্টের দেওয়া সেই আদেশের পর রিসিভার হিসেবে নিজেকে নিয়োগ দিতে মুসলিম খান আবেদন করেন। তবে মুসলিম খানের আবেদন খারিজ করে দেয় আদালত।

এদিকে আদালতের আদেশ অমান্য করে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (জেওসিএল) কর্তৃপক্ষ ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই মুসলিম খান এবং তার মৃত্যুর পর ছেলে এহেতাশাম রসুল খানকে দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকে। তবে বছরের পর বছর নিজেদের বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অন্যান্য ভাইকে বঞ্চিত করে মুসলিম খানের একাই ভোগ করার বিষয়ে সম্প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দেয় ভাই মহসিন খান।

এ নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের একটি টিম তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে তারা একটা প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে জেওসিএল কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে মুসলিম খান ও তার ছেলেরা একাই ফিলিং স্টেশন ভোগদখল করছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এরপর ২০২২ সালের ৮ মার্চ মুসলিম খানের ছেলে এহেতাশামের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয় জেওসিএল। তবে জেওসিএল তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিলেও বর্তমানে বিভিন্ন জায়গা থেকে চোরাই তেল সংগ্রহ করে বিক্রি অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

রোববার (৩১ মার্চ) সল্টগোলা ক্রসিং এলাকায় অবস্থিত ফিলিং স্টেশনটিতে সরেজমিন গিয়ে বিভিন্ন গাড়িতে তেল বিক্রি করতে দেখা যায়। এমনকি বিভিন্ন সময় ফিলিং স্টেশনের স্টোরেজেও তেল সরবরাহ করতে দেখা যায়।

জানতে চাইলে ইমাম শরীফের ছেলে মহসিন খান বলেন, ‘আমার আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে মুসলিম খান এবং তার ছেলে অন্যান্য ভাইদের বঞ্চিত করে ফিলিং স্টেশনটির ব্যবসা করে আসছে। আমরা এ বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। আদালত প্রতিষ্ঠানটিতে রিসিভার নিয়োগ করে লভ্যাংশ ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে বলেছেন। তবে প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলে আদালতের সেই আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি। সম্প্রতি আমরা অভিযোগ দিলে যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষ তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরপরও চোরাই তেল দিয়ে বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বর্তমানে দখলে থাকা লোকজন। বিষয়টি আমরা যমুনা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তবে এসবের পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এহেতাশাম রসুল খান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার স্টোরেজে থাকা তেল বিক্রি করছি। আমার নিজস্ব ট্রাকে তেল ছিল, সেখান থেকে স্টোরেজে সরবরাহ করেছি। আপনি পাম্পে আসুন। বসে আরও কথা বলবো।’

এ বিষয়ে জেওসিএল’র উপ-মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) মো. আইয়ুব হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘গত সপ্তাহে আমাদের কর্মকর্তারা ভিজিট করে এটা বন্ধ করেছেন। আমাদের কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়ে ডিসি মহোদয় ও পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়েছে যে, যদি সেখানে অবৈধ তেল বিক্রি হয় তা আপনারা বন্ধ করে দেন।’

রিটেইলার ডিলারশীপ লাইসেন্সের সময় যমুনা অয়েলের দেওয়া মালামাল অক্ষত অবস্থায় পুনরায় জেওসিএল’র বিপপণ বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও কেন বুঝে নিতে পারেননি বা দেওয়া হয়নি, এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৬৬ সালে আমাদের কর্তৃপক্ষ যেটা করেছে, তা এতদিন থাকার কথা না। তারপরেও কী আছে নেই, তা পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ে দেখতে হবে।’