- পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পে মাটি ভরাট করছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। রোববার তোলা ছবি।
শরীফুল রুকন : ১৯৬৩ সালে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন (স্যুয়ারেজ) প্রকল্পের জন্য চট্টগ্রামের হালিশহরে ১৬৩.৮৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা। দীর্ঘদিনেও প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় ১৯৭০ সালের ৫ আগস্ট উক্ত জমি থেকে ১৩৪.১৪৫ একর জমি ‘ডি-রিকুইজিশনের’ বা অবমুক্তির আদেশ দেন চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক। একই বিষয়ে অবমুক্তির নোটিশও জারি হয়। এরপর থেকে এসব জমি প্রকৃত মালিকরা ভোগ দখল করছেন। এছাড়া ‘ডি-রিকুইজিশন’ হওয়া উক্ত ভূমির বিষয়ে ১৯৯৬ সালের ২২ জুলাই অতিরিক্ত ভুমি হুকুম দখল কর্মকর্তা মো. নুর হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশপত্রেও উল্লেখ আছে, ১৩৪.১৪৫ একর জমির ‘ডি-রিকুইজিশন’ আদেশ বাস্তবায়িত হয়েছিল।
কিন্তু ৫৮ বছর পর ২০২১ সালে এসে ‘ডি-রিকুইজিশন’ হওয়া ১৩৪.১৪৫ একর জমিসহ পুরো ১৬৩.৮৫৫ একর জমিতে পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের কাজ শুরু করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। অথচ মেহেরউদ্দিন বনাম বাংলাদেশ সরকার ৩০ ডিএলআর (৪২৬) মামলার রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, “আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি- পরবর্তীতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ডি-রিকুইজিশন করা হয়েছে। ডি-রিকুইজিশনের আদেশ বাতিল করে এটি সরকারের দখলে নেওয়া যাবে না। একবার একটি জমি অধিগ্রহণ করা হলে এবং তার দখল মালিকের কাছ থাকলে সেটি আবার পুনরুদ্ধার করার কোনো বিধান নেই।”
এদিকে ভুল জরিপ সংশোধনের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০০১ সালে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা হয়। রিটে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম ওয়াসাকে বিবাদী করা হয়। উক্ত মামলায় ২০১৪ সালের ৫ জুন জমির মালিকদের পক্ষে ওয়াসার অধিগ্রহণ চূড়ান্ত হয়নি উল্লেখ করে রায় দেন হাইকোর্ট। উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ওয়াসা সুপ্রিম কোর্টে ‘লিভ টু আপিল’ করে। এরপর ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ ‘লিভ টু আপিল’ নামঞ্জুর করে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। ফলে রায় স্থানীয় ভূমি মালিকদের পক্ষে যায়।
জমির মালিকদের অভিযোগ, ডি-রিকুইজিশনের আদেশ ও সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায় আমলে না নিয়ে এবং অধিকতর শুনানির সুযোগ না দিয়ে ২০১৭ সালের ৯ মে চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন প্রেরণ করেন; যাতে একতরফা ও স্ব-বিরোধী তথ্য উল্লেখ করা হয়।
এদিকে জমি নিয়ে এসব আইনি জটিলতা নিরসন না করেই হালিশহরে পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। গত ১১ জানুয়ারি ঠিকাদারও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে ক্ষোভে ফুঁসছেন ওই এলাকার জমির প্রায় ৮ হাজার মালিক। যেকোন সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া আইনি দিক থেকে জমির মালিকরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় ঝুঁকিতে পড়েছে ওয়াসার ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকার পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পটি।
ভুক্তভোগী জমির মালিকদের প্রতিনিধি হয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন ছৈয়দ মুহাম্মদ এনামুল হক মুনিরী; এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা বিরোধিতা করছি না। কিন্তু উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডি-রিকুইজিশনের আদেশ বাতিল করে আবার দখলে নেওয়া যাবে না। নিয়মানুযায়ী আবার রিকুইজিশনের মাধ্যমে জায়গার মালিককে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু এই ধরণের কোনো উদ্যোগ চট্টগ্রাম ওয়াসা নেয়নি। বরং তারা জোর করে জায়গা দখল করতে চাইছে। জমির মালিকরা এত বড় অন্যায় কীভাবে মেনে নেবে?’
তিনি বলেন, ‘১৩৪ একর জমি ডি-রিকুইজিশন করে ১৯৭০ সালে জেলা প্রশাসন নোটিশ জারি করেছে। তাছাড়া সর্বোচ্চ আদালতও আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছেন, ওয়াসার আপত্তি খারিজ করে দিয়েছেন। এরপরও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভুল তথ্য দিয়ে ওয়াসা ক্ষতিপূরণ না দিয়ে আমাদের জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।’
এদিকে বিরোধীয় ১৬৩.৮৫৫ একর কৃষি জমির বিষয়ে চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত সেসব জমির বেআইনি ব্যবহার, অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ চট্টগ্রামের একটি আদালতে খতিয়ান সংশোধন ও নিষেধাজ্ঞার মামলা করেন ভুক্তভোগী জমির মালিক ছৈয়দ মুহাম্মদ এনামুল হক মুনিরী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আরএস ও পিএস খতিয়ানে জায়গাগুলো আমাদের ও পূর্বপুরুষদের নামে আছে। কিন্তু বিএস খতিয়ানে ভুলবশত জায়গাগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ডের নামে রয়েছে; তবে উক্ত সংস্থা আদালতে লিখিত দিয়েছেন জায়গাগুলো তাদের নয়। এসব বিষয় নিষ্পত্তি ও ওয়াসা যাতে কাজ শুরু করতে না পারে সেজন্য নিষেধাজ্ঞা চেয়ে মামলাটি করেছিলাম। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে চট্টগ্রাম ওয়াসাসহ বিবাদীদের ১০ দিনের সময় দিয়ে কারণ দর্শানোর আদেশ দিয়েছিলেন গত ১০ মার্চ। কিন্তু ওয়াসাসহ অন্য বিবাদীদের পক্ষ থেকে জবাব দেওয়া হয়নি। এরপর ৬ এপ্রিল চট্টগ্রামের তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ নুসরাত জাহান ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের কাজে অর্ন্তবর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছেন।’
এ বিষয়ে বাদীর আইনজীবী ব্যারিস্টার আফরোজা আকতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ হাজির হয়ে এ বিষয়ে তাদের জবাব না দেওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের কাজে অর্ন্তবর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। সেই পর্যন্ত কোনো কাজ করতে পারবে না ওয়াসা।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘অধিগ্রহণ করা জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছিল। যার কারণেই দুই বছর আগে সীমানা দেয়াল দিয়েছি আমরা। এখন কাজ শুরুর পর তারা আদালতে গেলেন। আমাদের ধারণা- প্রকৃত সত্য আদালতের নজরে আনা হয়নি। এ বিষয়ে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নেব।’
- ভুমি হুকুম দখল কর্মকর্তা মো. নুর হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশপত্র।
ওয়াসার কর্মকর্তা উপরোক্ত কথা বললেও নথিপত্র বলছে ভিন্ন কথা। ‘ডি-রিকুইজিশন’ বা অবমুক্ত হওয়া উক্ত ভূমির বিষয়ে ১৯৯৬ সালের ২২ জুলাই অতিরিক্ত ভুমি হুকুম দখল কর্মকর্তা মো. নুর হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশপত্রে উল্লেখ আছে, “পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির মধ্যে ১০.৩০ একর রেলওয়েকে, ৭ একর সিটি করপোরেশনকে, ৪.০৮ একর বাখরাবাদ গ্যাসকে হস্তান্তর করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা; এক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকের পূর্বানুমতি নেয়া হয়নি। এছাড়া জনসাধারণের ব্যবহার্য সড়ক হিসেবে ৬ একর ও ওয়াসার নিজেদের প্রয়োজনে ১০ একর জমি ব্যবহার করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে ৩৭.৩৮ একর জমি ব্যবহার হচ্ছে।”
ভুমি হুকুম দখল কর্মকর্তা মো. নুর হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশপত্রে আরও উল্লেখ আছে, “অধিগ্রহণকৃত জমি থেকে ১৯৭০ সালের ৫ আগস্ট ১৩৪.১৪৫ একর জমির ডি-রিকুইজিশন আদেশ প্রদান ও এতদসংক্রান্ত নোটিশ জারি করা হয় এবং এই ডি-রিকুইজিশন প্রাপ্ত জমির অগ্রিম প্রদানকৃত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৪.৩৯ টাকা আদায় যোগ্য মর্মে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উ.) আদেশপত্রের ১৪৭ পৃষ্টায় ৩য় অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছেন।” ১৩৪.১৪৫ একর জমির ডি-রিকুইজিশন আদেশ প্রদান, নোটিশ জারি ও আদেশ বাস্তবায়িত হওয়ার বিষয়টি ভুমি হুকুম দখল কর্মকর্তা মো. নুর হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশপত্রে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেছেন, ‘পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে। সর্বশেষ প্রকল্পের কাজে নিষেধাজ্ঞার ঘটনায় বাদীপক্ষ অনেক তথ্য গোপন করেছে। আমরা আসল তথ্যটা আদালতে তুলে ধরব। আশা করছি আদালত আমাদের পক্ষেই রায় দেবেন।’
ওয়াসার সেই ‘আসল সত্যের’ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা জানান, পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের বিরোধের বিষয়টি হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টের রায়ে জেলা প্রশাসনকে সুরাহা করতে বলা হয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সামসুল আরেফিনের ২০১৭ সালের ৯ মে তারিখের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৭ সালের অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নির্দেশনাবলীর ৭৭ ও ৭৮ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত অব্যবহৃত ভূমি পূর্বতন মালিকের অনুকূলে অবমুক্তির সুযোগ নেই। তাই ২০০১ সালের ৯ জুলাইয়ে আবেদনকারীর আবেদন না মঞ্জুর করা হলো।
তবে পাল্টা অভিযোগ করে ‘অধিগ্রহণ না হওয়া হালিশহরের কৃষি জমি পুনরুদ্ধার সংগ্রাম কমিটির’ সভাপতি সৈয়দ মুহাম্মদ এনামুল হক মুনিরী বলেন, ‘২০১৭ সালের ৯ মে তৎকালীন জেলা প্রশাসক একতরফা, মনগড়া প্রতিবেদন উচ্চ আদালতে দিয়েছেন। ১৯৯৭ সালের অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নির্দেশনাবলীর যেসব কথা তিনি প্রতিবেদনে লিখেছেন, তা হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে কী তারা উপস্থাপন করেননি? হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় তাদের আইনজীবী ও খোদ অ্যাটর্নি জেনারেল পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন। এরপরও তো রায় আমাদের পক্ষে এসেছে। যারা ১৯৯৭ সালের অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নির্দেশনাবলীর কথা বলছেন, তারা কী মহামান্য হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টকে আইন শেখাচ্ছেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ ‘লিভ টু আপিল’ নামঞ্জুর করে আমাদের পক্ষে দেয়া হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। এ জায়গাকে কেন্দ্র করে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট- কোন আদালতের আদেশ মানেনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এ কারণে আমরা হাইকোর্টে আদালত অবমাননার প্রতিকার চাইবো কয়েক দিনের মধ্যেই। এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।’
এদিকে আইনি এসব জটিলতা নিরসন না করে তড়িঘড়ি করে চট্টগ্রাম ওয়াসার ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে নেমে পড়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন প্রকল্প নিলে ওয়াসার এমডিসহ কিছু কর্মকর্তার পকেট ভারি হয়, পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এটার ব্যতিক্রম হয়নি।
৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে হতে যাওয়া পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের জন্য ৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সাথে ওয়াসার চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১৯ সালের নভেম্বরে। অভিযোগ উঠেছে, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিইটিইএস-এ চাকরি করেন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ’র মেয়ে সুমাইয়া বিনতে ফজলুল্লাহ। আর মালয়েশিয়াভিত্তিক আরেকটি প্রতিষ্ঠান এরিঙ্কোতে আগে কাজ করতেন তিনি। মেয়ের দুটি কর্মস্থলকে পরামর্শক নিয়োগের অভিযোগ ওয়াসার এমডির বিরুদ্ধে। এর আগেও বিভিন্ন সময় ওয়াসা এমডির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপোষণের মাধ্যমে লাভবান হওয়ার অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছিল। এসব বিষয় নিয়ে দুদকও তদন্তে নেমেছে। মেয়ের প্রতিষ্ঠান কীভাবে নিয়োগ পেল তা জানতে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুল্লাহকে কল করার পাশাপাশি খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।
এদিকে হালিশহরের স্যুয়ারেজ প্রকল্পের ফলে ভুক্তভোগী জমির মালিকদের প্রতিনিধি ছৈয়দ মুহাম্মদ এনামুল হক মুনিরী বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো জায়গা ডি-রিকুইজিশন একবার হলে সরকার যদি আবারও প্রয়োজনবোধ করেন তাহলে পুনরায় জায়গাটি রিকুইজিশন করতে হবে। এত আইন, নিয়ম-কানুন থাকার পরও কোনো কিছু মানা হচ্ছে না। আমরা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় জানানোর পরও এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।’ শুরুর দিকে জায়গাগুলোর মালিক ৪০০-৫০০ জনের মতো ছিলেন উল্লেখ করে এনামুল বলেন, ‘পরে ওয়ারিশ বাড়তে বাড়তে বর্তমানে ৮ হাজারের মতো মালিক রয়েছেন।’
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ‘ডি-রিকুইজিশন’ হয়ে যাওয়া জমি ক্ষতিপূরণ ছাড়াই পুনরায় দখলে নেয়া যাবে না। এরপরও ডি-রিকুইজিশন নোটিশ জারি হওয়া জমিতে গতকাল রোববারও ওয়াসার প্রকল্পের কাজ চলে। এ বিষয়ে জানতে স্যুয়ারেজ প্রকল্পের পরিচালক ও ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

‘ডি-রিকুইজিশন’ হয়ে যাওয়া জমি ক্ষতিপূরণ ছাড়াই পুনরায় দখলে নেয়া প্রসঙ্গে জানতে গতকাল রোববার চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহর মুঠোফোনে অসংখ্যবার যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এছাড়া খুদেবার্তা পাঠিয়ে উক্ত বিষয়ে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে এ বিষয়ে সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘প্রথমত আদালত থেকে আমরা কোনো সমন পাইনি। যদি কোনো সমন পেতাম তাহলে অবশ্যই আমাদের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতো (যদিও বাদীপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আফরোজা আকতার জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম ওয়াসা আদালতের সমন রিসিভ করেও শুনানিতে অংশ নেয়নি)। দ্বিতীয়ত একটি চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে এভাবে নিষেধাজ্ঞা দেয়া যায় না। আর এ বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং সেখান থেকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসক তা সুরাহা করে ওয়াসার পক্ষে মতামত দিয়ে তা সুপ্রিমকোর্টকে অবহিতও করেছে। এখন হয়তো নিম্ন আদালতে বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। আমাদের প্রতিনিধি আদালতে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনি জটিলতায় শেষ পর্যন্ত পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পটি হালিশহরে হোক বা না হোক কমিশন বাণিজ্য কিন্তু ঠিকই করে নিচ্ছেন ওয়াসা এমডি। জমির ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না বলে ঊর্ধ্বতন মহলে ভুল তথ্য দিয়ে তিনিই ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটিকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে হাসান আলী নামের এক গ্রাহক হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রহস্যজনকভাবে ওয়াসা ভবনের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে আগুন লাগে। আগুনে অফিসের কাগজপত্র, কম্পিউটার ও টেবিল পুড়ে যায়। তবে সে সময় ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের উপ-সহকারী পরিচালক ফরিদ আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটেনি। কীভাবে আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে সেটি তারা খতিয়ে দেখবেন।’ অন্য দিকে, ওয়াসার শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, এই ঘটনার সঙ্গে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রিট আদেশের যোগসাজশ আছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ ধ্বংস করতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি সাজানো হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে-ওয়াসা ভবনে আগুন পরিকল্পিত নাকি নিছক দুর্ঘটনা।
এদিকে ওয়াসার প্রকল্পে আদালতের নিষেধাজ্ঞা আসার পর গত ৯ এপ্রিল চট্টগ্রামের সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন ‘অধিগ্রহণ না হওয়া হালিশহরের কৃষি জমি পুনরুদ্ধার সংগ্রাম কমিটির’ নেতারা। এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি সৈয়দ মুহাম্মদ এনামুল হক মুনিরী বলেন, ‘আমাদের দাবির পক্ষে থাকা নথিগুলো দেখতে চেয়েছিলেন মেয়র মহোদয়। আমরা ওনাকে সেগুলো দেখিয়েছি। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনকিছু জানতে চাওয়া হলে আমাদের যৌক্তিক দাবি তিনি অবহিত করবেন বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’


