- রিভার ভিউ নামের এই কমিউনিটি সেন্টারের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে চলছে কর্ণফুলী উপজেলার কার্যক্রম।
জিন্নাত আয়ুব, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) : ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল উপজেলা হিসেবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর যাত্রা শুরু হয়। এরপর গত ৫ বছরে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে ছয়জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে একজন পদায়নের আদেশ বাতিল করলেও বাকি পাঁচজন তুলনামূলক স্বল্প সময়ের জন্য ইউএনও পদে কাজ করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্ণফুলীতে ইউএনও পদে কর্মকর্তা এলেও তদবির করে বদলি হয়ে চলে যান। এর কারণ কর্ণফুলীতে ইউএনও’র জন্য বাসভবন নেই। রিভার ভিউ নামের একটি কমিউনিটি সেন্টারের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে চলছে উপজেলার কার্যক্রম।
এছাড়া উপজেলার বেশ কয়েকটি দপ্তরে প্রধান কর্মকর্তা নেই। এসব দপ্তরে সহকারী অথবা অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে উপজেলার স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস সহকারী (পিএ) দিপু চাকমা একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন, কর্ণফুলী উপজেলায় মৎস্য, খাদ্য, কৃষি, বিআরডিবি এসব দপ্তর থাকলেও নেই কর্মকর্তা। এসব দপ্তরসহ বেশ কয়েকটি দপ্তরের কার্যক্রম সমন্বয় করা হয় অন্য উপজেলার কর্মকর্তা দিয়ে। এছাড়া সমবায়, পরিসংখ্যান, যুব উন্নয়নসহ কয়েকটি দপ্তরের কার্যক্রম এখনো চালু হয়নি। কর্ণফুলী উপজেলায় নেই হাসপাতালও। এসব কারণে কর্ণফুলীতে ইউএনওরা থাকতে চান না বলে জানান দিপু চাকমা।
সর্বশেষ গত ১৩ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে কর্ণফুলীর বর্তমান ইউএনও শাহিনা সুলতানাকে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের উপ-পরিচালক পদে পদায়ন করা হয়।
এর আগে কর্ণফুলী উপজেলার প্রথম ইউএনও ছিলেন মোহাম্মদ আহসান উদ্দিন মুরাদ। ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি নিয়োগ পান। নিয়োগের তিন মাসের মাথায় তাকে বদলি করা হয়। বদলির ৮ দিন পর তা আবার স্থগিত করে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। পরে আবারও বদলি হন।
এরপর, ২০১৭ সালের ৫ জুলাই আহসান উদ্দিন মুরাদের স্থলাভিষিক্ত হন বিজেন ব্যানার্জী। তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৯ তম ব্যাচের কর্মকর্তা। নিজ বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার জুড়ি উপজেলা। তিনিও এক বছরের বেশি থাকতে পারেননি।
২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর উপজেলার তৃতীয় ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন সৈয়দ শামসুল তাবরীজ। তিনি ৩০ তম বিসিএসের কর্মকর্তা। নিজ জেলা ফেনী। অল্প সময়ে তিনি সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি যেতে পেরেছিলেন এবং আস্থা অর্জন করেছিলেন। ১ বছর ৪ মাস ৭ দিন পর তিনিও বদলি হন।
পরে কর্ণফুলী উপজেলার নতুন ইউএনও হিসেবে নিয়োগ পান বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তা প্রবীর কুমার রায়। তিনি কর্ণফুলী উপজেলায় পদায়নের আদেশ বাতিল করে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় বদলি নেন।
এরমধ্যে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নতুন ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন মো. নোমান হোসেন। এর পাঁচ মাস যেতে না যেতেই হঠাৎ একই বছরের ২৯ জুলাই তিনিও বদলি হন।
এরপর ওই বছরের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত এক আদেশে কর্ণফুলীর ইউএনও হিসেবে নিয়োগ পান শাহিনা সুলতানা।
২৮তম বিসিএস ব্যাচের এ কর্মকর্তা ২০২০ সালের ৩০ জুলাই উপজেলায় যোগদান করেন। যদিও এই উপজেলায় অতীতে নিয়োগপ্রাপ্ত সকল ইউএনওদের স্থায়িত্বকালের রেকর্ড ভেঙে তিনি ১ বছর ৮ মাস ২৮ দিন সংশ্লিষ্ট উপজেলায় কর্মরত ছিলেন।
বদলির বিষয়ে জানতে সদ্য বদলি হওয়া ইউএনও শাহিনা সুলতানাকে ফোন দিলে তিনি সাড়া দেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়ে কর্ণফুলী থেকে তিনিও দ্রুত সময়ের মধ্যে বদলি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে, ফিরতি বার্তায় ‘ধন্যবাদ’ লিখে বিষয়টি এড়িয়ে যান শাহিনা সুলতানা।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৯ মে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার)-এর ১১২ তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকার চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলাধীন চরলক্ষ্যা, চরপাথরঘাটা, শিকলবাহা, জুলধা ও বড়উঠান ইউনিয়ন সমন্বয়ে কর্ণফুলী থানাকে উপজেলায় উন্নীতকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু হয়।
উপজেলা হিসেবে যাত্রা শুরুর পর ৫ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো প্রয়োজনীয় স্থাপনা গড়ে তোলা হয়নি কর্ণফুলীতে।
কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস সহকারী (পিএ) দিপু চাকমা বলেন, কর্ণফুলী উপজেলা শুরুর ৫ বছর হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন তেমন হয়নি বলা চলে। যার কারণে এখানে কোন ইউএনও স্যার আসলেও এত বেশি ঝামেলা নিয়ে বেশিদিন থাকতে চান না।
একজন বিদায়ী ইউএনও নাম প্রকাশ না করার শর্তে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কর্ণফুলীতে ইউএনও পদে কাজ করতে নানা অসুবিধা হয়। ইউএনও’র জন্য সেখানে কোন বাসভবন নেই। শহরে থাকতে হয়। সেখান থেকে আসা-যাওয়া করতে হয়। এছাড়া সরকারি আরও কিছু অফিস চালু হয়নি। চালু হওয়া কয়েকটি দপ্তরে আবার কর্মকর্তা নেই। একটি কমিউনিটি সেন্টারে উপজেলার দাপ্তরিক কাজ চালাতে হয়। এ পরিস্থিতিতে কাজ করা কঠিন।’
জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারুক চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এই উপজেলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর ৫ বছর হলেও কাজের অগ্রগতির দিক দিয়ে আমরা অনেক পেছনে। অন্যান্য উপজেলায় একজন নির্বাহী কর্মকর্তার যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে তা এই উপজেলায় এখনো গড়ে উঠেনি। যেমন ইউএনওর একটা বাসভবন নেই। তাদের প্রতিদিন মহানগর থেকে যাতায়াত করতে হয়। হয়তো এসব কারণেই তারা নিজেরা তদবির করে বদলি হন। অন্য কোন কারণ নেই। তবে সদ্য বদলি হওয়া ইউএনও শাহিনা সুলতানা অন্যদের চেয়ে ভিন্ন ছিলেন। তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করে গেছেন এই উপজেলার জন্য।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নতুন উপজেলা হলে সেই উপজেলার জন্য ভবন হবে, ইউএনও’র জন্য বাসভবন হবে, সেসব সিদ্ধান্ত আগেই নেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এটা হওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কর্ণফুলীতে এসব স্থাপনা কবে হবে সেটা আমার জানা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব নিয়ে নিশ্চয়ই প্রস্তাব গিয়েছে। জমি অধিগ্রহণ হবে। টাকা-পয়সার সংস্থানের বিষয় আছে। তবে এক সময় এসব করতে তো হবে। না করে তো থাকবে না। এর চেয়ে আরও অগ্রাধিকার প্রকল্প আছে। সেগুলো হচ্ছে। আর এটা যেহেতু মাননীয় ভূমিমন্ত্রী মহোদয়ের এলাকা, তিনি নিশ্চয়ই উদ্যোগ নেবেন।’
‘তবে এটা ঠিক কর্ণফুলীতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় প্রশাসনিক কাজে কিছুটা সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে। নতুন উপজেলা হলে সব জায়গায় এটা হয়। আস্তে আস্তে সব হবে।’ বলেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

