‘বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ি পোর্ট চট্টগ্রাম বন্দরের বাণিজ্যে নবদিগন্ত উন্মোচন করবে’

একুশে প্রতিবেদক : বে-টার্মিনাল সড়ক ও কক্সবাজারে মহেশখালী উপজেলায় চলমান “মাতারবাড়ি পোর্ট ডেভেলপমেন্ট ” শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বাণিজ্যে এক নবদিগন্ত উন্মোচন হবে। বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা বেড়ে যাবে প্রায় তিন থেকে চার গুণ। মাতারবাড়ি টার্মিনাল বাস্তবায়িত হলে ডিপ ড্রাফট ভেসেল তথা ১৬ মিটার বা ততোধিক গভীরতাসম্পন্ন বাণিজ্যিক জাহাজ গমনাগমন করতে সক্ষম হবে। যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

রোববার (২৪ এপ্রিল) বিকালে চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান।

সংবাদ সম্মেলনে বন্দর চেয়ারম্যান আরও বলেন, বে-টার্মিনাল বাস্তাবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের ঝামেলা কমবে। অভ্যন্তরীণ কন্টেইনারগুলো পরিবাহিত করতে সুবিধা হবে। অন্যদিকে মাতারবাড়ি হলে কোস্টাল শিপিং, লাইটারিং এসব ঝামেলা থেকে মুক্ত হবে চট্টগ্রাম বন্দর। গত বছর এ প্রকল্পসমূহের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের ২৮৩ দশমিক ২৭ একর জমি কক্সবাজার জেলা প্রশাসন চট্টগ্রাম বন্দরকে বুঝিয়ে দিয়েছে। শীঘ্রই বন্দর নির্মাণ কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করা হবে। বে-টার্মিনাল প্রকল্পাধীন ৬৭ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন দখল ২০২১ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। আরও ৮০৩ একর জমি নামমাত্র প্রতীকি মূল্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভূৃমি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বে-টার্মিনালেে বেশি গভীরতা ও বেশি দৈর্ঘের জাহাজ দিন-রাত ভেড়ানোর সুযোগ থাকবে। ২০২৫ সালের মধ্যে ১৫’ শ মিটার দৈর্ঘ্যের মাল্টিপারপাস টার্মিনাল এবং ১২২৫ ও ৮০০ মিটার দৈর্ঘ্যের দিটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শেষ করার লক্ষ্যে কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘বছরে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের লক্ষ্যে নির্মাণাধীন পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) নির্মাণ কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ১ হাজার ২২৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এখানে ৬০০ মিটার জেটিতে একসঙ্গে ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের তিনটি কনটেইনারবাহী জাহাজ এবং ২২০ মিটার দৈর্ঘ্যের ডলফিন জেটিতে একটি তেলবাহী জাহাজ ভিড়ানো যাবে।ঃ

বন্দরের সক্ষমতা বেড়েছে জানিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান জানান, গত এক দশকে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ৫ লক্ষ ৮০ হাজার বর্গমিটার ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে কনটেইনার ধারণ ক্ষমতা ৫৫ হাজার এ উন্নিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং এলাকায় ওভারফ্লো কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং সদরঘাট এলাকায় একটি ৭৫ মিটার লাইটারেজ জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। ইতিপূর্বে ৪০০ মিটার লাইটারেজ জেটি ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সচল করা হয়েছে। এতে লাইটার জাহাজগুলোর দ্রুততম কম সময়ে খালাস করায় লাইটার জাহাজের ওয়েটিং টাইম হ্রাস পেয়েছে।

‘চট্টগ্রাম বন্দরের পোর্ট নর্টিক্যাল মাইল ৭ থেকে ৫০ করা হয়েছে। ফলে বন্দরের জলসীমা ৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে মাদার ভেসেলগুলো রিয়েল টাইম টাইডাল ইনফরমেশন সিস্টেমে সমুদ্র থেকে নিরাপদে বহির্নোঙ্গরে যাতায়াত করতে পারছে, যা মেরিটাইম বিশ্বে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। তাছাড়া পোর্ট লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়াতে ২ টি টাগবোট কান্ডারি-৬ ও ১২, ২ টি মুরিং লঞ্চ, ২ টি সাইট স্ক্যান সোনার, ২ টি ইকো সাউন্ডার ও ১ টি সি-গোয়িং লো ফ্রিবোর্ড হার্বার টাগ বোট (২০০০বিএইচপি) সংগ্রহ করা হয়েছে।’ বলেন বন্দর চেয়ারম্যান।

সংবাদ সম্মেলনে বন্দর চেয়ারম্যান জানান, চট্টগ্রাম বন্দরকে ইউএস কোস্টগার্ড এর রিপোর্টে বেস্ট প্রাকটিসেস রিলেটেড টু পোর্ট ফ্যাসিলিটি ডকুমেন্ট এন্ড ফর্মস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও সিঙ্গাপুর ভিত্তিক আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক সংস্থা রিক্যাপ (Recaap) তৃতীয় বারের মতো চট্টগ্রাম বন্দরকে জিরো পাইরেসি পোর্ট হিসেবে ঘোষণা করেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিল -২০২২ সংসদে পাস হয়েছে। এই বিলের মাধ্যমে বন্দর এলাকায় দূষণে জেল-জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এতে কর্ণফুলী নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হবে।

একুশে/এমকেএম