
জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : এক প্রবাসীর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ‘সেকেন্ডারি মেম্বারশিপ’ কিনেও চট্টগ্রাম ক্লাবের ‘পার্মানেন্ট মেম্বার’ হতে পারছেন না চট্টগ্রাম সিটির লালখান বাজার ওয়ার্ডের বহুল আলোচিত-সমালোচিত কাউন্সিলর আবুল হাসনাত বেলাল।
বিতর্কিত বেলালকে ‘মেম্বারশিপ’ না দিতে এক পায়ে খাড়া ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম ক্লাবের বেশিরভাগ সদস্য। এ পরিস্থিতিতে বিপুল টাকা খরচ করে বিদেশে বসবাসকারী এক ব্যক্তির ‘সেকেন্ডারি মেম্বারশিপ’ কিনেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম অভিজাত ক্লাবটিতে প্রবেশ করতে পারছেন না বেলাল।
এতে ‘ক্ষুব্ধ’ আবুল হাসনাত বেলাল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ক্লাবের সদস্যপদ কোনো স্ট্যাটাস বহন করে না। যেসব কারণে মানুষ ক্লাব ব্যবহার করে আমার সেগুলো নেই। আমার (মদের) বার ব্যবহার করা কিংবা জুয়ার কোনো অভ্যাস নেই।’
এদিকে চট্টগ্রাম ক্লাব সূত্রে জানা গেছে, ‘সেকেন্ডারি মেম্বারশিপ’ কেনার অধিকারে গত কয়েক মাসে মাত্র দুইবার ক্লাবে প্রবেশ করে আড্ডা দেয়ার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে ক্লাব কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহের কারণে ক্লাবে আর যাচ্ছেন না আবুল হাসনাত বেলাল। কাউন্সিলর বেলাল যে দুইবার ক্লাবে গেছেন- তখন কখন, কার সাথে গেছেন, কোথায় বসেছেন, কার সাথে আড্ডা দিয়েছেন এসবের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করে রেখেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। এরপর ক্লাব কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্টদের তার সাথে আড্ডা না দিতে অনুরোধ করেছে।
ক্লাব সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ক্লাব কর্তৃপক্ষ একপ্রকার অঙ্গীকারাবদ্ধ, তারা কোনোভাবেই একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে ক্লাবের স্থায়ী সদস্যপদ দিয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না, নষ্ট করতে চায় না ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এই ক্লাবের পরিবেশ।
জানা গেছে, বেশকিছু ক্যাটাগরির ‘মেম্বারশিপ’ আছে চট্টগ্রাম ক্লাবে। একটা হলো ‘পার্মানেন্ট মেম্বারশিপ’। এই মেম্বারশিপ কিনে নেওয়া যায়। নতুন মেম্বার হতে গেলে ৩৫ লাখ টাকা নেয়া হয়। আরেকটি হলো ‘ট্রান্সফারেবল মেম্বারশিপ’; যদি কেউ নিজের মেম্বারশিপ বিক্রি করতে চায়, সেক্ষেত্রে নূন্যতম ২০ বছর ধরে ক্লাবের মেম্বার হিসেবে থাকতে হবে। এরপরই মেম্বারশিপ বিক্রি করা যাবে। কত টাকায় বিক্রি করা হবে সেটি ওই মেম্বারের ওপর নির্ভর করে। সাধারণ সর্বনিম্ন ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকায় এই মেম্বারশিপ বিক্রি করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা ক্লাবের ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে জমা দিতে হয়।
এছাড়া পার্মানেন্ট মেম্বারদের এক ধরনের সুবিধা দেয় ক্লাব কর্তৃপক্ষ। যেমন, বাবা যদি ১০ বছর ধরে ক্লাব মেম্বার হয়ে থাকেন তাহলে, তার ৩ সন্তান কোনো ধরনের চার্জ ছাড়াই ক্লাবের মেম্বার হতে পারেন। যদিও এক্ষেত্রে মাসিক ‘সাবস্ক্রিপশন ফি’ পরিশোধ করতে হবে। সন্তানের বয়স ২১ থেকে ২৭ বছর হলে, তিনি ‘এসোসিয়েট মেম্বার’ হিসেবে সুযোগ-সুবিধা পাবেন; এক্ষেত্রে তিনি নিজে ক্লাবের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করতে পারলেও কোন অতিথি আনতে পারবেন না। পরবর্তীতে পার্মানেন্ট মেম্বারশিপের জন্য আবেদন করতে হবে। এক্ষেত্রে একজন পিতার ৩ সন্তান যদি ক্লাবের মেম্বার হয় তাহলে তিনি নিজের মেম্বারশিপ বিক্রি করতে পারবেন না।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ক্লাবের সেক্রেটারি নুরুল আমিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পার্মানেন্ট মেম্বার ছাড়াও আমাদের আলাদা কিছু মেম্বারশিপ আছে। ডিপ্লোমেট, জাতীয় ব্যক্তিত্ব, সাবেক ও বর্তমান হাই অফিশিয়ালদের জন্য রয়েছে সম্মানসূচক মেম্বারশিপ। এ ধরনের মেম্বারদের কাছ থেকে মেম্বারশিপের জন্য কোন টাকা নেয়া হয় না। তারা শুধু ক্লাব ব্যবহারসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিতে পারেন। তবে পার্মানেন্ট মেম্বারদের মতো তাদের ভোট দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না।’
‘এছাড়া সিভিল সার্ভিস মেম্বারশিপও দেয় চট্টগ্রাম ক্লাব। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যুগ্ম-সচিব কিংবা ৪র্থ গ্রেডের উপরে যাদের বেতন স্কেল আছে তারা এক্ষেত্রে আবেদন করতে পারেন। ডিফেন্স সার্ভিস মেম্বারশিপও আমরা দিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে মেজর কিংবা তার অধিক র্যাংকের ব্যাক্তিরা আবেদন করতে পারেন। তাদের আমরা মেম্বারশিপ দিয়ে থাকি।’
চট্টগ্রাম ক্লাবের মেম্বারশিপ নিতে প্রয়োজনীয় যোগ্যতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একজন পার্মানেন্ট মেম্বার হতে গেলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। আবেদনকারীকে অবশ্যই স্নাতক ডিগ্রিধারী হতে হবে। বয়সের সময়সীমাসহ আরও বেশকিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। আর ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ডকুমেন্টসসহ আবেদন করতে হবে। ক্লাব কর্তৃপক্ষ সেগুলো চেক করবে। এরপর আবেদনকারী ও যিনি ট্রান্সফার করছেন দুজনেরই ইন্ট্রোডাকশন হবে। এরপর আবেদনকারী ৯০ দিন পর্যন্ত থাকবেন এপ্লিকেন্ট মেম্বার হিসেবে। বিভিন্ন রিভিউ ও রেকর্ড চেক করে ভোটাভুটির মাধ্যমে মেম্বার হতে পারবেন।’
তথ্য মতে, মেম্বারশিপ কাকে দেবে, না দেবে সেটি সম্পূর্ণ ক্লাবের নির্বাহী কমিটির এখতিয়ার। মেম্বারশিপের আবেদন বিবেচনা করার জন্য একটি কমিটি থাকে। সেই কমিটি নির্দিষ্ট একটি দিনে সেগুলো যাচাই বাছাই করে মেম্বারশিপ প্রদানের জন্য বসে। সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর পক্ষে একজন প্রস্তাবক বা সমর্থক থাকেন, মেম্বারশিপ প্রদান কমিটির কাছে ওই সমর্থক বা প্রস্তাবক সবার সামনে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন। নির্বাহী কমিটি ছাড়াও ক্লাবের আগ্রহী সাধারণ সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেন। এসময় অধিকাংশ লোক যদি কারও বিরুদ্ধে অনাস্থা বা ভেটো প্রদান করেন সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির মেম্বার হওয়ার পথটি রুদ্ধ হয়ে যায়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আবুল হাসনাত বেলালের বিরুদ্ধে ভেটো দিতে শতকরা ৯৯ ভাগ সদস্যই এক পায়ে খাড়া। সে হিসেবে মোটা অংকের টাকায় ‘সেকেন্ডারি মেম্বারশিপ’ কিনেও তিনি ক্লাবটির চূড়ান্ত মেম্বারশিপ পাচ্ছেন না, এটা একপ্রকার নিশ্চিত বলে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
যদিও চট্টগ্রাম ক্লাবের সদস্যপদ না পেলে কিছু যায় আসে না বলে মন্তব্য করেছেন কাউন্সিলর আবুল হাসনাত বেলাল। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ক্লাবের সদস্যপদ কোনো স্ট্যাটাস বহন করে না। কাজেই ক্লাবটির সদস্য হলেই যে আমি অনেক কিছু পেয়ে যাবো কিংবা না হলে যে আমার অনেক কিছু চলে যাবে তা কিন্তু না। এটা নিয়ে আমার চিন্তার কিছু নেই। এটা আমার কাছে মূখ্য বিষয় না। সত্যি বলতে যেসব কারণে মানুষ ক্লাব ব্যবহার করে আমার সেগুলো নেই। আমার (মদের) বার ব্যবহার করা কিংবা জুয়ার কোনো অভ্যাস নেই। আমার বাচ্চাদের বিনোদনের জন্য আমি ক্লাবের সদস্য হতে চেয়েছিলাম।’
আবুল হাসনাত বেলাল একুশে পত্রিকাকে আরও বলেন, ‘গত বছরের নভেম্বরের দিকে আমি চট্টগ্রাম ক্লাবের এক পুরোনো সদস্যের পদ ট্রান্সফারের জন্য আবেদন করেছি। যেহেতু ক্লাবের কিছু ক্রাইটেরিয়া আছে সেগুলো পূরণ হলে তারপরই সদস্য হওয়া যায়। এক্ষেত্রে একটু সময়ক্ষেপণ হয়। তাই সেটি এখনও কনফার্ম হয়নি, আবেদন পর্যায়ে আছে। ভেটো প্রদানের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। কে বা কারা কী কারণে ভেটো দিবে? আইনত আমার তো কোনো সমস্যা নেই। কোনো সমস্যা থাকলে আমাকে জানানো হবে, এ ধরনের কিছু আমাকে জানানো হয়নি।’
এদিকে, কাউন্সিলর হওয়ার সাথে সাথেই প্রায় ৩৫ লাখ টাকা খরচ করে আবুল হাসনাত বেলালের চট্টগ্রাম ক্লাবের মেম্বারশিপ কিনতে চাওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সচেতন মহলে। তারা বলছেন, শুধু ক্লাবের মেম্বারশিপ পেতে এত বিপুল অর্থ ঢালতে পারলে প্রকৃতপক্ষে বেলাল কত টাকার মালিক সেই প্রশ্নটিও সামনে চলে আসে।
অপরদিকে, রাউজানের সাংসদ, রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী চট্টগ্রাম ক্লাবের পুরোনো মেম্বার। বাবার পথ ধরে নিয়মিত মেম্বারশিপ প্রাপ্তির জন্য তার সন্তান ফারাজ করিম চৌধুরী আবেদন করেছেন। ফজলে করিম চৌধুরী ক্লাব চেয়ারম্যান নাদের খানকে ফোন করার পরও ফারাজের আবেদনটি শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঝুলে আছে বলে জানা গেছে।
এর কারণ, ক্লাব কর্তৃপক্ষ ফারাজ করিমের কিছু কিছু ভিডিওতে এগ্রেসিভ, মারমুখী দৃষ্টিভঙ্গিকে ভালো চোখে দেখছেন না। ক্লাব সংশ্লিষ্ট কারও কারও ধারণা, ফারাজ করিম মেম্বারশিপ পাওয়ার পর রাউজানের ‘রোল’ যদি ক্লাবে ‘প্লে’ করেন তাহলে সামাজিক ক্লাবটির পরিবেশ নষ্ট হতে পারে।
এ বিষয়ে ফারাজ করিমের বক্তব্য জানা যায়নি। তবে গত ১৫ এপ্রিল ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে ফারাজ করিম চৌধুরী ঘোষণা দেন, সালিশী বিচার করতে গিয়ে ব্যক্তিগত ফেসবুক পেইজে অভিযুক্তদের যেসব ভিডিও আপলোড করেছেন, তা মুছে দেবেন। তিনি দাবি করেন, সালিশে অভিযুক্তদের অধিকাংশই সুপথে ফিরে এসেছেন। তাই ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
অবশ্য ক্লাবের একাধিক সদস্যের দাবি, বিলম্বিত হলেও ফারাজ করিমের মেম্বারশিপ ঠেকানোর সুযোগ কম। ব্যক্তিগত ইমেজ ও ক্লাব মেম্বার বাবার সূত্রে তিনি এক সময় মেম্বারশিপ পেয়ে যাবেন।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ক্লাবের চেয়ারম্যান নাদের খান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ক্লাব একটি ঐতিহ্যবাহী ক্লাব। এর পরিবেশ নষ্ট করবে এমন বিতর্কিত, এগ্রেসিভ আচরণের কাউকে চট্টগ্রাম ক্লাবের মেম্বারশিপ দেওয়া হলে তা অন্যান্য সদস্যদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় এমন কারও জায়গা চট্টগ্রাম ক্লাবে অতীতে হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।’
