মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯

যুবলীগের সম্মেলন উপলক্ষে দক্ষিণ জেলায় ‘চাঁদাবাজি’

প্রকাশিতঃ ২৪ মে ২০২২ | ৩:৫৪ অপরাহ্ন

জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবলীগের আসন্ন সম্মেলনে সবমিলে ১২ লাখ টাকা খরচ হতে পারে বলে জানিয়েছেন সভাপতি আ ম ম টিপু সুলতান চৌধুরী। আর সম্মেলনের খরচ বাবদ দক্ষিণের শুধু তিনজন সংসদ সদস্যই অন্তত ১৩ লাখ টাকা নগদ দিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এর বাইরে দক্ষিণ জেলার আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও আর্থিকভাবে সহযোগিতা দিচ্ছেন।

এরপরও সম্মেলনের খরচের নামে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে সিভি জমা দেওয়া প্রার্থীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁদা আদায়ের এই কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, দক্ষিণ জেলা যুবলীগের বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক (আসন্ন কমিটির সভাপতি পদপ্রার্থী) পার্থ সারথি চৌধুরীর বিরুদ্ধে।

দক্ষিণ জেলা যুবলীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্মেলন প্রস্তুতি সভার নামে গত ২২ মে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে সিভি জমা দেওয়া প্রার্থীদের জরুরি তলব করা হয়। এতে সম্মেলন, ব্যানার তৈরি ও অন্যান্য খরচের অজুহাতে পদ-প্রত্যাশীদেরকে চাঁদার টাকা (৩০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত) নির্ধারণ করে দেন পার্থ সারথি চৌধুরী।

শীর্ষ দুই পদে আগ্রহী ৫২ জনের (সভাপতি পদে ১৩ ও সাধারণ সম্পাদক পদে ৩৯) মধ্যে অন্তত ২৬ জন বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ওই দিনের সভায় উপস্থিত হননি। যদিও অনুপস্থিত থেকেও রক্ষা পাননি প্রার্থীরা। তাদের ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে চাঁদার অংক। অনেকেই বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ। আবার কেউ কেউ অসন্তুষ্ট থাকলেও মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। প্রতিবাদ করলে তা নিজের পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার কারণ হবে এই আশঙ্কায় নিশ্চুপ রয়েছেন অনেকেই।

দক্ষিণ জেলা যুবলীগের শীর্ষ পদ-প্রত্যাশী একজন ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সম্মেলনের জন্য পার্থ সারথি আমাদের যার কাছ থেকে যেমন পারছেন তেমন অর্থ আদায় করছেন। বলছেন এটা নাকি কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ। কেন্দ্রই নাকি বলেছে প্রার্থীদের টাকায় সম্মেলন করতে। কয়েকদিন আগে এটা বলেই আমাদের চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর যারা উপস্থিত হয়নি তাদের ফোন করে চাঁদার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ জেলা যুবলীগের একজন নেতা বলেন, ‘শুধু প্রার্থী নয়, বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও সম্মেলনের নামে চাঁদাবাজি করছেন পার্থ সারথি। প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সাথে নরম সুরে আর ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনেকটা জোর করেই আদায় করছেন এসব অর্থ। কেউ চাঁদা দিচ্ছেন পার্থ সারথিকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আবার কেউ দিচ্ছেন ভয়ে। কেউ চাঁদা দিতে অসম্মতি জানালে তাকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন তিনি।’

যদিও সম্মেলনের যাবতীয় খরচের দায়িত্ব নিয়েছেন দক্ষিণের তিনজন সংসদ সদস্য। দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, জাতীয় সংসদের হুইপ ও চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী ৫ লাখ টাকা প্রদানের পাশাপাশি ১ হাজার লোকের খাওয়া-দাওয়ার দায়িত্ব নিচ্ছেন, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ৩০০ জনের খাবারের ব্যবস্থা করছেন নিজের বাড়িতে। পাশাপাশি পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু-তে কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের থাকার ব্যয়ভারও বহন করবেন তিনি।

দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদও ৫ লাখ টাকা দিচ্ছেন দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সম্মেলনের জন্য। এছাড়া সম্মেলন উপলক্ষে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমদও দিচ্ছেন ৩ লাখ টাকা। এছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও সম্মেলন উপলক্ষে সাধ্যমতো আর্থিক সহযোগিতা করছেন।

জানা গেছে, দক্ষিণের সম্মেলনে সর্বোচ্চ ১০-১২ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। তবে সম্মেলন উপলক্ষে সবমিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার ইতোমধ্যেই এসেছে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির হাতে। এরপরও প্রার্থীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেখানে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজদের বাদ দিয়ে মানবিক যুবলীগের পতাকা উড়াচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতারা, সেখানে সম্মেলন উপলক্ষে জোর করে চাঁদাবাজি হলে যুবলীগের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হবে।

এদিকে, দক্ষিণ জেলার স্থানীয় মন্ত্রী-এমপিদের আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি সত্য বলে একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সভাপতি আ ম ম টিপু সুলতান চৌধুরী; তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সম্মেলন উপলক্ষে সর্বসাকুল্যে ১২ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে কে কত টাকা দিয়েছেন তা সঙ্গত কারণেই আমি জানাতে পারছি না।’ এ বিষয়ে জানতে সাধারণ সম্পাদক পার্থ সারথি চৌধুরীর সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রার্থীদের কাছ থেকে তার (পার্থ সারথি চৌধুরী) চাঁদাবাজির বিষয়টি আমার জানা নেই। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। তবে এমন অভিযোগ আমাদের জন্য অবশ্যই বিব্রতকর। যেহেতু বিদায় বেলায় আমি কলঙ্ক নিয়ে যেতে চাই না। আমি চাই সুন্দর একটা সম্মেলন সবাইকে উপহার দিতে।’- যোগ করেন আ ম ম টিপু সুলতান চৌধুরী।

যদিও এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত পার্থ সারথি চৌধুরী; তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীদের সাথে আর্থিক অংশগ্রহণসহ যাবতীয় বিষয়ে মতবিনিময় করেছি। কিন্তু আমরা কাউকে চাঁদা নির্ধারণ করে দেইনি। সম্মেলন সফল করতে নিজ তাগিদে যে যা দিতে চায় দেবে। আমি নিজেও সহযোগিতা করছি, প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত দিচ্ছি। কে এই অভিযোগ করেছে তার নাম বলেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কে কত টাকা কন্ট্রিবিউশন করেছে তা আপনাকে আমি বলতে পারবো না। সেটা আমাদের বিষয়, আমরা কি করছি না করছি এটা আপনাকে বলবো কেন? এটা আমরা সাংগঠনিক নেতৃবৃন্দের কাছে প্রকাশ করবো। আপনার জানার প্রয়োজন হলে যারা কন্ট্রিবিউট করেছে তাদের কাছে জেনে নিন।’- বলেন পার্থ সারথি চৌধুরী।

যবলীগের সম্মেলন উপলক্ষে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে পেরে রীতিমতো অবাক হয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান; একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘যে অভিযোগটি উঠেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের জন্য বিব্রতকর। একজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ থাকা উচিত নয়। আমি মনে করি, তদন্ত ও যাচাইয়ের মাধ্যমে সত্যতা পেলে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় যুবলীগের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সম্মেলনে কে কত টাকা কন্ট্রিবিউশন করেছে তা নিয়ে লুকোচুরির কী আছে? তারা লুকাচ্ছে কেন? বলতে অসুবিধা কোথায়? যারা কন্ট্রিবিউট করেছে তারা তো দায়িত্ব নিয়েই করেছে। কাজেই সেটা লুকানোর কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে তো জানাতে হবে।’ যোগ করেন মফিজুর রহমান।