যাত্রীছাউনি ও ফুটপাত দখল করে ইট-বালুর ব্যবসা


এম কে মনির : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশের যাত্রীছাউনি ও ফুটপাত দখল করে ইট-বালুর ব্যবসা করছেন স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। ফলে সেই ছাউনি যাত্রীদের কোনো কাজেই আসছে না।

বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, সীতাকুণ্ড পৌরসভার উত্তর বাইপাস এলাকায় দুইপাশে রয়েছে বাস থামার জন্য প্রশস্ত জায়গা। কিন্তু সেখানে সারি সারি ট্রাক, লরি ও পিকআপ দাঁড়িয়ে আছে। স্তূপ আকারে রাখা হয়েছে ইট-বালু, বৈদ্যুতিক খুঁটিসহ নুড়ি পাথর।

সড়ক ও জনপদের একটি সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘নিরাপদ যাত্রী ওঠানামায় বাস স্টপেজ ব্যবহার করুন।’ তার পাশেই আছে জরাজীর্ণ একটি যাত্রী ছাউনি। ইট-বালুর স্তূপে সেটিও ঢাকা পড়েছে। সওজ নির্ধারিত এ বাস স্টপেজে কোন বাস থামে না। ওঠা-নামা নেই কোন যাত্রীর। কেবল নামেই বাস স্টপেজ জায়গাটি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস স্টপেজটিতে কোন বাস না থামলেও স্টপেজটি নিয়ে জনদুর্ভোগের যেন শেষ নেই তাদের। বসেখানে ইট-বালুর ব্যবসার পাশাপাশি অবৈধভাবে ট্রাক পার্কিং করা হচ্ছে। ফলে পাশ্ববর্তী যুবাইদিয়া ইসলামিয়া মহিলা আলিম মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। পথচারীদেরও ধুলাবালি নাকে নিয়ে বাজারে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

এছাড়া বাস স্টপেজ থেকে উত্তর-দক্ষিণে ৩’শ মিটার পর্যন্ত অবৈধ ট্রাক পার্কিং গড়ে ওঠায় মহাসড়ক সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিদিন সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক, পিকআপের মাঝখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের মাদ্রাসায় যেতে হয়। এছাড়া পদচারী সেতু না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, ইট-বালুর ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে বাস স্টপেজকেই দখল করে রেখেছে। আশেপাশে সওজের জায়গা দখল করে দোকানপাট নির্মাণ করেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। বাস স্টপেজের অবৈধ দখলকারীরা এ বাস স্টপেজ চালু না করতে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। সীতাকুণ্ডে অনির্ধারিত জায়গায় বাস থামার ফলে একের পর দুর্ঘটনা ঘটলেও নির্ধারিত এ বাস স্টপেজটিকে চালু করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কোন উদ্যোগ নেই।

একই অভিযোগ করে ৮ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ইট-বালুর ব্যবসায়ীরা বাস স্টপেজটিকে দখল করে রেখেছে। তারা চায় না এখানে বাস থামুক। অন্যদিকে সীতাকুণ্ডে অনির্ধারিত বাস স্টপেজ গড়ে ওঠে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক ও জনপদ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাস স্টপেজটি চালু করা হলে দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনা দুটিই কমবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘এখানে সড়ক ও জনপদের বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে বাস স্টপেজ চালুর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে পৌরসভাকেও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। বাস মালিক সমিতি, পৌরসভা ও সওজের যৌথ প্রচেষ্টায় এখানে বাস থামার ব্যবস্থা করা সম্ভব।’

সীতাকুণ্ড নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব গিয়াস উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বাস স্টপেজটি কার্যকরে পৌরসভা, সওজসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। বিশৃঙ্খলভাবে বাস থামার ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। অপরদিকে মূল বাস স্টপেজ ইট-বালুর দখলে। শিক্ষার্থী ও জনসাধারণকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস স্টপেজের জায়গা দখল করে একেক সময় একেক ব্যক্তি ইট-বালু ব্যবসা করেন। বর্তমানে জায়গাটি দখল করে ইট-বালু ব্যবসা করে আসছেন দক্ষিণ ইদিলপুরের বাসিন্দা মো. কাইয়ুম ও আবুল কালাম, সোবহান বাগের বাসিন্দা মফিজুর রহমান ও ভাটেরখীলের মো. আজম। তারা অবৈধভাবে বাস স্টপেজের জায়গা দখল করে স্তূপ করে রাখছেন ইট, বালু ও নুড়ি পাথর। দিনরাত এসব ইট-বালু ট্রাক থেকে ওঠা-নামা করা হয় বাস স্টপেজের জায়গায়।

জানতে চাইলে অভিযোগ স্বীকার করে ইট-বালু ব্যবসায়ী মো. কাইয়ুম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি রাতে ইট রেখে সকালে নিয়ে যাই। প্রতিদিন রাতে শুধু একটি ট্রাকে করে ইট রাখি বাস স্টপেজের জায়গায়। তবে সবসময় রাখি না।’

অভিযোগের বিষয়ে বালু ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, ‘আমি শুধু বালু রাখি। আমরা যদি ব্যবসা না করি তাহলে খাবো কী?’ সড়ক দখল করে ব্যবসা কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবাই সরিয়ে নিলে আমিও সরিয়ে নেব।’

একই কথা বলেন ইট ব্যবসায়ী মো. আজম। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে দীর্ঘ দিন ইট রাখছি। বাস স্টপেজ চালু হলে অবশ্যই আর রাখব না। দখল ছেড়ে দেব। মহাসড়ক ইট রাখার জায়গা নয় সেটি আমরাও জানি। কেউ বাধা দেয় না, তাই রাখি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড পৌরসভার মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা বদিউল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি বারবার চেয়েছি নির্ধারিত জায়গায় বাস স্টপেজ করতে। অনির্ধারিত জায়গায় বাস থামার ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। মূল বাস স্টপেজকে ইট-বালু ব্যবসায়ী ও স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারের মালিক দখল করে রেখেছে। কিছু বৈদ্যুতিক খুঁটিও সেখানে পড়ে আছে। এতে পৌরসভার কাজও ব্যাহত হচ্ছে। আমি এর আগেও সওজকে চিঠি দিয়েছি পৌরসভা থেকে। সওজ কার্যকর ব্যবস্থা নিলে পৌরসভা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’

এ বিষয়ে সড়ক ও জনপদ চট্টগ্রামের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘শীঘ্রই অবৈধ ইট-বালু ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হবে। সীতাকুণ্ডে অনির্ধারিতভাবে বাস থামার স্থানকে ঘিরে যেসব কাউন্টার গড়ে ওঠেছে তাদেরকে নোটিশ দেয়া হয়েছে। অচিরেই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।’