হাটহাজারীতে নলকূপ বরাদ্দ: এক ইউনিয়নে ২৪টি, আরেক ইউনিয়নে একটি!


এম কে মনির : সারাদেশের প্রতিটি উপজেলায় মানুষের জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে আর্সেনিকমুক্ত গভীর নলকূপ স্থাপনের প্রকল্প নিয়েছে সরকার। আর ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত করেছেন হাটহাজারী ‍উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম রাশেদুল আলম।

নিয়ম অনুযায়ী, বরাদ্দকৃত গভীর নলকূপের ৫০ শতাংশ স্থান ঠিক করবেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। বাকি ৫০ শতাংশ স্থান নির্বাচন করবে ইউনিয়ন ওয়াটসন কমিটি। আর ইউনিয়ন ওয়াটসন কমিটির তালিকা উপজেলা ওয়াটসন কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।

কিন্তু সরকারি নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করে নিজ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৮২টি নলকূপ নিজের ইচ্ছেমতো স্থানে বসানোর জন্য ২০২০ সালের ১৮ জুন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের হাটহাজারীর সহকারী প্রকৌশলী সুদর্শন চাকমাকে চিঠি দিয়েছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম রাশেদুল আলম। চেয়ারম্যানের চিঠির প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে বেশ কিছু (সঠিক সংখ্যাটি হাটহাজারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল জানাতে পারেনি) গভীর নলকূপ স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে; উপজেলা প্রশাসনের আপত্তির কারণে বাকি নলকূপ স্থাপন স্থগিত রয়েছে। মূলত উপজেলা চেয়ারম্যানের নিজের পছন্দের লোক এবং অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে নলকূপগুলো বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে হাটহাজারীর ১৪টি ইউনিয়নের প্রত্যেকটিতে ১৩টি করে মোট ১৮২টি নলকূপ স্থাপনের কথা। কিন্তু ওই অর্থবছরে উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম রাশেদুল আলম নিজের গ্রাম উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নেই সর্বোচ্চ ২৪টি নলকূপ বসানোর স্থান ঠিক করেছেন। এছাড়া ২২টি নলকূপ বসানোর স্থান ঠিক করেছেন চিকনদন্ডী ইউনিয়নে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে উপজেলা চেয়ারম্যানের করা ওই তালিকায় আরও দেখা গেছে, মেখল, দক্ষিণ মাদার্শা ও বুড়িশ্চর ইউনিয়নে ১৭টি করে, মির্জাপুর ইউনিয়নে ১৬টি, শিকারপুর ইউনিয়নে ১৪টি নলকূপ বসানোর স্থান ঠিক করা হয়েছে।

অন্যদিকে গুমানমর্দন ও গড়দুয়ারা ইউনিয়নে ১১টি, ফতেপুরে ১০টি, ধলইয়ে ৯টি, ছিপাতলীতে ৮টি, ফরহাদাবাদে ৫টি ও নাঙ্গলমোড়া ইউনিয়নে মাত্র একটি নলকূপ বসানোর স্থান ঠিক করা হয়েছে। যদিও ওই অর্থবছরে প্রতিটি ইউনিয়নে ১৩টি করে গভীর নলকূপ বসানোর কথা।

জানতে চাইলে হাটহাজারী নাঙ্গলমোড়া ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সিরাজুল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে কোন নলকূপ স্থাপন করা হয়নি। শুধু নলকূপ না কোন চিঠিও দেয়া হয়নি। এমনকি ওয়াটসন কমিটির সভা পর্যন্ত হয়নি। ওইসময় যিনি সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ছিলেন তিনি ভালো মানুষ ছিলেন না। টাকা না দিলে কাজ করতেন না।’

একই বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইউপি চেয়ারম্যান দীর্ঘশ্বাস ফেলে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ১৩টি নলকূপ বসানোর কথা, কিন্তু ৫টি কম দেয়া হয়। এসব নিয়ে আর কী বলবো? উপজেলা চেয়ারম্যান রাশেদুল আলমের এপিএস হিসেবে পরিচিত একজন নলকূপ বিক্রি করেন। সব ক্ষমতা তাদের। এখন উপজেলা পরিষদ একজনের ক্ষমতাবলে চলে। উপজেলা চেয়ারম্যান যেভাবে বলে সেভাবে করে। তার একক রাজত্বে এখানে সবকিছু হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু ২০১৯-২০ অর্থবছর নয়, চলতি অর্থবছরেও ১৩টি থেকে ৩টি করে উপজেলা চেয়ারম্যান কেটে রাখছে। যেগুলো ওনার কোটা। সবকিছুতেই তিনি নিজ গ্রাম উত্তর মাদার্শাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করেন। যেহেতু সেখানে তার রাজনীতি, ওখানের মানুষকে ঘিরে তার অনেক কিছু।’

ওই ইউপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘২০২০-২১ অর্থবছরের রাজস্ব বাজেটও এখনো দেয়া হয়নি। অথচ অর্থবছর শেষ হওয়ার আর মাত্র ৫ দিন বাকি। এখানে উপজেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় মিটিং নাই। কোন কিছু নিয়মিত না। উপজেলা চেয়ারম্যান নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের নামে সবকিছু দিয়ে দেন।’

এদিকে নলকূপ নিয়ে অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানানোর অনুরোধ করে ২০২০ সালের ৯ জুলাই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের হাটহাজারীর সহকারী প্রকৌশলীকে চিঠি দেন তৎকালীন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রুহুল আমীন।

এতে উল্লেখ করা হয়, “হাটহাজারী উপজেলায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে ২৬টি করে মোট ৩৬৪টি নলকূপের বরাদ্দ পাওয়া যায়। বরাদ্দপত্রের শর্তানুযায়ী, মোট বরাদ্দের ৫০ শতাংশ অর্থ্যাৎ ১৮২টি নলকূপের স্থান নির্ধারণ করবেন সাংসদ মহোদয়। অবশিষ্ট ১৮২টি নলকূপের স্থান নির্ধারণ করবে ইউনিয়ন ওয়াটসন কমিটি। পরবর্তীতে উপজেলা ওয়াটসন কমিটি তা অনুমোদন করবেন। কিন্তু আপনার প্রস্তুতকৃত তালিকা যাচাই বাছাই করে দেখা যায়, ইউনিয়ন ওয়াটসন কমিটির কোনো সভা হয়নি। এবং উপজেলা ওয়াটসন কমিটিরও কোনো সভা হয়নি। তাহলে কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ১৮২টি নলকূপের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে?”

আরও উল্লেখ করা হয়, “আপনি আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অর্থ্যাৎ সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ইউনিয়ন এবং উপজেলা ওয়াটসন কমিটির সভা এবং কার্যবিবরণী প্রস্তুত না করে শুধুমাত্র একটি তালিকার (২০২০ সালের ১৮ জুন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের হাটহাজারীর সহকারী প্রকৌশলী বরাবর উপজেলা চেয়ারম্যানের প্রেরণ করা) আলোকে নলকূপ স্থাপনের কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন মর্মে প্রতীয়মান হয়। এছাড়াও বিগত অর্থবছরেও আপনি ইউনিয়ন এবং উপজেলা ওয়াটসন কমিটির সভা ব্যতিরেকে এককভাবে নলকূপ স্থান করেছেন, যা নিশ্চিতভাবেই অনিয়ম। বর্ণিতাবস্থায়, বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আপনাকে অনুরোধ করা হলো। আপনার বক্তব্য পাওয়ার পর তা মন্ত্রণালয় এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে অবহিত করা হবে।”

সেই চিঠির অনুলিপি দেয়া হয় স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, জেলা প্রশাসক, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলীকেও। কিন্তু এখন পর্যন্ত উক্ত বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

হাটহাজারীর তৎকালীন ইউএনওর চিঠির পরও নলকূপ বিতরণে অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা না নেওয়া প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন রায় বলেন, ‘এরকম কোন অনিয়ম হলে সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এরকম স্বেচ্ছাচারিতা করে নলকূপ দেয়া
হতাশাজনক। আমি এর আগে এরকম কোন অভিযোগ পাইনি৷ তবে সাবেক ইউএনও রুহুল আমিনের চিঠি পাওয়ার পর আমরা উপজেলা সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়ে সেটি ঠিক করে নিতে বলেছি। পরবর্তীতে যতটুকু জানি ঠিক করে নেয়ার কথা। এ বিষয়ে আমরা উপজেলা পরিষদে আলোচনা করব। প্রত্যেকটি ইউনিয়নে যেন ১৩টি পায়, সেই ব্যবস্থা করা হবে।’

সেই নলকূপগুলো স্থাপনের বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের হাটহাজারীর সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইকবাল হোসাইন উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আপনি ১৯ সালের কথা ২২ সালে আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছেন? এটা কোন ধরণের কথা। এখানে কোন অনিয়ম হয়নি। সবকিছু ঠিক আছে। নিয়ম বর্হিভূত কাজ করার কোন সুযোগ নেই। এটি পরবর্তীতে ওয়াটসন কমিটির মাধ্যমে ঠিক করেছেন সুদর্শন চাকমা (হাটহাজারীর তৎকালীন সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী)।’

অথচ সুদর্শন চাকমা নিজেই একুশে পত্রিকাকে বলেছেন, এ সমস্যার সমাধান তিনি করে যেতে পারেননি। সুদর্শন চাকমা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নলকূপের স্থান নির্ধারণ ওয়াটসন কমিটি করে। যেখানে প্রধান হচ্ছেন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানরাও থাকেন সেখানে। এখন ওনারা ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে যেভাবে তালিকা দেন আমরা সেভাবেই করি।’ সাবেক ইউএনও রুহুল আমিনের চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিক কিছু বলেননি। পরবর্তীতে এ প্রতিবেদককে কল করে তিনি বলেন, ‘ওইসময় ইউএনও’র চিঠি পাওয়ার পর আমরা বরাদ্দ স্থগিত করে দিই। এরপর ইউএনও’র চাহিদামতো সেটি করার কথা ছিল। পরে আমি বদলি হয়ে গেলে আর ঠিক করতে পারিনি। পরবর্তীতে ঠিক হয়েছে কিনা বলতে পারব না।’

হাটহাজারীর কোন ইউনিয়নে ২৪টি, আর কোন ইউনিয়নে মাত্র একটি নলকূপ দেয়া হচ্ছে- বিষয়টি স্বীকার করে সুদর্শন চাকমা আরও বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ তাদের (জনপ্রতিনিধিদের) বিষয়। আমি চাইলে সঠিকভাবে করতে পারতাম। কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুরোধ ফেলে দেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব ছিলো সেসময়। তিনি আমাকে বললেন যে, এটা এভাবে করেন। আমিও করতে বাধ্য হলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেকটি ইউনিয়নে ১৩টি করে নলকূপ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমার উপর যেমন বর্তায় তেমনি জনপ্রতিনিধিদের উপরও বর্তায়। জনপ্রতিনিধিরা কেন অনিয়মটা করলো? তাদের কি উচিত ছিলো না সঠিকভাবে করার?’

নিজের পছন্দের লোক এবং অর্থের বিনিময়ে নলকূপগুলো বিতরণ করার অভিযোগের বিষয়ে হাটহাজারী ‍উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম রাশেদুল আলম বলেন, ‘২-৩ বছর আগে কী হয়েছে তা আমি মুখস্থ তো আর বলতে পারব না। আমি ২০১৯ সালে প্রথম নির্বাচিত হই। এর আগে যারা উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলো তারা কখনো ওয়াটসন কমিটির সভা করেনি।’

বিভিন্ন ইউনিয়নে নলকূপের সংখ্যায় তারতম্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তৎকালীন সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী যেভাবে বলেছেন আমি সেভাবে করেছি। তখন কেউ কম পেয়েছে কেউ বেশি পেয়েছে, সেটি আমার মনে আছে। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হয় যে যারা আগে কম পেয়েছে তারা পরের বরাদ্দে সেটি সমন্বয় করবে।’

নিজের এলাকায় উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নেই সর্বোচ্চ ২৪টি নলকূপ বসানোর স্থান ঠিক করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম রাশেদুল আলম বলেন, ‘পুরো হাটহাজারী উপজেলা আমার এলাকা। আমি কোন অন্যায় করিনি।’

প্রতিটি ইউনিয়নে ১৩টি নলকূপ বরাদ্দ পাওয়ার কথা, কিন্তু কোন ইউনিয়ন পেয়েছে ২৪টি, আবার কোন ইউনিয়ন মাত্র একটি- এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম সার্কেল) মো. জহীর উদ্দিন দেওয়ান বলেন, ‘আমি এরকম কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’