
জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : বাংলাদেশ ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু তাতে দেশে পলিথিনের ব্যবহার কমেনি, বরং বেড়েছে। চট্টগ্রাম শহরেও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে পলিথিন ব্যাগ। এমন অবস্থায় এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা দূরে থাক, উল্টো বড় আকারের ৪১ হাজার নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)।
বৃহস্পতিবার (৭ জুলাই) বিকেলে নগর ভবনে ১নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ড কাউন্সিলর গাজী মো. শফিউল আজিম এবং ১৬ নং চকবাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর মোস্তফা টিনুর হাতে এসব পলিথিন ব্যাগ আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেন সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। এ সময় সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য কাউন্সিলররা উপস্থিত না থাকলেও ওয়ার্ড কার্যালয়ে ৮ জুলাইয়ে মধ্যে এসব পলিথিন ব্যাগ পৌঁছে দেওয়া হবে।
অথচ ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সুরক্ষা আইনে পলিথিন উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারকারীদের ১ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত জেল এবং ন্যূনতম ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান আছে।
চসিক সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য প্রাথমিকভাবে বড় আকারের ২০০টি করে পলিথিন ব্যাগ বিতরণ করা হবে। যদিও ওয়ার্ড প্রতি ১ হাজারটি করে পলিথিন ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; সে হিসেবে ৪১ হাজার পলিথিন ব্যাগ যাবে ৪১টি ওয়ার্ডে। এসব পলিথিন ব্যাগ ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতা সুপারভাইজারের মাধ্যমে বিতরণ করবে চসিক। ইতোমধ্যেই বেশ কিছু ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতা সুপারভাইজারের কাছে এসব পলিথিন ব্যাগ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
এসব পলিথিন ব্যাগের মাধ্যমে নগরবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন মেয়র রেজাউল। প্রতিটি পলিথিনের উপর নীল কালিতে লেখা আছে, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর পক্ষ থেকে ঈদের শুভেচ্ছা, নিজ আঙ্গিনা ও এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। একটি সুন্দর নগরী গড়ে তুলতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে সহযোগিতা করুন।’
যদিও নিষিদ্ধ পলিথিন রাখা ও ব্যবহারের দায়ে বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করেছে চসিক। জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কর্ণফুলীর নাব্যতা রক্ষায় বিভিন্ন সময় পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে কঠোর হওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন মেয়র। যার প্রেক্ষিতে গত ২৬ জানুয়ারি বাজার কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় নগরের সকল বাজারকে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে পলিথিন মুক্ত করার ঘোষণাও দেন মেয়র রেজাউল।
ঘোষণার পর ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নগরের বাজারগুলোতে কমিটির পক্ষ থেকে মাইকিং, পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার ও লিফলেটসহ পলিথিন বন্ধে বিভিন্ন ধরণের প্রচার প্রচারণাও চালায় চসিক। এমনকি সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট বাজার পরিদর্শন করে ব্যবসায়ীদের পলিথিন ব্যবহার না করতে সতর্কও করেন।
এদিকে, জনপ্রতিনিধিদের হাতে এসব পলিথিন ব্যাগ তুলে দেওয়ার বেশ কয়েকটি ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করেছেন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী।
মেয়রের ওই পোস্টে শিব্বীর আলী তোহা লিখেছেন, ‘পলিথিনের ব্যবহার রোধে ব্যবস্থা নিয়ে এখন আবার নিজেই বিতরণ করছেন। কি একটা অবস্থা!’ আরমান মাহমুদ চৌধুরী লিখেছেন, ‘পাবলিক পলি ব্যাগ ইউজ করে বলে নালা নর্দমায় পানি আটকে শহর ডুবে যায়, আর সেই পলি সাপ্লায়ার আপনি?’
এম এ সায়েদ চৌধুরী নামে একজন লিখেছেন, ‘একদিকে পলিব্যাগ নিষিদ্ধকরণ আর অন্যদিকে পলিব্যাগ বিতরণ। মশকরা হয়ে গেল না?’ জানে আলম লিখেছেন, ‘নগরবাসীকে পলিথিন ব্যবহারে উৎসাহী করা হচ্ছে।’ এইচ টি হাবিব লিখেছেন, ‘এখানে পলিথিনের পরিবর্তে পাটের ব্যাগ ব্যবহার করা যেত না? শুধুমাত্র অত্যাবশকীয় কাজে পলিথিন ব্যবহার করা যেত।’

একই পোস্টে সাজ্জাদ শাকিল মন্তব্য করেছেন, ‘পলিব্যাগ বর্জন করার বদলে আপনি তা বিতরণ করছেন? বর্জ্য অপসারণ আমরা এর আগেও দেখেছি, আপনার মতো এতো পিকুলিয়ার উদ্যোগ এই প্রথম দেখলাম।’ সায়েদ মুনতাসীর হিশাম লিখেছেন, ‘পলিথিনের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেরাই এখন পলিথিন বিতরণ করছে! এই সার্কাসের শেষ কোথায়?’ আনোয়ার পারভেজ লিখেছেন, ‘পলিথিন নিষিদ্ধ হবে কীভাবে? আপনি নিজেই পলিথিন বিতরণ করছেন।’
যদিও সাধারণ মানুষের তোপের মুখে পড়ে সাফাই গেয়ে ওই পোস্টে কমেন্ট করে মেয়র রেজাউল লিখেছেন, ‘নিষিদ্ধ পলিব্যাগ আর এই পলিব্যাগের মধ্যে তফাৎ রয়েছে, ভুল বুঝবেন না।’
মেয়রের এই কমেন্টেরও জবাব দিয়েছেন কেউ কেউ। আহমেদ আলী লিখেছেন, ‘তফাৎ থাকুক আর না থাকুক, মেয়রের মত দায়িত্বশীল পদে থেকে পলিথিন ব্যাগ বিতরণের মতো দৃশ্য সাধারণ জনগণকে উৎসাহ দিবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সব পলিথিন তো সরকার নিষিদ্ধ করেনি। পলিথিনের মধ্যেও ভাগ আছে। যেগুলো পাতলা পলিথিন, হাটে-বাজারে বিক্রি হয় সেগুলো নিষিদ্ধ। আমরা যেগুলো দিয়েছি সেগুলো পিপি, এগুলো নিষিদ্ধ পলিথিন না।’
মেয়রের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ব্যাগগুলো ‘পলি প্রপাইল (পিপি) ব্যাগ’ ধরে নিয়ে খোঁজ নিলে জানা যায়, এতেও পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. কাজী বায়জীদ কবির বলেন, পিপি ব্যাগও পলিথিনের মতোই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক।
