চট্টগ্রাম : সন্তানদের দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করে মানুষের প্রতি মমত্ববোধ ও মূল্যবোধ জাগ্রত করতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।
রোববার চট্টগ্রাম নগরীর মুসলিম হলে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।
অভিভাবকদের উদ্দেশে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘সন্তানদের মাঝে দেশাত্মবোধ, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, মূল্যবোধ জাগ্রত করা উচিত। এসবের সাথে যদি মেধার সমন্বয় হয়, তাহলে সে হয়ে উঠবে অনন্য একজন মানুষ। আর যদি শুধু মেধাবী হয়, তাহলে শুধু তার উপকার হবে। ভবিষ্যতে দেখা যাবে সে মেধাবী স্বার্থপর, ভাই-বোনের খবর রাখছে না। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকের খবরও নেয় না। আর দেশের সেবা তো দূরের কথা।’
কৃতি শিক্ষার্থীদের প্রতি হাছান মাহমুদ বলেন, ‘জীবন হচ্ছে একটি যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধক্ষেত্রে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালাতে হয়। সমস্ত প্রতিক’লতা পেরিয়ে অভিষ্ট লক্ষে পৌছানোর জন্য সংগ্রাম করতে হয়, লড়াই করতে হয়। জীবনটাও সেরকম। জীবনের এই সংগ্রামে জয়ী হতে হলে স্বপ্ন থাকতে হবে। যে মানুষের স্বপ্ন থাকে সে মানুষের স্বপ্ন পূরণের আগ্রহও থাকে।’
‘সব মানুষেরই স্বপ্ন থাকে। কিন্তু সব মানুষের স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়িত হয় না। কারণ তারা স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে না। যখন মানুষ স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায় তখন এক ধরনের ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ফোর্স তৈরী হয়। তখন তার সব স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হলেও অনেক স্বপ্ন অবশ্যই বাস্তবায়িত হয়।’
সংবর্ধিত শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিয়ে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, তোমরা যারা জিপিএ-৫ পেয়েছ, জীবনের প্রথম ধাপে সাফল্যের সাক্ষর রেখেছ। তাদেরকে এই সাফল্যটা ধরে রাখতে হবে। জীবনে প্রথম ধাপে সাফল্য পাওয়ার পর কেউ যদি খেল হারিয়ে ফেলে তাহলে সর্বনাশ।’
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘চ্যাম্পিয়ন ট্রফির সেমিফাইনালে প্রথমের দিকে বাংলাদেশের দুই ব্যাটসম্যান দেড়শ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেল। মাঝখানে খেল হারিয়ে ফেলার পর আমরা হেরে গেছি। জীবন যুদ্ধটাও ঠিক সেরকম। মাঝখানে খেল হারিয়ে ফেললে ম্যাচে জেতা যাবে না। এজন্য আমি অনুরোধ করবো একাত্মতা নিয়ে লেগে থাকার, যাতে সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা যায়।’
শিক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র হাছান মাহমুদ বলেন, ‘সরকার বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিচ্ছে। যাদের সন্তানরা স্কুলে যায়, তাদের মায়েদের মোবাইলে টাকা পৌছে যায়। স্কুল ফিডিং কার্যক্রম আমাদের সরকারই চালু করেছে। এগুলো একটু মনে রাখতে হয়। এত জিপিএ-৫, আমাদের সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রছাত্রীরা সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে। অনেকেই বলে এত পাশ কেন? আরে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা করলে পাশ তো করবেই।’
নিজের স্কুল জীবনের কথা টেনে এনে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আগে আমাদের অভিভাবকরা খুব একটা স্কুলে যেতেন না। আমার বাবা চট্টগ্রামের আইনজীবি ছিল। মুসলিম হাই স্কুলের গেইট আর আইনজীবি ভবনে উঠার রাস্তা মুখোমুখি। আমি পাঁচবছর মুসলিম হাই স্কুলে পড়েছি। আমার বাবা একবার স্কুলে গিয়েছিলেন। আর এখন তোমাদের বাবা-মায়েরা তো প্রতিদিনই স্কুলে যায়। এখন অভিভাবকরা যে কষ্ট করে…।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হয়ে আসা নারী নেত্রী এডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, আমার আগের একজন বক্তা বলে গেছেন, কাউকে যদি জীবনের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে বলতে বলা হয়, কেউ ডাক্তার, ইঞ্চিনিয়ার, ব্যারিস্টার এরকম নানা কিছু বলে। কেউ রাজনীতিবিদ হবে এটা বলে না। আমি একটু ভিন্ন সুরে বলতে চাই, জীবনের লক্ষ্য হিসেবে কেউ বলে না আমি ভালো মানুষ হতে চাই।
চট্টগ্রাম সিটির সাবেক কাউন্সিলর রেহানা বেগম রানু বলেন, স্বাধীনতার পর চট্টগ্রামে এরকম অনেক সংবর্ধনা দেখেছি। সংবর্ধিতরা এখন ক্ষমতাধর হয়েছেন। দায়িত্বশীল পর্যায়ে গেছেন। আজকের বাংলাদেশে তাদের ভ’মিকা কী? তারাও তো আপনাদের মতো সংবর্ধিত হয়েই এই অবস্থানে গিয়েছেন। অতীতে আমরা দেখেছি, বাংলাদেশ দুর্নীতিতে শীর্ষস্থানে গিয়েছিল।’
নতুন প্রজন্মকে নিয়ে প্রচন্ড আশাবাদি রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘আমি দৃঢভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ একদিন দুর্নীতিমুক্ত হবে, আজকে যারা সংবর্ধিত হচ্ছে সেই ছাত্র-ছাত্রীদের ছোঁয়ায়।’’
শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনি বলেন, ‘একজন কবি তার প্রেমিকার প্রেমে পড়ে দুই লাইন লিখেছেন- ঐ মেয়েটির কাছে, সন্ধ্যা তারা আছে। আমি সেটা ভিন্নভাবে আপনাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- আজকের এই ছাত্রছাত্রীদের কাছে বাংলাদেশের সন্ধ্যা তারা আছে। বাংলাদেশের দিক নির্দেশনা আছে। তারা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বিশ্বের দরবারে।’
অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘আজকে ঘরে আমরা তালা দিয়ে রেখেছি। কারও সাথে অন্যায় হলে আমরা প্রতিবাদ করি না। সেটা কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়। যে প্রকৃত শিক্ষিত, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত, সে প্রত্যেক অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। জঙ্গি মোকাবেলায় সরকার যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে..। ড. হাছান মাহমুদকে আমরা দেখছি মুখপাত্র হিসেবে দুঃসাহসী ভ’মিকা রেখে চলেছেন। যার কারণে নানা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যখন ভালো কাজ হয় তখন ষড়যন্ত্র তো হবেই। সেটা মাথায় নিয়ে আমরা নির্ভয়ে কাজ করে যাব।’
কৃতি শিক্ষার্থীদের প্রতি রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যে মানবিকগুণ সম্পন্ন হওয়া। দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত হওয়া। জীবন-জীবিকার জন্য প্রস্তুত হওয়া। বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামোতে আগামীতে নেতৃত্ব দেবেন আপনারা। আপনাদের কলমের খোঁচায় বাংলাদেশ আলোকিত হবে। আপনাদের হাতে হƒদয়ে সে আলোর প্রদীপ শিখা আছে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
‘লাখো শহীদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে আপনারা এমনভাবে নেতৃত্ব দেবেন, দেশাত্ববোধ নিয়ে এমনভাবে কাজ করবেন যে আজকে যারা ভিসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা যাওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। কাজের জন্য তারা কেউ আর বিদেশে যাবে না। সেদিন আর বেশি দূরে নয়, আপনাদের নেতৃত্বে উন্নত দেশ হবে বাংলাদেশ। অন্য দেশের মানুষ বাংলাদেশের ভিসার জন্য ফাইট করবে। ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসবে কাজ করার জন্য।’
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেত্রী বলেন, ‘আমি দৃঢভাবে বিশ্বাস করি, দেশে শিক্ষায় গুণগত মান অর্জন হয়েছে স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির ক্ষমতায় আসার পর। বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সে স্বপ্ন কিছুটা হলেও বাস্তবায়িত হয়েছে। মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করেই প্রতিনিয়তই কাজ করে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেথ হাসিনা। সেই বঙ্গবন্ধু কন্যাকে প্রতিনিয়ত অতন্দ্র প্রহরীর মত সহযোগিতা করছেন আজকের প্রধান অতিথি ড. হাছান মাহমুদ।
বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা চট্টগ্রাম মহানগরের আয়োজনে এই কৃতি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য সাইফুদ্দীন খালেদ বাহার, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-অর্থ বিষয়ক সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জাফর আলী প্রমুখ। সমাপনী বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি সাজ্জাত হোসেন।
