
এম কে মনির : দেখলে মনে হবে, কোনো জলাশয়। সেই জলাশয়ের পাশেই আছে বিদ্যালয়ের তিনটি ভবন। সেখানে দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। অথচ জলাবদ্ধ জায়গাটি বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। তবে সেখানে খেলাধুলার সুযোগ নেই। সেখানে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় কচুরিপানা জন্মেছে। আর কচুরিপানার কারণে দূষিত হচ্ছে পানি।
শুধু খেলার মাঠই নয়, বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, প্রশাসনিক-একাডেমিক তিন ভবনের চারপাশ ও বিদ্যালয় ভবনের নিচতলা কচুরিপানা, ময়লা-আবর্জনা ও পানিতে ডুবে গেছে। এতে আশেপাশের ময়লা-আবর্জনা থেকে মশা-মাছির উপদ্রব যেমন বেড়েছে তেমনি রোগ-জীবাণুও ছড়িয়ে পড়ছে শ্রেণিকক্ষে। তীব্র দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়েছে। প্রায় সময় পরীক্ষা ও ক্লাস বন্ধ হয়ে ব্যাহত হচ্ছে সরকারি এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ। এরপরও এসব সমস্যা সমাধানে নজর নেই কর্তৃপক্ষের।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম নগরীর পশ্চিম বাকলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ২ হাজার ৪৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এখানে শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা অর্ধশত।
বিদ্যালয়ের মাঠে জমে থাকা বৃষ্টির পানি সরানোর ব্যবস্থা না থাকায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানে খেলাধুলা ও শারীরিক কসরত করছে পারছে না। এছাড়া বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সরকার ঘোষিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতাসহ সকল ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চাও স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে শনিবার (৬ আগস্ট) সকালে বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের বিশালাকৃতির মাঠটিতে পানি ও কচুরিপানা জমে বড় ডোবায় রূপ নিয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের ভিতরে একটি পরিত্যক্ত ভবনের গায়ে সরকারি জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা দণ্ডনীয় অপরাধ লেখা থাকলেও স্থানটি স্থানীয়দের আবর্জনার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের ভিতরে মাঠের আশেপাশে রয়েছে ৬টি পরিত্যক্ত ভবন। লতাপাতা গজিয়ে, বন্যার পানি, কচুরিপানা জমে সাপ-কেঁচো ও বিষাক্ত প্রাণির আবাসস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব ভবন। শুধু তাই নয়, এ বিদ্যালয়ের তিনটি বড় ভবনের চারপাশ পানি আর কচুরিপানায় ডুবে আছে। এমনকি বিদ্যালয়ের বারান্দা ও নিচতলার শ্রেণিকক্ষও পানিতে ভাসছে।
এতে সবকটি ভবনের নিচতলা পাঠদানের অনুপযোগী হয়ে ওঠেছে। বন্যার পঁচা পানি দীর্ঘদিন জমে থাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। মশা-মাছির উপদ্রবও বেড়েছে বিদ্যালয়ের সর্বত্র। নাক চেপে বিদ্যলয়ে যেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এতে ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনার পরিবেশ।
এসময় কথা হয় বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাকিবুল ইসলাম, আশরাফুজ্জামান জিসান, শাহরিয়ার মারুফ, মোবাশ্বির শাহরিয়ার আদনানের সাথে। তারা জানায়, দীর্ঘ ৫-৬ বছর ধরে বিদ্যালয়ের মাঠটির বেহাল দশা। অনেক বড় মাঠ থাকলেও তাতে খেলাধুলা করতে পারছে তারা। বছরের প্রায় পুরো সময়জুড়ে পানি ও কচুরিপানা জমে থাকে। বলা যায় মাঠটি এখন বিশাল ডোবা। এক সময়ের সুন্দর ও বড় আকৃতির এ মাঠটি সংস্কারে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনও উদ্যোগ নেই। বছরের পর বছর অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে সেটি। খেলাধূলা ছাড়াই অনেকে বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে বিদায় নিচ্ছে।
তারা আরও জানায়, বর্ষায় তাদের বিদ্যালয় পানিতে ডুবে থাকে। ক্লাস দূরের কথা পরীক্ষাও হয় না তখন। এমনকি স্কুলও বন্ধ থাকে লাগাতার। কয়েকদিন আগের টানা বৃষ্টিতে বিদ্যলয় বন্ধ ছিল। স্থগিত হয়েছিল পরীক্ষাও। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত দূষিত হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। বৃষ্টির পানি একবার জমলে তা আর নামে না। নালা থেকে কচুরিপানা এসে জমা হয় বিদ্যলয় মাঠে। পরে সেগুলো বংশবিস্তার করতে করতে পুরো বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে সরকারি এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন বেহাল দশায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও। দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. আব্দুর রশীদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এ বিদ্যালয় শুধু নামেই সরকারি। কাজে বেসরকারির চেয়ে খারাপ। পুরো বিদ্যালয়টি নালা-ডোবার মতো হয়ে আছে। অথচ এসব দেখার কেউ নেই। এ পরিবেশে শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়। ভালো ফলাফলেও তা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শহরে এমনিতেই খেলার মাঠ নেই। বিদ্যালয়ে গিয়ে ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখার ফাঁকে খেলাধুলা করবে, আমরা সেটাই আশা করি। কিন্তু এ বিদ্যালয়ের মাঠটি কচুরিপানায় ভরা। আমাদের ছেলে-মেয়েরা শুধু আসে আর যায়। খেলাধুলায় নিজেদের প্রতিভা ফুটিয়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে না।
একই কথা বলেন, আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. লিয়াকত আলীও। তিনি বলেন, ‘একটি বিদ্যালয়ের সুস্থ পরিবেশ যেটি থাকার কথা, এখানে তার ছিটেফোঁটাও নেই। বিদ্যালয় হবে আনন্দের ফুল। কিন্তু পরিবেশ এতো খারাপ হয়েছে যে বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে বিষাদের স্থানে রূপ নিয়েছে।’

জানতে চাইলে বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বৃষ্টি হলে বিদ্যালয়ে পানি জমে। মাঠটি খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা সমস্যা বিদ্যালয়ে প্রকট। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধও তীব্র। সবমিলিয়ে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। কখনো কখনো ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করতে হচ্ছে। এসব সমস্যা লিখিতভাবে বোর্ডকে জানিয়েছি। তবুও সমাধান হয়নি। আমি সাধ্যমতো বিদ্যালয়ের পরিবেশ ঠিক রাখার চেষ্টা করছি। অন্যান্য শিক্ষকরাও আন্তরিক। স্থানীয়রা আরও সচেতন হলে এসব সমস্যা দূর হবে। অনেকবার বলার পর কেউ কেউ বিদ্যালয়ে ময়লা ফেলে। পরিত্যক্ত ভবনগুলো ভাঙা ও একটি দশতলা নতুন ভবন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে তা আর কার্যকর হয়নি।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ ফরিদুল আলম হোছাইনী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বেহাল দশার বিষয়ে আমি অবগত আছি। চাক্তাই খালের কারণে এখানে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বিদ্যালয়টিতে পানি জমে থাকে। এতে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে যখন সরকার কোনও প্রকল্প গ্রহণ করবে তখন আমরা সেটিকে তার আওতায় নিয়ে আসব। তবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলে নিজেরাও সমাধান করতে পারে।’
বিষয়টির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইটি) আবু রায়হান দোলন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সমস্যাগুলোর বিষয়ে আমি অবগত আছি। সরকার কোনও প্রকল্প গ্রহণ না করা পর্যন্ত এগুলো সমাধান করা সম্ভব না। কেননা এসব সমস্যা সমাধানের জন্য একটি বাজেট প্রয়োজন। যা সময়সাপেক্ষ। আমরা জেলা প্রশাসন থেকে বিষয়টি আন্তরিকভাবে দেখব।’
