
জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : একদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দায় জনগণের কপালে চিন্তার ভাঁজ। সরকার থেকেও সকলকে যখন সাশ্রয়ী থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে ঠিক এমন সময় ৫০ লাখ টাকার বেশি খরচ করে জমকালো মিউজিক্যাল নাইটের আয়োজন করছে চট্টগ্রাম ক্লাব লিমিটেড। শোকের মাস আগস্টে এমন উৎসব উদযাপনে ক্লাব কর্তৃপক্ষের এ ধরনের সিদ্ধান্তে নগরজুড়ে বইছে নিন্দার ঝড়।
জানা যায়, চট্টগ্রাম ক্লাব লিমিটেড (সিসিএল) এন্টারটেইনমেন্ট সেকশনের আয়োজনে বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ‘সিসিএল গ্র্যান্ড মিউজিক্যাল নাইট-২০২২’ এর আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে সুদূর ভারত থেকে আনা হচ্ছে ‘অল ইন্ডিয়া সা রে গা মা পা চ্যাম্পিয়ন-২০০৫’ ও বলিউড প্লেব্যাক গায়ক দেবজিত সাহাকে। যিনি পারফর্ম করবেন মিউজিক্যাল নাইট অনুষ্ঠানে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভারতীয় এই সংগীত শিল্পীর জন্য মোটা অংকের টাকা খরচ করতে যাচ্ছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। তবে সেই অর্থ দেবজিত সাহাকে দিতে হবে ডলারে। টাকার পরিমাণ কত তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও অংকটা ৩০ হাজার ডলারের কম নয়।
এদিকে চট্টগ্রাম ক্লাবের আড়াই শতাধিক সদস্যের সকলকে স্ব-পরিবারে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। সকলের জন্য কমপ্লিমেন্টারি ডিনার এবং আনুষঙ্গিক খরচসহ ক্লাব কর্তৃপক্ষের আরও ১০ লাখ টাকা খরচ হবে। সবমিলে অর্ধকোটি টাকার আয়োজন। এই টাকার উৎস কোথায়, সেই প্রশ্ন এখন উঠছে। এছাড়া বিদেশিদের পেমেন্ট দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি প্রয়োজন হয়, এই অনুমতি চট্টগ্রাম ক্লাবের আছে কিনা সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেকেই।
যদিও ইতোমধ্যে মিউজিক্যাল নাইটের আমন্ত্রণপত্রও ছাপিয়ে ফেলেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। আমন্ত্রণপত্রে দেখা যায়, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম ক্লাবের চেয়ারম্যান নাদের খান। পত্রে অনুষ্ঠানের স্পন্সর হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ, শাহাজাদা আলম, সোলায়মান আলম শেঠ, নুরুল আবেদিন (নোবেল), ক্যাপ্টেন সৈয়দ ইউসুফ আলী, ফাহিম আহমেদ ফারুক চৌধুরী, মোহাম্মদ ইয়াকুব, মোর্শেদ কাদের চৌধুরী, ইমরান আলী ভূঁইয়া, ইমরান ফাহিম নূর, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম সারওয়ার, কোহিনুর কামাল ও এসএস ট্রেডিংয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্লাব কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ খোদ ক্লাবের অনেক সদস্য। তাদের মতে, আগস্ট মাস বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্য ও গুরুত্ব বহন করে। সেই কারণেই এই মাসকে দেশব্যাপী শোকের মাস হিসেবে পালন করা হয়। তাছাড়া দেশ অর্থনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেসময় চট্টগ্রাম ক্লাবের এমন উদযাপনের আয়োজনকে নিন্দা জানাচ্ছেন তারা। তাদের মতে, ক্লাবটি যদি এই অনুষ্ঠান করে তবে তা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, দেশের ক্রান্তিলগ্নে চট্টগ্রাম ক্লাবের এমন কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। দেশজুড়ে আর্থিক টালমাটাল অবস্থায় সাধারণ মানুষের যেখানে দুবেলা খেতে কষ্ট হচ্ছে সেখানে ক্লাব কর্তৃপক্ষ এমন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কীভাবে? তাছাড়া আগস্ট মাস আমাদের জন্য শোকের মাস। এতো বড় অংকের টাকা খরচ করে এসময় গান-বাজনা করে ফূর্তি করার মধ্য দিয়েই দেশের প্রতি তাদের দরদ কতটুকু তা বোঝা যায়।’
এদিকে, সচেতন নাগরিকদের পাশাপাশি বিষয়টি ওই ক্লাবের বেশকিছু সদস্যের কাছেও দৃষ্টিকটু লেগেছে। যার কারণে এ বিষয়ে ক্লাব কর্তৃপক্ষকে নিজেদের কথা জানিয়েছেন তারা। এ প্রেক্ষিতে আজ সোমবার বিকেলে ক্লাব কর্তৃপক্ষ সদস্যদের নিয়ে একটি রিভিউ মিটিং করে। সেই মিটিংয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন অনেকেই। ফলে অনুষ্ঠান হওয়া না হওয়া নিয়ে দোটানায় পড়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট আলমগীর চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আসলে এ সময় এ ধরনের অনুষ্ঠান হওয়া উচিত নয়। আমরা দেশের বাইরে ছিলাম। এর মধ্যে ক্লাবের বিনোদন সাব-কমিটি হয়তো না বুঝে ভুলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে কথা হচ্ছে। এ নিয়ে আজ মিটিংও হয়েছে, মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। হয়তো নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে। শীঘ্রই এ বিষয়ে জানা যাবে।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ক্লাবের সেক্রেটারি আশরাফ উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আসলে ওনি (গায়ক দেবজিত সাহা) গুলশান ক্লাবের একটি প্রোগ্রামে আসছিলেন, আমরা চেয়েছিলাম সেই প্রোগ্রামের সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রোগ্রাম করতে। যাই হোক বিষয়টা এখনও ফাইনাল না। প্রোগ্রামটি নিয়ে রিভিউ করা হচ্ছে। অনুমতি পেলে প্রোগ্রাম করবো। না হলে করবো না।’
