
ঢাকা : আজ ১০ মহররম। সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শোকাবহ দিন। দিনটি পবিত্র আশুরা নামে পরিচিত। সৃষ্টির শুরু থেকে মহররমের ১০ তারিখ অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে আশুরার দিনে। ফলে দিনটির মর্যাদা ও মাহাত্ম্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরবি ‘আশারা’ থেকে আশুরা শব্দটি এসেছে। অর্থ- দশ। মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আদম (আ.)-কে সৃষ্টি, ইবরাহিম (আ.)-এর জন্ম, আইয়ুব (আ.)-এর আরোগ্য লাভ, ইউসুফ (আ.)-এর দীর্ঘ ৪০ বছর পর বাবা ইয়াকুব (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ, মুসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার ঘটনা ও কারবালার লোমহর্ষক ঘটনাসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনা আশুরার দিয়ে সংঘটিত হয়েছে বলে ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগে আশুরার দিনকে মর্যাদা ও সম্মানের চোখে দেখা হতো। এমনকি মহররম মাসের পবিত্রতা ও মর্যাদার কথা বিবেচনা করে যুদ্ধপ্রিয় আরবরা মহররম মাসে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত থাকত। তাই এ মাসের নামকরণ করা হয়েছে ‘মহররম’ বা ‘মর্যাদাপূর্ণ’ বলে।
হাদিস শরিফে এই মাসকে ‘আল্লাহর মাস’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। মাসটি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাসের সংখ্যা ১২টি। এর মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ ও সম্মানিত মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এসব মাসে তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করো না।’ (সুরা তাওবা: ৩৬)। মাস চারটি হলো-জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। কাজেই সৃষ্টির সূচনা থেকেই মহররম মাসটি বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে আসছে।
আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা পাওয়ার আশায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নফল রোজা, নামাজ, দান-খয়রাত, জিকির-আসকারের মধ্য দিয়ে আশুরার দিনটি পালন করবেন। দিনটিতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মহান আল্লাহর কাছে বর্তমান বৈশ্বিক সংকট থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করবেন। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তাঁর বাণীতে সাম্য, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি ও অব্যাহত অগ্রগতি কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেছেন, জাতীয় জীবনে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পবিত্র আশুরা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
আশুরার দিনের সবচেয়ে নির্মম ঘটনা এবং মুসলিম ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো- কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নবী-দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের শাহাদাতবরণ। ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল। ঘটনাটি এতই লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক যে, সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান আজো তা ভুলতে পারেনি-পারবেও না।
শাহাদাতের পর হুসাইন ইবনে আলী (রা.)-এর দেহ মোবারকে মোট ৩৩টি বর্শার এবং ৩৪টি তরবারির আঘাত ছাড়াও অসংখ্য তীরের জখমের চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। তবে, আশুরা মানেই কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা নয়। যারা আশুরার দিনে কারবালার স্মৃতিচারণে মাতম করে, তাজিয়া মিছিল, কালোপতাকা উত্তোলন, রাত জাগা, দুলদুল কবর ইত্যাদির আকৃতি বানানো, সাজসজ্জা, মর্সিয়া করা, পুঁথি পাঠ করা, হালুয়া-রুটির হৈ-হুল্লোড়, শোকযাত্রা, আতশবাজি ও আলোকসজ্জা, নতুন নিয়মে ইবাদত ও গোশত খাওয়াকে নিষিদ্ধ মনে করে, তারা মূলত সুন্নতের খেলাফ করে।
হজরত আলী (রা.) হুসাইন (রা.)-এর পিতা ছিলেন। আলী (রা.)-কেও অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। অথচ তাঁর মৃত্যুর দিনকে শোকের দিন হিসেবে পালন করা হয় না।
ওসমান (রা.)-কেও অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর শাহাদাতের দিনকেও শোকের দিন পালন করা হয় না। তাঁদের চেয়ে উত্তম হজরত ওমর (রা.)। তাঁর শহীদ হওয়ার দিনকেও তারা শোকের দিন হিসেবে পালন করে না। সুতরাং এসব গর্হিত ও বিদায়াতমূলক কাজ থেকে মুসলিম উম্মাহকে সরে আসতে হবে।
প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) বলেন, ‘হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের দিনটিকে যদি মাতম বা শোক দিবসের জন্য এতই গুরুত্ব দেওয়া হতো, তবে সোমবার দিনটিকে আরও ঘটা করে শোক দিবস হিসেবে পালন করা বেশি বাঞ্ছনীয় ছিল। কারণ, এ দিন মহানবী মুহাম্মদ (স.) ইন্তেকাল করেছেন। এই দিনেই নবীর পর শ্রেষ্ঠ মানব প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন।’ (গুনিয়াতুত তালেবিন: ২/৩৮)।
আল্লামা রুমি (রহ.) বলেন, ‘হুসাইন ইবনে আলী (রা.)-এর শাহাদাতের কারণে রাফেজিদের মতো এ দিনটিকে মাতমের জন্য নির্দিষ্ট করে নেওয়া, বস্তুত দুনিয়ায় নিজেদের পুণ্যময় সব কাজ বিনাশ করার নামান্তর।’ (ফতোয়ায়ে রহিমিয়া: ২/৩৪১-৩৪২)।
মারেফুল কোরআন রচয়িতা মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, ‘কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা মুসলমানের অন্তরকে সব সময় ব্যথিত করে। শুধু ১০ মহররমকে শোকের জন্য বেছে নেওয়া বোকামি বৈ কিছুই নয়।’(ইমদাদুল মুফতিয়িন: ১/৯৬)।
আশুরার দিনে আমল
আশুরার দিনে যে আমলটি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, তা হলো রোজা রাখা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা মহররম মাসে আশুরার রোজা।’(সুনানে কুবরা: ৮৪২১০)। আশুরার রোজা একসময় ফরজ ছিল। পরে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর তা রহিত হয়ে গেছে।
সহিহ মুসলিম শরিফে এসেছে, হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কুরাইশরা জাহেলি যুগে আশুরার দিন রোজা রাখত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (স.) সেদিন রোজা রাখতেন যখন তিনি মদিনায় হিজরত করেন, তখন থেকে।
তিনি নিজে রোজা রাখেন ও সাহাবাদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন। অতঃপর যখন রমজানের রোজা ফরজ হয়, তখন তিনি বললেন, যার ইচ্ছা রোজা রাখো, আর যার ইচ্ছা রোজা রাখবে না।’(মুসলিম: ১১২৫)। আশুরার আগের দিন বা পরের দিন মিলিয়ে দুইটি রোজা রাখা মোস্তাহাব।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো, আর ইহুদিদের বিরোধিতা করো। তাই তোমরা এক দিন আগে বা পরে রোজা বাড়িয়ে দাও।’ (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪)।
অসংখ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) আশুরার রোজার ফজিলত বর্ণনা করেছেন। যেমন আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা মহররম মাসে আশুরার রোজা’ (সুনানে কুবরা: ৮৪২১০)। আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এই রোজা বিগত বছরের গুনাহ মুছে দেয়। (মুসলিম: ১১৬২) এছাড়াও আহলে বাইত তথা নবীর পরিবারের সদস্যরা শাহাদাতের কারণে তাঁদের জন্য দোয়া করা, দরুদ পড়া এবং তাঁদের কাছ থেকে সত্যের ওপর অটল থাকার শিক্ষা গ্রহণ করা মুসলিম উম্মাহর উচিত।
আশুরার তাৎপর্য নিয়ে জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি রেডিও-টিভি চ্যানেল আজ বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে।
করোনা পরিস্থিতির কারণে গতবার আশুরায় তাজিয়া মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এবার সে নিষেধাজ্ঞা থাকছে না। তবে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাজিয়া মিছিলে দা, ছোরা, কাঁচি, বর্শা, বল্লম, তরবারি, লাঠি ইত্যাদি বহন এবং আঁতশবাজি ও পটকা ফোটানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে পুলিশ।
