বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯

অনিয়ম-দুর্নীতিতে ৮০ ভাগ দরিদ্র মানুষ টিসিবি’র ফ্যামিলি কার্ড পাননি : টিআইবি

প্রকাশিতঃ ১১ অগাস্ট ২০২২ | ৫:৫৭ অপরাহ্ন


ঢাকা : ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দেওয়া নিম্ন আয়ের ১ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেখানেও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অনেককেই বাদ দেওয়া হয়েছে বলে গবেষণার তথ্য তুলে ধরে একথা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

টিআইবি জানায়, ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ ফ্যামিলি কার্ড পায়নি। আর যারা পায়নি তাদের মধ্যে ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেছেন- টিআইবির রিসার্চ ফেলো মোহাম্মদ নূরে আলম।

বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এ অনিয়ম-দুর্নীতির দাবি করেছে।

এসময় টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বলা হয়, প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে ঢাকা ও বরিশালকে বাদ দিয়ে ৩৫টির মতো জেলায় গবেষণার ভিত্তিতে। সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরামের নেতৃত্বে গবেষণা দলের সদস্যরা ছিলেন- রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট-কোয়ান্টিটেটিভ নূরুজ্জামান ফরহাদ, কাওসার আহমেদ, মো. মোস্তফা কামাল, রিসার্চ ফেলো মোহাম্মদ নূরে আলম ও মো. জুলকারনাইন।

গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা একটি পরিপত্রে টিসিবির উপকারভোগী বাছাই ও পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম সংক্রান্ত জেলা মনিটরিং কমিটির নির্ধারিত কার্যক্রমে উপকারভোগীর ডাটাবেজ প্রণয়ন বিষয়ে বলা হয়েছে যে, করোনাকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নগদ সহায়তা প্রদানের জন্য প্রণীত ডেটাবেইজ ব্যবহার করতে হবে (যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সরবরাহ করবে)। এর সঙ্গে জেলা প্রশাসক কর্তৃক প্রেরিত উপজেলাভিত্তিক বিভাজন অনুযায়ী পূর্বের ন্যায় নতুন অতিরিক্ত ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ এ অনুষ্ঠিত একটি সভায় করোনার সময় নগদ প্রণোদনা পাওয়া ৩৫ লাখ দরিদ্র কর্মহীন পরিবারকে টিসিবির ভর্তুকি মূল্যের পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রমজানে ৩৫ লাখ পরিবারের সঙ্গে আরও ৬৫ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট এক কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, করোনাকালে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার হিসেবে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার জন্য ৫০ লাখ পরিবারের একটি তালিকা করা হয়েছিল। তালিকায় পেনশনার, সরকারি চাকরিজীবী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নাম থাকায় তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে যাচাই-বাছাই শেষে ৩৫ লাখ পরিবারকে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। পরে সড়ক পরিবহন, নৌ পরিবহন শ্রমিক, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরও সাড়ে ৩ লাখ মানুষকে নগদ সহায়তা দেয় সরকার। রমজানে যে এক কোটি পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা পাবে, তার মধ্যে এ সাড়ে ৩৮ লাখ পরিবার অন্তর্ভুক্ত থাকার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

তবে এ গবেষণার জরিপে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী উত্তরদাতা যারা ইতোপূর্বে ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তা পেয়েছিলেন তাদের ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ ফ্যামিলি কার্ড পাননি। যারা কার্ড পাননি তাদের ৮০.৪ শতাংশ অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানান।

জরিপে ফ্যামিলি কার্ড না পাওয়া উত্তরদাতাদের মতে কার্ড না পাওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে- তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি বা তথ্য প্রচারে ঘাটতি। নগদ সহায়তাপ্রাপ্ত সব উপকারভোগী যে এ কার্ড পাওয়ার কথা এ বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা ছিল না, এমনকি ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। এছাড়া তালিকা থেকে বাদ পড়ার অন্যান্য কারণ হিসেবে কারও সুপারিশ বা তদবির জোগাড় করতে না পারা, রাজনৈতিক বিবেচনায় স্বচ্ছল ব্যক্তিদের তালিকাভুক্তকরণ, একই পরিবারে একাধিক কার্ড প্রদান, ছবি পরিবর্তন করে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের কার্ড অন্যদের দিয়ে দেওয়া, ঘুষ না দেওয়া কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিদের তালিকাভুক্তির বিষয়টি উঠে এসেছে। জরিপে উত্তরদাতাদের ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন তালিকা প্রণয়নের সময় যোগ্য-হতদরিদ্র ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সচ্ছল ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ৭৬ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতার মতে তালিকায় সচ্ছল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর বাইরে ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি তাদের আত্মীয়-স্বজনদের এবং ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতার মতে তালিকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

টিসিবি পণ্যের একটি প্যাকেজের মূল্য ৪৬০-৫৬০ টাকা নির্ধারণ করে এবং প্যাকেজের আওতায় থাকা সব পণ্য নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে প্যাকেজের পণ্যের ধরন ও মূল্য নির্ধারণে সম্ভাব্য উপকারভোগীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করায় কোনো কোনো উপকারভোগীর কাছে মনে হয়েছে প্যাকেজের কিছু পণ্য অপ্রয়োজনীয় এবং বাজার তুলনায় সাশ্রয়ী না। আবার নিম্ন আয়ের জনগণের কেউ কেউ ফ্যামিলি কার্ড পেলেও সময়মত অর্থ যোগাড় করতে না পারায় পণ্য কিনতে পারেনি।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্যাকেজের সব পণ্য প্রয়োজনীয় মনে না হওয়ায় কিনতে অনাগ্রহী ছিল। পণ্য ক্রয় করেছে জরিপে অংশগ্রহণকারী এরকম উপকারভোগীদের ৯৪ শতাংশ পণ্যগুলো প্রয়োজনীয় বলে মতামত দিয়েছেন। তবে প্যাকেজে চাল (৮৩.৩ শতাংশ), আটা (৩৭.৮ শতাংশ), চিড়া-মুড়ি (১৫.৯ শতাংশ) ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যও অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন উপকারভোগীরা।

এছাড়াও প্রতিবেদেনে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চ্যালেঞ্জ ও টিসিবির সক্ষমতার ঘাটতি, জনবল ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ, দুর্গম এলাকায় পণ্য সরবরাহে টিসিবির চ্যালেঞ্জ, প্রত্যন্ত এলাকার উপকারভোগীদের চ্যালেঞ্জ, দৈনিক উপার্জন ব্যাহত, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা, নারী ও প্রতিবন্ধিতাসহ ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক ব্যবস্থা না থাকা, বিক্রয় কেন্দ্র/পয়েন্ট থেকে পণ্য ক্রয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি, নিম্নমানের পণ্য বিক্রয়, পরিমাণে/ওজনে কম দেওয়া, তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রে ঘাটতি, জবাবদিহিতার ঘাটতি ইত্যাদি বিষয় ওঠে এসেছে।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি জনস্বার্থে নেওয়া সরকারের একটি কর্মসূচি। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সক্ষমতা যাচাই করে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি না নিয়েই দ্রুত এ ধরনের কর্মসূচি গ্রহণের ফলে বিভিন্ন পর্যায়ে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ পরিলক্ষিত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, উপকারভোগীর তালিকাভুক্তি, পণ্য ক্রয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি ও অনিয়ম-দুর্নীতির ফলে একদিকে প্রকৃত উপকারভোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফ্যামিলি কার্ড তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। অন্যদিকে উপকারভোগীদের চাহিদা, পণ্য ক্রয়ের সামর্থ্য এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রবেশগম্যতা ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা না করায় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ইতিবাচক উদ্যোগের সুফল যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না। যা এই কর্মসূচির উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করেছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে কার্যকর অভিযোগ নিরসন ব্যবস্থা না থাকায় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।