পাউবোর ‘ভুলে’ বিলীন হচ্ছে সৈকতের বালিয়াড়ি!


জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবণী পয়েন্ট অংশে বিলীন হচ্ছে বালিয়াড়ি। ভাঙনরোধে কয়েক বছর ধরে সেখানে জিও ব্যাগ দিয়ে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভাঙনরোধ সম্ভব হচ্ছে না।

অথচ দেখা গেছে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টসহ যেসব এলাকায় জিও ব্যাগের বাঁধ নেই, সেখানে কোন ধরনের ভাঙন দেখা দেয়নি। স্থানীয়রা বলছেন, মূলত জিও ব্যাগের বাঁধের কারণে জোয়ারের পানি যাওয়া-আসায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া জিও ব্যাগে ভরা বালুগুলো তোলা হয়েছে সৈকত থেকেই। এ কারণে সৈকতে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, সৈকতের ডায়াবেটিক পয়েন্ট থেকে কলাতলীর ডলফিন মোড় পর্যন্ত এলাকায় ঢেউয়ের তোড়ে বিভিন্ন এলাকার বালু সরে গেছে। এতে ভাঙন দেখা দিয়েছে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে। এই ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে সৌন্দর্য হারাচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। ভাঙনের কবলে সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি, ঝাউগাছের সারি।

ঢেউয়ের তোড়ে ভাঙছে সৈকতের লাবনী পয়েন্ট, জেলা প্রশাসন নির্মিত উন্মুক্ত মঞ্চ, সৈকতের ছাতা ও ঝিনুক মার্কেট। ডায়াবেটিক পয়েন্ট থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত জায়গায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বালু ভর্তি জিও টিউব দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করে। বৃহস্পতিবার ঢেউয়ের তীব্রতা শুরু হলে লাবণী এলাকার উর্মি পয়েন্টে তীরেই ড্রেজার মেশিন বসিয়ে জিও ব্যাগে বালি ভরা হয়। এরপরই সেই অংশের ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে।

এদিকে শুক্রবার (১২ আগস্ট) দুপুরে সৈকতের ভাঙন এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার। এসময় ভাঙন দেখতে আসা শহরের বাহারছড়ার বাসিন্দা বয়োবৃদ্ধ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘ঝাউবন ও স্থাপনা রক্ষার নামে জিও ব্যাগ ভরতে তীরের ১০০ ফুটের মধ্যে থেকে তোলা হয়েছে বালি। পরে জোয়ারের পানি এসে নিয়ে গেছে জিও ব্যাগ। পাউবোর দায়িত্বশীলরা সৈকতের আচরণ সম্পর্কে জ্ঞাত নয়। এখানে ঢেউয়ের মুখে বাঁধ দিলে তা ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। ঢেউয়ের পানি স্বাভাবিকভাবে আসা-যাওয়া করতে পারলে এত ভাঙন হতো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাউবো ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সৈকত থেকেই বালু তুলে ঢেউয়ের মুখে ঢালছে। এটা ভুল সিদ্ধান্ত। এতে কোটি কোটি টাকা হলেও লাভ কিছু হচ্ছে না। এটি অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।’

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দুপুরে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে জোয়ারের পানির তোড়ে ঝুঁকির মুখে পড়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের ডিউটি ঘর। আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরটি কোন মতে খুলে সাগরে বিলীন হওয়া থেকে রক্ষা করেছি।’

লাবণী পয়েন্টে দায়িত্বরত লাইফগার্ড কর্মী ওসমান বলেন, ‘এত উচ্চতায় জোয়ারের ঢেউ বিগত বছরগুলোতে দেখিনি। সৈকতের কবিতা চত্বর পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত বালিয়াড়ি ভাঙছে। ঝুঁকির মুখে পড়েছে নানা স্থাপনা। সৌন্দর্যহীন হয়ে পড়েছে সৈকত। ঢেউয়ের তোড়ে ওয়াকওয়ের ইট উঠে গিয়ে এলোমেলো হওয়ায় সৈকতে নামতে গিয়ে আহত হচ্ছেন পর্যটকরা।’

স্থানীয়রা জানান, সুদীর্ঘকাল হতে বর্ষায় সাগরে পানি বৃদ্ধি পায়। তবে ভাঙন এরকম তীব্র হতো না।

কক্সবাজার সৈকত এবং দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনকে ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) ঘোষণা করে যে কোনো বহুতল ভবন নির্মাণে রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা। এই নিষিদ্ধ এলাকায় যে সকল বহুতল সুরম্য অট্টালিকা নির্মিত হয়েছে এগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশনাও কার্যকর হচ্ছে না।

সুগন্ধা পয়েন্ট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকতের শহর কক্সবাজার শুধু চিত্ত বিনোদনের প্রাণ কেন্দ্র নয়; বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর স্থানও। কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়াতে রেললাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। অথচ সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সৈকত হুমকির মুখে। দেশের জাতীয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কক্সবাজার সৈকত রক্ষার দাবি সবার। সমুদ্র সৈকত ঘিরে নানা কার্যক্রমে হাজারো কর্মসংস্থান হয়েছে। সমুদ্র সৈকত ধ্বংস হলে দেশের পর্যটন শিল্প ধ্বংসের পাশাপাশি এসব কর্মজীবীদের জীবনেও বিপর্যয় নেমে আসবে।’

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড’র নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ বলেন, গত কয়েক বছর ধরে সৈকতে ডায়বেটিক পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত বর্ষায় ভাঙনের কবলে পড়ছে। তা রোধে প্রাথমিকভাবে সৈকতের কবিতা চত্বর পয়েন্ট থেকে লাবণী পয়েন্টের কিছু অংশ জিও ব্যাগ বসানো হয়েছে।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেন, সৈকতের ভাঙ্গন স্থায়ীভাবে রোধ করতে নাজিরার টেক হতে কলাতলীর বেলী হ্যাচারি পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার এলাকায় একটি টেকসই দৃষ্টিনন্দন বাঁধ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সেটি পাশ হলেই শুরু হবে কাজ। কিন্তু চলমান ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ বসানো ছাড়া বিকল্প কোন পন্থা নেই। সৈকত থেকে বালু তোলার কারণে ভাঙন বেড়ে থাকলে পরবর্তীতে দূরবর্তী স্থান হতে বালু নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হবে।’