
জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : বিলুপ্তপ্রায় ধূপগাছ রক্ষা এবং দুর্লভ-দামি শ্বেতচন্দনের বাগান করে দেশজুড়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। প্রতিষ্ঠানটির এমন সফলতা বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ রক্ষার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে খুলতে পারে অপার সম্ভাবনার দ্বার।
ভারত, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া, মাদাগাস্কার ও অস্ট্রেলিয়াতে সবচেয়ে বেশি ধূপ গাছ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কিছু ধূপ গাছ দেখা যায়। সিলেট ও চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে একসময় এই উদ্ভিদটি পাওয়া গেলেও বর্তমানে নির্বিচারে ধ্বংসের ফলে উদ্ভিদটি আশংকাজনকহারে কমে গেছে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের (২০১২) তফসিল-৪-এ ধূপ গাছকে রক্ষিত উদ্ভিদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি ইন্ডিয়ান ইনিস্টিউট অব ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট উদ্ভিদটিকে বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
উদ্ভিদটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে ২০১৪ ধূপের নার্সারি উত্তোলন কৌশল উদ্ভাবনের উদ্যোগ গ্রহণ করে বিএফআরআই এর গৌণ বনজ সম্পদ বিভাগ। ধূপের উদ্ভাবিত কৌশল অবলম্বনে ২০১৫ সালে মৌলভীবাজারের আদমপুর এলাকা থেকে ধূপের বীজ সংগ্রহ করে প্রায় দুই হাজার চারা উত্তোলন করে সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটি।
ধূপের বীজ স্বল্প-আয়ু সম্পন্ন এবং বীজ সংগ্রহের ৫-৭ দিনের মধ্যে অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ায় এর নার্সারি উত্তোলন করা বিএফআরআই এর জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। মার্চ-এপ্রিল মাসের অত্যাধিক গরমের সময় দিনের বেলায় চারায় ছায়া প্রদান (শেড), নিয়মিত পানি সেচ দেওয়া এবং চারায় ছত্রাকের আক্রমণ ঠেকাতে ৭ দিন পরপর ছত্রাকনাশক স্প্রেসহ নিয়মিত পরিচর্যা করে চারাগুলোকে লাগানোর উপযোগী করে তোলা হয়।
পরবর্তীতে এর ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে বিএফআরআই এর প্রধান ক্যাম্পাস, মিরসরাইয়ের হিংগুলি বন গবেষণা কেন্দ্র এবং সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রে এ স্পেসিং ট্রায়াল বাগান উত্তোলন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বোটানিক্যাল গার্ডেন, কুমিল্লা বোটানিক্যাল গার্ডেন, সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকো পার্ক, বাঁশখালী ইকো পার্ক, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক ও রামু বোটানিক্যাল গার্ডেনে এ উদ্ভিদটি সংরক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণসহ ব্যক্তি পর্যায়ে বেশ কিছু ধূপের চারা সরবরাহ করেছে বিএফআরআই।
এদিকে, দুর্লভ শ্বেতচন্দন গাছ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় ভারতে; এছাড়াও দক্ষিণ এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশে এই সুগন্ধি গাছ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে এই শ্বেতচন্দন তেমন একটা পাওয়া যায় না। তাই এই গাছ উৎপাদন করাটাও বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল বিএফআরআই এর গবেষকদের কাছে।
২০১২ সালে বিএফআরআই শ্বেতচন্দন গাছের চারা উৎপাদনের চেষ্টা শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ‘শ্বেতচন্দন নার্সারি ও বাগান উত্তোলন কৌশল’ শীর্ষক কর্মসূচি হাতে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। তবে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয় বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের।
শুরুর দিকে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও শ্বেতচন্দনের কোন চারা ছয় মাসের বেশি বাঁচানো সম্ভব হচ্ছিল না। নানা গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, শ্বেতচন্দনের চারা সর্বোচ্চ ৬ মাস নিজ থেকে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে। গবেষণার এক পর্যায়ে চারাগুলোকে বাঁচাতে অন্য গাছের সহায়তা নেওয়ার চিন্তা করেন তারা।
যার প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের পর ভারত ও সিলেটের দুটি গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে ঝাউসহ অন্য গাছের সহায়তায় নিবিড় পরিচর্যার পর কয়েকটি চারা বড় করতে সক্ষম হন তারা। এমন সফলতার পর বিএফআরআই এর নিজস্ব পাহাড়ে শ্বেতচন্দনের বাগান করার পরিকল্পনা করেন তারা।
২০২১ সালের জুন মাসে দশমিক ২ হেক্টর আয়তনের একটি বাগানে ১ বছর বয়সী ১০০টি চারা রোপণ করেন তারা। শ্বেতচন্দনের হোস্ট প্লান্ট হিসেবে অড়হর, কালো কড়ই, ঝাউ, বকুল, নিশিন্দা ইত্যাদিসহ গাছ লাগানো হয় প্রতিটি চারার পাশে। ৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা প্রতিটি চারা বর্তমানে শোভাবর্ধন করছে প্রতিষ্ঠানটির।

ধূপ ও শ্বেতচন্দনের ব্যবহার:
এক সময় সন্ধ্যাবেলা গ্রামে ধূপ দিয়ে ধোঁয়া দেয়ার প্রচলন ছিল। নারিকেলের ছোবড়ায় আগুন দিয়ে তার মধ্যে ধূপ ছিটিয়ে সুগন্ধি ধোঁয়া তৈরি করা হতো। ধূপের ধোঁয়ায় ঘরের দুর্গন্ধ দূরীভূত হয় ও মশা-মাছির উপদ্রবও কমে। এছাড়া ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এর বেশ কদর রয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ধূপ জালিয়ে ধোঁয়া দিয়ে থাকেন।
মূলত ধূপগাছ থেকে নিঃসৃত কষ বা আঠাই হলো ধূপ। গাছ থেকে আঠা আহরণ করে শুকিয়ে ফিটকিরির মতো করে ধূপ হিসেবে বাজারজাত করা হয়। ধূপ গাছের বাকলের ক্ষতস্থান থেকে ডেমার নামে এক ধরনের রেজিন পাওয়া যায়। ওষুধ তৈরিতে এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এই রেজিন ব্যবহৃত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে উপজাতি এবং গ্রামীণ মানুষ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ধূপ ব্যবহার করে থাকেন। ধূপ থেকে যে অপরিশোধিত ওষুধ পাওয়া যায় তা প্রদাহ প্রতিরোধী, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকনাশক।
এছাড়াও ধূপ টিউমার প্রতিরোধী, যকৃত রক্ষা করে, এন্টিঅক্সিডেন্ট গুণ সম্পন্ন ও বহুমূত্র রোগ প্রতিরোধ করে। চর্মরোগ, হার্নিয়া, যৌনরোগ, মৃগীরোগ, হাঁপানি, জ্বর এবং বাতজ্বরের চিকিৎসায় ধূপ ব্যবহৃত হয়। সিজনিং করা ধূপ কাঠ দিয়ে প্লাইউড, ভিনিয়ার, পার্টিশন, ঘরের খুঁটি ও প্যাকিং বক্স তৈরি করা যায়। বীজের শাঁস খাওয়া যায় এবং বীজের তেল কনফেকশনারিতে ব্যবহৃত হয়। হাড়ভাঙ্গাতে প্লাস্টার হিসেবে ধূপ ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, সুগন্ধি কাঠের জন্যই চন্দনের খ্যাতি। বিভিন্ন প্রসাধনী (সাবান, আতর, পারফিউম, ক্রিম, উপটান, ফেস-ওয়াশ) তৈরিতে শ্বেতচন্দন ব্যবহার করা হয়। সুপ্রাচীন কাল থেকে শ্বেতচন্দন নারীদের সৌন্দর্য চর্চায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শ্বেতচন্দনে আছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ, যা ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে (মুখের দাগ নিরাময়, লাবণ্য ফিরিয়ে আনা) ব্যবহার করা হয়।
ঔষধি গুণের জন্য পৃথিবীব্যাপী শ্বেতচন্দনের কদর ও সুখ্যাতি রয়েছে। শ্বেতচন্দন ছাড়া আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের কথা ভাবা যায় না। আধুনিক ভেষজ শাস্ত্রে প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া রক্তচাপ ও মাথা ধরা কমাতে এবং চর্মরোগে, ঘামাচি ও ব্রংকাইটিস সারাতে শ্বেতচন্দন ব্যবহার করা হয়। কাঠ থেকে পাতন প্রক্রিয়ায় এসেন্সিয়াল অয়েল আহরিত হয়। যা পোকানাশকসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়।
তাছাড়া উইপোকা বা ঘুন পোকায় শ্বেতচন্দন কাঠ নষ্ট হয় না। ছবির ফ্রেম, আসবাবপত্র, বাক্স, চিরুনি, অলংকার ও কারুকার্যদ্রব্য তৈরিতে শ্বেতচন্দন কাঠ ব্যবহৃত হয়। চন্দন কাঠের খোদাই করা মূর্তি বা ভাস্কর্যের সারা দুনিয়াব্যাপী সুখ্যাতি রয়েছে।
সম্ভাবনামায় এই শ্বেতচন্দন দেশের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিকভাবে রপ্তানি হলে বছরে কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। দেশে এখন যেসব শ্বেতচন্দন পাওয়া যায় তা ভারত থেকে আমদানি করা হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমদানি করা এসব শ্বেতচন্দন কাঠ বাজারে প্রতি ১০০ গ্রাম আড়াই হাজার টাকা দরে বিক্রি করা হয়। দেশে এই গাছ উৎপাদন করা গেলে দেশের চাহিদা পূরণ করে বহির্বিশ্বেও রপ্তানি করা সম্ভব।
বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শাহ আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘উদ্ভিদ দুটির বীজ সংগ্রহ করতে আমাদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তাছাড়া চারা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও আমাদের বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু আমরা থমিনি। একের পর এক ব্যর্থতার পরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে গেছি। বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা ছাড়া এই সাফল্য অর্জন সম্ভব ছিল না।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এখানেই থেমে থাকতে চাই না। আরও কিছু বিলুপ্তপ্রায় ঔষুধি উদ্ভিদ যেমন, নাগলিন গম, কুসুম ইত্যাদি নিয়ে আমরা কাজ শুরু করছি। এছাড়াও সম্ভাবনাময় উদ্ভিদ কাজুবাদাম নিয়েও আমাদের কাজ করার কথা রয়েছে। আমরা চাই গবেষণার মাধ্যমে আমাদের দেশের জন্য কিছু করতে। কারণ গাছ বাঁচলে দেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে।’
এতসব আশা জাগানিয়া উদ্ভাবন করেও অন্য দশটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মত নেই এর প্রচার-প্রচারণা। সম্প্রতি একুশে পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএফআরআই এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. রফিকুল হায়দার জানান, প্রচার প্রচারণার চেয়ে দেশের জন্য কিছু করতে পারলেই নিজেদের স্বার্থকতা খুঁজে পাবেন তারা। সম্ভাবনা কিংবা আশার আলো দেখিয়ে ক্ষান্ত না হয়ে বন গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে সফলতার চূড়ায় পৌঁছানোই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, ‘বিএফআরআই এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে দীর্ঘ ১০ বছর চেষ্টার পর আমরা বহুকাঙ্ক্ষিত শ্বেতচন্দনে সাফল্য পেয়েছি। ধূপের ক্ষেত্রে আমাদের সফলতাও আশাব্যঞ্জক। এই সাফল্য যাতে ব্যক্তি পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ে তার জন্য আমরা ধূপ ও শ্বেতচন্দনের নার্সারি এবং বাগান উত্তোলন কৌশল শীর্ষক একটি প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালও প্রকাশ করেছি। যেটি অনুসরণ করে খুব সহজে যে কেউই চারা চাষাবাদ ও স্বাভাবিক পরিচর্যা প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারবে। শুধু তাই নয় উদ্ভিদগুলো উৎপাদন করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
