বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯

জঙ্গিবাদে অভিযুক্ত মুফতি ইজাহারকে সংবর্ধনা দিলেন আ.লীগের কাউন্সিলর

প্রকাশিতঃ ১৮ অগাস্ট ২০২২ | ১১:০৪ অপরাহ্ন

এম কে মনির : জঙ্গিবাদে অভিযুক্ত, বহুল আলোচিত-সমালোচিত মুফতি ইজাহারুল ইসলাম এক মাস পর লিবিয়া থেকে চট্টগ্রামে ফিরেছেন আজ বৃহস্পতিবার। এ উপলক্ষে আজ দুপুরে নগরের লালখান বাজারস্থ জামিয়াতুল উলুম ইসলামিয়া লালখান বাজার মাদ্রাসায় তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়।

এতে উপস্থিত হয়ে ফুল দিয়ে মুফতি ইজাহারকে সংবর্ধনা দেন নগরের ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের মনোনীত কাউন্সিলর ও চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি আবুল হাসনাত মোহাম্মদ বেলাল।

আড়ম্বরপূর্ণ ওই অনুষ্ঠানে কাউন্সিলর আবুল হাসনাত মোহাম্মদ বেলালকে বেশ হাসিখুশি ও উচ্ছ্বসিত দেখা গেছে। এর আগে এলাকাবাসীর পক্ষে মুফতি ইজাহারকে ফুলেল সংবর্ধনা প্রদানের অনুরোধ জানিয়ে মাইকে কাউন্সিলর বেলালের নাম ঘোষণা করেন অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক।

জানতে চাইলে জামিয়াতুল উলুম ইসলামিয়া লালখান বাজার মাদ্রাসার একজন শিক্ষক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের মুফতি হুজুর দীর্ঘ ১ মাস পর লিবিয়া সফর শেষ করে দেশে ফিরে এসেছেন। গতকাল তিনি ঢাকা বিমানবন্দরে নামেন। এরপর সড়ক পথে আজ দুপুরে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছেন। মাদ্রাসায় আগমনের সাথে সাথে আমরা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা প্রদান করি। সেখানে লালখান বাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবুল হাসনাত মোহাম্মদ বেলালও উপস্থিত ছিলেন। তিনি হুজুরকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।’

এদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও নেতা হয়েও জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততা ও পৃষ্ঠপোষকতায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সংবর্ধনায় দেয়ার ঘটনায় নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তার এমন কাণ্ডে ক্ষুব্ধ দলের আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতি চর্চা করে আসছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূলে তাঁর দৃঢচেতা মনোভাব সারাবিশ্বের কাছে প্রশংসনীয় হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র যেখানে জঙ্গিবাদকে উৎখাতে বদ্ধপরিকর সেখানে আওয়ামী লীগের একজন কাউন্সিলর ও নেতা হয়ে জঙ্গিবাদে অভিযুক্ত, বিস্ফোরণ, অ্যাসিড ও হত্যাসহ অনেক মামলার আসামি মুফতি ইজাহারকে ফুল দিয়ে সংবর্ধনা দেয়া রাষ্ট্রের জঙ্গিবিরোধী নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের সমান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর আবুল হাসনাত মোহাম্মদ বেলাল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি (মুফতি ইজাহারকে সংবর্ধনা দেয়ার) সেই অনুষ্ঠানে ছিলাম।’ জঙ্গিবাদে মদদদাতা, পৃষ্ঠপোষকতায় অভিযুক্ত মুফতি ইজাহারকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ রকম একটি মাদ্রাসা বাংলাদেশে থাকা দরকার কি না, আগে সেটি জেনে নিন। তারপর আমাকে ফোন করুন।’

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ১০ জুলাই চট্টগ্রামের লালখান বাজারে মুফতি ইজাহার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় ভয়াবহ গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়। আহত হয় বেশ কয়েকজন। ওই বছরের অক্টোবরে গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইজাহারপুত্র মুফতি হারুন ও মুফতি ইজাহারকে আসামি করে বিস্ফোরণ, অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ও হত্যাসহ তিনটি মামলা করা হয়।

ওই মামলাগুলোতে মুফতি হারুন সেসময় গ্রেপ্তার হলেও পালিয়ে যান মুফতি ইজাহার। পরবর্তীতে মুফতি ইজাহারুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনিও দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দারা তাকে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে এলে তিনি দুই আঙুল তুলে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, ‘আমি মহাজোটের প্রতিষ্ঠাতা।’

এর আগে ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগের র‌্যাব-৭ এর হাতে দুই সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মুফতি ইজাহারুল ইসলাম। হরকাতুল জিহাদের (হুজি) তৎকালীন আমির মাওলানা ইয়াহিয়া ওরফে বর্দ্দা (৪৬) এবং তার দুই সহযোগী মো. বাহাউদ্দিন (২২) ও ইয়ার মোহাম্মদকে (৫০) গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াহিয়া জানান, বৃহত্তর চট্টগ্রামে হুজির আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুফতি ইজাহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসায় সাংগঠনিক অফিস খোলা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের প্রাণনাশের চেষ্টার অভিযোগে আটক হওয়া কয়েকজন জঙ্গি জানায়, তারা মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসাতেই ট্রেনিং নিয়েছিল।

এছাড়াও মুফতি ইজাহার বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় শরীক জোট শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকও মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০০১ সালে জোট সরকার গঠিত হওয়ার পর ইসলামী ঐক্যজোট ভেঙে গেলে তিনি মুফতি আমিনীর নেতৃত্বাধীন অংশের মহাসচিব হন। পরবর্তীতে তিনিই ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান হয়ে যান। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে তার অনিবন্ধিত দল নেজামে ইসলামে পার্টি শরিক হতে ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। পরে ১/১১-সরকারের সময় জোট সরকারের কঠোর সমালোচক হিসেবে আভির্ভূত হন তিনি।

এদিকে লালখান বাজার মাদ্রাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মুফতি ইজাহারুল ইসলামের পরিচালনাধীন লালখান বাজার পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জমিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসা ঘিরে গড়ে ওঠেছিল আন্তঃদেশীয় জঙ্গিদের ঘাঁটি। যেখান থেকে ২০০৯ সালের শেষ দিকে একটি কলের সূত্র ধরে জানা যায়, মুফতি ইজাহারের মাদ্রাসায় বসেই মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশনে হামলার ছক আঁকা হয়েছিল। এ হামলা পরিকল্পনা করেছিল ভারতীয় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই তৈয়্যবা। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মুফতি ইজাহারুল ইসলামের ছেলে মুফতি হারুন ইজাহার। সেসময় আন্তঃদেশীয় কয়েকজন জঙ্গি মুফতি ইজাহারের মাদ্রাসায় অবস্থান করেছিলেন।

এ তথ্য পেয়ে সেসময় গোয়েন্দা পুলিশ ওই মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়ে ইজহারপুত্র মুফতি হারুন এবং দক্ষিণ ভারতীয় সংগঠন লস্কর-ই তৈয়্যবার সদস্য ভারতীয় নাগরিক শহিদুল, সালাম, সুজন ও আল আমিন ওরফে মঈনুলকে আটক করে।