বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯

বিনামূল্যে হেপাটাইটিস পরীক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত

প্রকাশিতঃ ১৯ অগাস্ট ২০২২ | ৮:৪৮ অপরাহ্ন


রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি : দেশে যকৃতের প্রদাহে বা হেপাটাইটিসে ভুগে বছরে প্রায় ২২ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের ৯ জনই জানে না তারা এই রোগে ভুগছে। এমন অবস্থায় রাঙ্গুনিয়ার পদুয়ায় বিনা মূল্যে দুই শতাধিক মানুষের হেপাটাইটিস পরীক্ষা করানো হয়েছে।

আজ শুক্রবার (১৯ আগস্ট) পদুয়া ইউনিয়ন পরিষদের পুরাতন অফিসে এই আয়োজন করে খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশন। আয়োজনে সহযোগিতা করে লিভার কেয়ার সোসাইটি।

আজকের আয়োজনে যে দুই শতাধিক মানুষ হেপাটাইটিস পরীক্ষা করিয়েছেন তাদের মধ্যে ১০ জন পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। ১০ জনের মধ্যে ৮ জন হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ২ জন হেপাটাইটিস ‘সি’ পজিটিভ। পজিটিভ রোগীরা পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়ে পরামর্শ পেয়েছেন।

হেপাটাইটিস পরীক্ষা করতে আসা পদুয়ার রিনা দাশ (৪০) একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার জরায়ুতে টিউমারের সৃষ্টি হয়। টাকার অভাবে এখনো অপারেশনটা করানো সম্ভব হয়নি। একদিকে অপারেশন করাতে লাগবে বড় অংকের টাকা অন্যদিকে অপারেশনের আগে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ। এমন সময় খবর পেয়েছি বিনামূল্যে হেপাটাইটিস পরীক্ষা করানো হবে। আজকে পরীক্ষা করে জানতে পারলাম আমি হেপাটাইটিস মুক্ত। খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

হেপাটাইটিস পরীক্ষা করাতে আসা একই এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল (২৫) একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিনামূল্যে পরীক্ষা করিয়েছি। রিপোর্টও হাতে পেয়েছি। জানতে পারলাম আমি নেগেটিভ। শুনে খুব ভালো লাগছে। ডাক্তার বলছেন আমার যখন নেগেটিভ আসছে সেক্ষেত্রে আমি টিকা নিয়ে নিতে পারবো, যাতে ভবিষ্যতে এ রোগ আমাকে আক্রান্ত না করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে এসে ডাক্তারের আলোচনা শুনে বুঝলাম হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস কীভাবে মানুষকে নীরবে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যায়। আর এ থেকে মুক্তি পেতে দৈনন্দিন জীবন কীভাবে পরিচালনা করতে হবে তা আজ জানলাম। ঘরে গিয়ে সবার সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করবো এবং তাদের সবাইকে পরীক্ষা করিয়ে নিতে বলবো।’

এদিকে বিনা মূল্যে হেপাটাইটিস পরীক্ষার এ আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন পদুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু জাফর।

একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইডেন ইংলিশ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি মেম্বার মো. খালেদ মাহমুদ। সার্বিক তত্ত্বাবধান ও ডকুমেন্টারি উপস্থাপনায় ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু, র‍্যাংগস এফসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর শাহরিয়ার রিমন, দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি ওবাইদুল ইসলাম, একুশে পত্রিকার সম্পাদকীয় পরামর্শক নজরুল কবির দীপু, খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের পরিচালক শাহাদাত হোসেন তালুকদার।

অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের পরিচালক হাজী শওকত হোসেন তালুকদার, দিলদার হোসেন, মোহাম্মদ আলী, জমির হোসেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. অঞ্জন বিশ্বাস, দপ্তর সম্পাদক নুরুল আজিম, পদুয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মো. তারেক সোহেল, ব্যাংক কর্মকর্তা ওয়াসীম আলী নূর, যুবলীগ নেতা দিদার হোসেন পাইলট, দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া পদুয়া ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরাফাত হোসেন, খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের সদস্য আবছার রাফি ও জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইডেন ইংলিশ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘পৃথিবীতে ৩২ কোটি মানুষের মাঝে ৩০ কোটি মানুষই জানেন না হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের বিষয়ে। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে শুধুমাত্র একজনই এ বিষয়ে জানেন। বিনামূল্যে হেপাটাইটিস পরীক্ষার মতো মহৎ একটি উদ্যোগ নিয়ে খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশন এগিয়ে এসেছে। তা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। এতে মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকুক।’

তিনি বলেন, খাওয়া-দাওয়া ও শরীরের সৌন্দর্যের বিষয়ে আমরা কত কিছু করি কিন্ত সে শরীরটা সুস্থ রাখার জন্য কিছুই করি না। হেপাটাইটিস সম্পর্কে না জানলে এ রোগের নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। তাই এ বিষয়ে সবাইকে জানতে হবে। আজ যারা খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন তাদের মধ্যে যাদের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে তারা যেন প্রথম টিকাটা নিয়ে নেন। আর প্রথম টিকার ডকুমেন্টস দেখালে পরবর্তী টিকাগুলোও আমরা ব্যবস্থা করে দেব।’

চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের সাথে আমি আছি, ভবিষ্যতেও থাকবো। সমাজের কল্যাণে এ ফাউন্ডেশন যেন আরও এগিয়ে যায়। আজকের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে আমার পরিবার এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, হেপাটাইটিস বি এবং সি লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার ও লিভার ফেইলিউরের কারণ। সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এভাবে মারা যায়, যা এইডসের মৃত্যুরে চেয়ে বহুগুণে বেশি। বাংলাদেশ থেকে হেপাটাইটিস দূরীকরণে সরকার, জনগণ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘অর্থের বিত্তে বিত্তবান অনেকেই আছেন, চিত্তের বিত্তে বিত্তবান কয়জন আছেন? আমি মনে করি আজাদ তালুকদার সেই চিত্তের বিত্তে বিত্তবান। তিনি এলাকাকে, পরিবারকে প্রতিনিয়ত ধারণ করেন। এলাকাকে সুন্দর করার জন্য এ উদ্যোগটা নিয়েছেন মা-বাবার সুযোগ্য সন্তান হিসেবে।’

তিনি আরও বলেন, অনেকের জন্ম হয় কিন্তু মৃত্যু হয় না। তারা মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন তাদের কর্মগুণে। যেমন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু হয়নি। কেবল শরীর বিলিন হয়েছে। তিনি আমাদের মাঝে আজীবন বেঁচে থাকবেন। তেমনি মা-বাবাকে বাঁচিয়ে রাখতে আজাদ তালুকদার সৃষ্টি করেছেন খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশন। আমি নিজেই আজাদ তালুকদারকে বলেছি এ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করতে। আজাদ তালুকদার খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের জন্ম দিলেও এ ফাউন্ডেশন গোটা এলাকারই, গোটা সমাজেরই।’

এমন মহৎ উদ্যোগ নেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে একুশে পত্রিকার সম্পাদকীয় পরামর্শক নজরুল কবির দীপু বলেন, হেপাটাইটিস সম্পর্কে আমাদের কারও তেমন ধারণা নেই। আজকের এ অনুষ্ঠানে হেপাটাইটিস সম্পর্কে ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ যেভাবে সকলকে জানিয়েছেন তাতে এ বিষয়ে অনেকেই সচেতন হবেন।’ ভবিষ্যতে খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশন যাতে অন্যান্য এলাকায় এভাবে ক্যাম্পেইন অব্যাহত রাখে সেজন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানান তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে র‍্যাংগস এফসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর শাহরিয়ার রিমন বলেন, ‘ভয়াবহ সংক্রামক রোগ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীর অনেকেই পরবর্তীকালে লিভার সিরোসিস কিংবা লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা এবং এর প্রতিরোধ, রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা বিষয়ে সবাইকে উৎসাহী করা উচিত। বিনামূল্যে হেপাটাইটিস পরীক্ষার আয়োজন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশন।’

দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘অনেকের টাকা থাকলেও সেবা করার মন-মানসিকতা থাকে না। আজ পদুয়ারই সন্তান একুশে পত্রিকার সম্পাদক আজাদ তালুকদার খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এমন একটি সেবামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করেছেন। এ জন্য আমি এলাকার পক্ষ থেকে এবং আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে ওনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

অনুষ্ঠানে পদুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু জাফর বলেন, ‘খায়ের আহমেদ তালুকদার সারাজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন, আজাদ তালুকদার তাঁরই ছেলে। তিনিও তার বাবার মতো সমাজ এবং দেশের জন্য অবিরত কাজ করে যাচ্ছেন। খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হচ্ছে।’ এমন সুন্দর আয়োজনের জন্য খায়ের-জাহান ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানান তিনি।