বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

বিচারের অপেক্ষা ফুরায়নি ২৫ বছরেও

প্রকাশিতঃ ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৪:০৫ অপরাহ্ন


এম কে মনির : ২৫ বছর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) একটি কটেজে হত্যা করা হয় চবির ৩১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী গণিত বিভাগের ছাত্র আমিনুল হক বকুলকে। হত্যাকাণ্ডের পর এত বছর পর হলেও বিচার পায়নি তার পরিবার। হত্যা মামলাটি বর্তমানে জেলা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ২৫ বছর আগের এ ঘটনার বিচার চান বকুলের সহপাঠীরা।

১৯৯৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিকাল সাড়ে ৫টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রেল স্টেশনের পাশে একটি কটেজে ঘুমন্ত অবস্থায় চবির ৩১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী গণিত বিভাগের ছাত্র আমিনুল হক বকুলকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। অভিযোগ আছে, এ খুনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে একচ্ছত্র আধিপত্য ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ আন্দোলন থামিয়ে দিতে চেয়েছিল শিবির। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে হত্যা, খুন এবং আতঙ্ক তৈরির মাধ্যমে পুরো ক্যাম্পাসকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল তারা।

শহীদ বকুল সৃতি সংসদের সভাপতি মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, বকুল হত্যার মাধ্যমেও শিবির পুরো ক্যাম্পাসে ভয় ছড়িয়ে দিয়ে তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের এমন হিসাব উল্টে গেল সে সময়ে এ ক্যাম্পাসের কিছু সাহসী ও নিবেদিত প্রাণের দীপ্ত পদচারণায়। বকুলের বন্ধুরা সংগঠিত হলো ‘শহীদ বকুল স্মৃতি সংসদ’ গঠনের মাধ্যমে। দল-মত নির্বিশেষে একত্রিত হলো সবাই। সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ছাত্র ঐক্য গড়ে উঠলো। তীব্র প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হলো ছাত্ররা। দিনে দিনে প্রবল হয়ে ওঠা এ প্রতিরোধ আন্দোলনে শরিক হতে লাগলো সাধারণ ছাত্র-শিক্ষক কর্মচারীসহ আপামর ছাত্র-জনতা। এমন প্রবল আন্দোলনে পিছু হটতে বাধ্য হয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। তাদের দীর্ঘদিনের আধিপত্য খর্ব হলো আরও অনেক তাজা প্রাণের রক্তের বিনিময়ে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আমিনুল হক বকুল খুন হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। খুনের ঘটনায় ১১ জনকে আসামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার (নিরাপত্তা) গোলাম কিবরিয়া বাদী হয়ে হাটহাজারী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে সিআইডি তদন্ত শেষে শিবিরের ৬ নেতাকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়।

এরপর শুরু হয় মামলার বিচার কার্যক্রম। সেই হত্যা মামলায় ১৭ জনকে সাক্ষী করা হলেও ২৫ বছরে একজনও সাক্ষ্য দেননি। একের পর এক সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য তারিখ পড়ে যাচ্ছে মামলাটির। এর মধ্যে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এলে মামলাটি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। চবি কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলাটি তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ে মামলার ৪ আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করেন। পরে ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম অতিরিক্ত দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালত মামলা থেকে ৪ শিবির নেতাকে অব্যাহতির আদেশ দেন।

অব্যাহতি পাওয়া শিবির নেতারা হলেন- মামলার প্রধান আসামি চবি ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নাছির উল্লাহ, মুজিবুর রহমান মঞ্জু (বর্তমানে এবি পার্টি), আব্দুল হান্নান ও মিয়া মোহাম্মদ তৌফিক। বর্তমানে এ মামলায় আসামি রয়েছেন কবির হোসেন ও ওয়ালিউর রহমান। তারাও এখন পলাতক। এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ২০২৩ সালের ১৫ জানুয়ারিকে ধার্য করেছেন আদালত।

নিহত আমিনুল হক বকুলের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার ভৈরব রেল স্টেশন এলাকায়। বকুলের ছোট ভাই আরমানুল হক বলেন, ‘ভাইয়া ছিলেন পরিবারের সবার বড় ছেলে। পরিবারের স্বপ্ন ছিল তিনি পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের হাল ধরবেন। কিন্তু তাকে খুন করায় সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি৷ ২৫ বছর পার হলেও হত্যার বিচার পাইনি আমরা।’

বকুল স্মৃতি সংসদের সভাপতি মো. ইউসুফ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বকুল ছিলেন চবি ক্যাম্পাসে সাম্প্রাদায়িকতার বিরুদ্ধে এক সাহসী বীর। দীর্ঘ ২৫ বছরেরও এ মামলার বিচার না হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাস্ট্রযন্ত্রের জন্য লজ্জার।’

চট্টগ্রাম জেলা পিপি শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কীসের ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় আসামিদের মামলা থেকে বাদ দেয়ার সুপারিশ করেছে তা জানি না। তবে বকুলের পরিবার যদি মনে করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তবে তারা উচ্চ আদালতে যেতে পারেন। চলমান সাক্ষীদের সাক্ষ্যে যদি অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের নাম আসে, যুক্তিতর্কে আবারও তাদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ আছে। জেলা পিপি হিসেবে মামলাটি নিস্পত্তির জন্য আমি সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

এদিকে গত ৩ সেপ্টেম্বর আমিনুল হক বকুলের ২৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণ সভায় আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, ২৫ বছর আগে আমিনুল হক বকুলের হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক, পৈশাচিক ও হৃদয়বিদারক। জামায়াত-শিবিরের মৌলবাদী শক্তি ক্যাম্পাসে প্রগতির চর্চা চিরতরে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বকুলের হত্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেদিন মেনে নিতে পারেনি। তারা সম্মিলিতভাবে মর্মান্তিক এ হত্যার প্রতিবাদে মাঠে নেমেছিল।

মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল বলেন, আমিনুলের বাবার একটি স্বপ্ন ছিল। তিনি তার ছেলেকে একটি স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। আমি এখনো ছাত্রলীগের ছেলেদের বলি রাজনীতি করো, তবে বাবার স্বপ্নকে শেষ করে দিও না। গ্রুপিংয়ের বলি হয়ে গুলি খেয়ে নিহত হইয়ো না। কী পেয়েছেন আমিনুল হকের বাবা। আজ আপনারা কিছু অনুদান দিয়েছেন। তার বাবা কি ফিরে পাবে সেই ছেলেকে। আজ তার সকল সহপাঠীসহ আমাদেরকে এ হত্যার বিচারে এগিয়ে আসতে হবে। সকলকে উদ্যোগী হয়ে আমিনুল হক বকুলের হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।