বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

প্রভাবশালীর ছেলের সঙ্গে প্রেমের পরিণতি!

প্রকাশিতঃ ৫ অক্টোবর ২০২২ | ১১:২৮ অপরাহ্ন


এম কে মনির : চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর থানাধীন দাঁতমারা ইউনিয়নে নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু ঘটনা ঘটেছে। মৃত্যুর মাত্র ৪ ঘণ্টা পর ওই তরুণীকে তড়িঘড়ি করে দাফনও করা হয়েছে।

বাবার উপস্থিতি ছাড়াই দ্রুততম সময়ে দাফন, ময়নাতদন্ত না করা এবং উক্ত ঘটনা নিয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের ‘অবগত না থাকা’ ও পরিবারের নিরবতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত তিনটার দিকে ভূজপুর থানাধীন দাঁতমারা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড কাঞ্চনা গ্রামে ওই তরুণীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

নিহত সানজিদা আক্তার (১৫) ওই এলাকার আবুল বাশার প্রকাশ জাহাজি আবুল বাশারের মেয়ে ও ভূজপুর এ বি জেড সিকদার উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির ছোট ছেলের সঙ্গে সানজিদার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সম্পর্কের অবনতি হয়ে সম্প্রতি তাদের মাঝে মনোমালিন্য দেখা দেয়। ওই ছেলের প্ররোচনায় মঙ্গলবার দিবাগত রাত তিনটায় সানজিদা গলায় ওড়না পেঁচিয়ে নিজ কক্ষে আত্মহত্যা করেছেন। তবে ওই প্রভাবশালীর ভয়ে নিহত সানজিদার পরিবার মুখ খুলছেন না, স্বাভাবিক মৃত্যু বলে প্রচার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

কাঞ্চনা গ্রামের একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, সানজিদার আত্মহত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে একটি পক্ষ নানাভাবে সানজিদার পরিবারকে প্রভাবিত করছে। ওই পক্ষের নানামুখী তৎপরতায় এক প্রকার বাধ্য হয়ে সানজিদার পরিবার তড়িঘড়ি করে মৃত্যুর মাত্র ৪ ঘণ্টার মাথায় বুধবার সকাল ৭টায় সানজিদার দাফন সম্পন্ন করেছে। শুধু তাই নয়, নিজের মেয়ের দাফনে বাবা আবুল বাশার অংশ নিতে পারেননি বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে কাঞ্চনা গ্রামের একজন বাসিন্দা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অত্যন্ত প্রভাবশালী এক ব্যক্তির ছেলে এলাকায় মাটির ব্যবসা করে। তার সাথে সানজিদার সম্পর্ক ছিল। ওই ছেলের প্ররোচনায় সানজিদা আত্মহত্যা করেছে। এখন তাদের ভয়ে সানজিদার পরিবার তটস্থ। ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। এমনকি থানায় অভিযোগ পর্যন্ত করেনি সানজিদার পরিবার। ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাকে দ্রুত দাফন করা হয়েছে।’

এদিকে সানজিদার মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্য মিলেছে। সানজিদার বাবা আবুল বাশার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার মেয়ের গায়ে জ্বর ছিল। জ্বরে হয়ে সে মারা গেছে। কারও সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল কিনা আমি বলতে পারব না।’

সানজিদাকে দ্রুত দাফন করা ও নিজের মেয়ের দাফনকার্যে অংশ নিতে না পারার বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল বাশার বলেন, ‘আমি মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়েছি রাত আড়াইটায়। আমি চাকরির কারণে ঢাকার আরিচায় থাকি। সেখান থেকে আসতে দেরি হয়ে গেছে। মেয়ে মানুষ তাই দ্রুত দাফন করা হয়েছে।’

জানতে চাইলে দাঁতমারা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. পারভেজ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি সানজিদার মৃত্যুর খবরটি পেয়েছি দুপুরে। তখন মেয়েটির দাফন হয়ে গেছে।’ যদিও স্থানীয়দের দাবি, ইউপি সদস্য পারভেজ জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মো. পারভেজ বলেন, ‘আমার এলাকায় মৃত্যু হলেও আমাকে যদি না জানায় আমি কীভাবে জানব। দুপুরে সাংবাদিকরাই আমাকে জানিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে শুনেছি সেখানে সাংবাদিক ও পুলিশ গিয়েছে।’

কথোপকথনের একপর্যায়ে ইউপি সদস্য মো. পারভেজ ওই প্রভাবশালীর ছেলের চরিত্রের সনদ দিতে শুরু করেন। সানজিদাকে ‘থার্ড ক্লাস’ মেয়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘.. ছেলে এরকম থার্ড ক্লাস মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে পারে না। সে অনেক ছোট এবং ভালো ছেলে। সে ভালো করে কথাও বলতে পারে না। কীভাবে সম্পর্কে জড়াবে।’ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে ছোট কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব ছেলে আর সে এক নয়। সে একটু সাদাসিধে। তার পক্ষে প্রেম করা সম্ভব না।’

এ বিষয়ে দাঁতমারা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই নাজমুল কবির একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা এ রকম কোনও মৃত্যুর খবর পাইনি। কোনও অভিযোগও পাইনি।’

একই কথা বলেন ভূজপুর থানার ওসি হেলাল উদ্দিন ফারুকী। তিনি বলেন, ‘কেউ আমাকে অভিযোগ করেনি। সানজিদার মৃত্যু সম্পর্কে থানা পুলিশ অবগত নয়। আত্মহত্যা নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু সেটাও বলতে পারব না। কারণ আমরা এটি সম্পর্কে জানি না।’ যদিও স্থানীয়দের দাবি, বুধবার সকালে ওই এলাকায় গিয়েছিল পুলিশ।

নিজের ছেলের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে এক সময় কারাগারে যাওয়া ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার ছেলে শহরে থাকে। সেখানে ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করে। সে গ্রামে থাকে না। এসব কথা কে বলেছে আপনাকে? আপনি লিখে দেন। আমার কোনও সমস্যা নেই।’