চট্টগ্রাম: নগরীর জিইসি মোড়ের ওয়েল ফুড নামের মিষ্টির দোকান। সড়কের অপর পাশে নিরিবিলি হোটেলের নিচে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছেন এক যুবক। একটু পর রাস্তা পার হলেন কালো রংয়ের ওই যুবক। এর পরপরই মোটরসাইকেল নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন দুই যুবক। মোটরসাইকেল চালকের মাথায় ছিল হেলমেট। তিনি মোটসাইকেল দিয়ে সামনাসামনি ধাক্কা দেন শিশুর হাত ধরে হাঁটতে থাকা এক মায়ের উপর। এতে পড়ে যান ওই নারী। তারপরই দুই যুবক মিলে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করতে থাকেন তাকে। একপর্যায়ে তিনি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে কাছ থেকে করা হয় গুলি। প্রথম ফায়ারটি মিস হয়। দ্বিতীয় ফায়ারে কপালের বাঁ পাশে গিয়ে লাগে। এরপর তিনজনই মোটরসাইকেল নিয়ে গোলপাহাড় মোড়ের দিকে পালিয়ে যায়। মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় হেলমেট ছিল। একজনের দুই হাতে দেখা গেছে দুটি পিস্তল, আরেকজনের হাতে একটি পিস্তল।
শনিবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে চট্টগ্রামে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে হত্যার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর সাথে কথা বলে ও ভিডিও ফুটেজ দেখে হত্যাকান্ডের এমন বর্ণনা মিলেছে।
ভিডিও ফুটেজ দেখে তদন্তকারী দলের একজন কর্মকর্তা বলেন, গোলপাহাড় মোড়ের দিক থেকে এসে তারা জিইসি মোড়ের কাছে গিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে বাবুল স্যারের স্ত্রীর সামনে আসেন। ঘটনায় ব্যবহার করা মোটরসাইকেলটি একেবারে পুরনো। মিশন শেষে পালানোর সময় ঘটনাস্থলের অদূরে মোটর সাইকেলটির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এর কিছুক্ষণের মধ্যে মোটরসাইকেলটি সচল করে তারা পালিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটি ঘটেছে এক মিনিটের মধ্যে। সব ঘটনা সামান্য দূর থেকে দেখেছেন পাশের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে দায়িত্বরত ৫জন আনসার সদস্য। কিন্তু তারা এগিয়ে যাননি, বাঁধা দেননি। তবে ঘটনা শেষ হওয়ার পর তারা লাশের কাছে ছুটে যান। আনসাররা বাঁধা দিলে খুনিরা নিশ্চিত ধরা পড়ে যেত।
পুলিশের এ কর্মকর্তা আরো বলেন, আনসারদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা জানিয়েছে, ঘটনার আকস্মিকতায় তারা কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। খুনের ঘটনায় জড়িত তিনজনের বয়স ৩০ বছরের মতো হবে।
এদিকে নিহত মাহমুদা খানম মিতুর স্বামী পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। একজন সাহসী ও চৌকস অফিসার হিসেবে তিনি সুপরিচিত। অপরাধ দমনে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে দুইবার পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম)। একবার করে পেয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম) ও আইজিপি ব্যাজ। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বায়েজিদে এক ফকির ও তার খাদেম হত্যা এবং ২৩ সেপ্টেম্বর সদরঘাটে বোমায় ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার দুটি ঘটনার তদন্তে নামেন বাবুল আক্তার। ক্লু লেস এ দুটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে গ্রেফতার করেন জেএমবির সামরিক প্রধান জাবেদসহ পাঁচজনকে; সন্ধান পান জেএমবির একটি আস্তানার।
এরপর ৫ অক্টোবর কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগরের ওই আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। ওই অভিযানে গ্রেফতার হওয়া জেএমবি নেতা জাবেদ ৬ অক্টোবর ভোরে পুলিশের সঙ্গে অভিযানে থাকা অবস্থায় গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত হন। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমানবাজার এলাকায় জেএমবির চট্টগ্রামের প্রধান রাইসুল ইসলাম ওরফে ফারদিনের ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র-গুলি ও সেনাবাহিনীর পোশাক উদ্ধার করা হয়। বাবুল আক্তারের নেতৃত্বে ওই অভিযানে রাইসুলের তিন সহযোগীও গ্রেফতার হন। এসব ঘটনার পর থেকেই বাবুল আক্তার হুমকি পেয়ে আসছিলেন বলে তিনি সহকর্মী ও সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন।
এমনকি হুমকি আসায় পরিবার নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুও। শারমীন আক্তার নামে এক প্রতিবেশীকে মাহমুদা বলেন, বেশ কয়েকবার নানাভাবে হুমকি পাওয়ার কথা আমাদের জানিয়েছিলেন। ওনার স্বামী ঢাকায় থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে ভুগছিলেন। কয়েকদিন আগে বলেছিলেন এই বাসা সবাই চিনে গেছে, বাসা বদলে ফেলতে হবে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (উত্তর) পরিতোষ ঘোষ বলেন, মোটরসাইকেলে করে এসে ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। এই ধরনের স্টাইলে হামলা, জঙ্গিরা করে থাকে। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে বাবুল আক্তারের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এ কারণে তার স্ত্রীকে হত্যা করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দুজন পুলিশ সদস্য সার্বক্ষণিক বাবুল আক্তারের বাসায় নিরাপত্তায় ছিলেন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় তারা বাসা থেকে চলে আসেন। রোববার সকালে আবার বাসায় যেতেন তারা। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
