সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য কি ভেস্তে যাচ্ছে

শরীফুল রুকন : তাজু আরা বেগম (৭৩)। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের মোহাম্মদ উল্লাহ পাড়ার বাসিন্দা তিনি। চার বছর ধরে বয়স্ক ভাতা পান তাজু আরা বেগম। কিন্তু এই টাকা দিয়ে তাঁর কিছুই হয় না।

তিনি বলেন, ‘আর জামাই নাই, পুয়াও নাই। দুই মাইয়ারে বিয়ে দিইয়ি ইতারার বাপ থাকতে। মাইয়াপুয়াঅলর জামাই অল যে হাম পায় ইয়ান গরে। ইতারা চলতে কেয়ামত অর, আরে কেন গরি চাইবু? গরের ডাগর মাইনসে আরে চায়, হোন মতে দিন হাডাইদ্দি (আমার স্বামী নাই, ছেলেও নাই। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি তাদের বাবা থাকতে। মেয়ের স্বামীরা যে কাজ পায় তা করে। তাদের চলতে কেয়ামত হচ্ছে, আমাকে কীভাবে দেখবে? বাড়ির পাশের মানুষরা আমাকে দেখেন, কোনোমতে দিন কাটাচ্ছি।’

তাজু আরা বেগম আরও বলেন, ‘তিন মাস পরপর মোবাইলত (মোবাইলে) ১৫০০ টিয়া (টাকা) পাই। ইয়ান দিয়েনে কিছু অয় না? (এটা দিয়ে কিছু হয়?) একবার রাঁধি দুই দিন গরি হাই (একবার রান্না করে দুই দিন করে খাই)। সরকার যদি বয়স্ক ভাতার টিয়া (টাকা) বাড়াই দে (বাড়িয়ে দেয়) তইলি বওত ভালা অয় (তাহলে অনেক ভালো হত)।’

বাজারে আতপ চালের কেজি এখন ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। এ হিসাবে, একজন বয়স্ক, বিধবা অথবা স্বামী নিগৃহীতা নারী মাসে সরকারের কাছ থেকে যে ৫০০ টাকা ভাতা পান, ৮ কেজি চাল কিনতেই তা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। যাদের অন্য কোনো আয় নেই বা কাজ করতে পারেন না, তাদের এই অল্প টাকা দিয়ে আসলেই কিছু হয় না।

খোদ সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, গত নভেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অর্থ্যাৎ, ২০২১ সালের নভেম্বরে একজন মানুষ যে পণ্য ১০০ টাকায় কিনতেন, চলতি বছরের নভেম্বর মাসে একই পণ্য কিনতে খরচ হয়েছে ১০৮ টাকা ৮৫ পয়সা। তার মানে এক বছরের ব্যবধানে খরচ বেড়েছে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা। যদিও বাস্তবে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি বলে অভিযোগ আছে। এভাবে প্রতি বছর টাকার মান কমলেও ২০১৭ সালের পর থেকে বয়স্ক ও বিধবা ভাতার (সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত সবচেয়ে বড় কার্যক্রম) পরিমাণ বাড়েনি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘দারিদ্র্য দূরা করা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে আনাই হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। কারণ, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় সাত বছর আগের ৫০০ টাকার মূল্য এখন ৩৫০ টাকার কম। তাই ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি পুরো সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সংস্কার দরকার। অন্যথায় এই খাতের উদ্দেশ্য সফল হবে না।’

কেন গরি চলির আল্লাই জানে (কীভাবে চলছি আল্লাহই জানেন)

লায়লা খাতুন (৬৯)। চট্টগ্রামের আনোয়ারার বৈরাগ ৬ নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ গুয়াপঞ্চক এলাকার বাসিন্দা তিনি। ৬ বছর ধরে বয়স্ক ভাতা পান লায়লা। তাঁর স্বামী প্রতিবন্ধী হয়ে এখন শয্যাশায়ী; যদিও তিনি কোন ভাতা পান না। লায়লার একমাত্র ছেলে কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন।

বয়স্ক ভাতার টাকায় জীবন চলে কিনা জানতে চাইলে লায়লা খাতুন কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘কেন গরি চলির আল্লাই জানে (কীভাবে চলছি আল্লাহই জানে)।’ তিনি জানান, কাঠের আসবাবপত্রের চাহিদা কম থাকায়, তাঁর ছেলের আয় সীমিত। প্রতি মাসে স্বামী ও তাঁর জন্য দুই হাজার টাকার বেশি ওষুধও লাগে।

একই এলাকার বয়স্ক ভাতাভোগী মাসুমা খাতুন (৭০) বলেন, ‘তিন মাস পরপর দেড় হাজার টিয়া (টাকা) পাই। বাজার গরিবাল্লাই এগিন পুয়ারে দিই ফেলাই। ওষুধ-দাবাই হাইত না পারি (সেবন করতে পারি না)। এই যুগত মাসে ৫০০ টিয়া দি কি অয়? (এই যুগে মাসে ৫০০ টাকা দিয়ে কি হয়?)’

মাসুমা জানান, ২০১৬ সালে চালের কেজি ছিল ৪০-৪৫ টাকা, এখন দাম ৬০-৬৫ টাকা। সবকিছুর দাম বাড়ছে। ২০১৬ সালে তাদের যে ৫০০ টাকা ভাতা দিয়েছিল সরকার, এখনো সেটা দিচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে সরকার যদি ভাতার টাকাটাও বাড়িয়ে দেয় তাহলে ভালো হতো।

একইভাবে বয়স্ক ভাতার টাকা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন একই এলাকার বাসিন্দা হালিমা খাতুন। তিনি জানান, তাঁর চোখে অনেক সমস্যা। ঠিকমতো চোখে দেখেন না। এক ছেলে আছে। ওই ছেলে শুধু বছরে কাপড় দেয় আর রমজান মাসে সাথে রাখে। হালিমার প্রশ্ন, ‘ছেলেটা সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে তাঁর বউ-বাচ্চা নিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে, তাঁকে দেবে কীভাবে?’

সংশ্লিষ্টরা জানান, ৭ বছর আগে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা যখন এক লাফে প্রায় দ্বিগুণ করা হলো, তখন বয়স্ক নারী-পুরুষ এবং বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতাদের মাসে ৪০০ টাকা করে ভাতা দিত সরকার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তাদের ভাতা ১০০ টাকা বাড়িয়ে করা হয় ৫০০ টাকা। এরপর আর এই ভাতা বাড়ানো হয়নি। এছাড়া অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল চলতি অর্থবছরে ভাতাভোগীর সংখ্যা ১৫ লাখ বাড়ানোর ঘোষণা গত বাজেট বক্তৃতায় দিলেও এখন নতুন করে কাউকে বয়স্ক ও বিধবা ভাতার জন্য তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বয়স্ক ও বিধবা ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ভাতা একই রাখা হবে, নাকি ভাতাভোগীর সংখ্যা একই রেখে ভাতার অঙ্ক বাড়ানো হবে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্তে তালিকাভুক্তির কাজ সাময়িক বন্ধ আছে।’

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে নাকি কমেছে?

দারিদ্র্য দূর করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকার বর্ধিত হারে বরাদ্দ প্রদান করে আসছে বলে দাবি করে আসছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ আদৌ বেড়েছে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এমনিতেই বাংলাদেশ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয়ের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। বিশ্বে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে ফ্রান্স। ২০০০ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করে। এরপর রয়েছে সুইডেন; দেশটি ব্যয় করে ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এরপর অস্ট্রিয়া ব্যয় করে ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ, জার্মানি ব্যয় করে ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপর বেলজিয়াম ব্যয় করে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ, ফিনল্যান্ড ২২ দশমিক ৬ শতাংশ ও ইতালি ২২ দশমিক ৬ শতাংশ।

অন্যদিকে বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ জিডিপির ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ১১ শতাংশ।

অর্থ বিভাগ চলতি অর্থবছরের জন্য যে ১১৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তালিকা তৈরি করেছে, তাতে দেখা যায় অবসরভোগী সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন বাবদ ২৮ হাজার ৩৭ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্রের সুদ বাবদ ৭ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, করোনার কারণে ব্যাংকের সুদ মওকুফ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সুদ ভর্তুকি বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৃত্তির জন্য ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এগুলোকেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ বলে দাবি করে আসছে সরকার। এ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রের মধ্যমেয়াদি প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষা খাতের বাজেটের ৩৫ শতাংশের বেশি ব্যয় হয়েছে অবসর ভাতায়।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ১০ জুন বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘বর্তমানে ৫৭ লাখ ১ হাজার জন বয়স্ক ব্যক্তি মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা পাচ্ছেন। প্রতিবছর সামাজিক সুরক্ষার আওতা ও বাজেট বরাদ্দ উভয়ই বৃদ্ধি করে যাচ্ছি। এ খাতে বাজেট বরাদ্দ ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৮ গুণ বেড়েছে।’

এ বিষয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) চেয়ারম্যান বজলুল হক খন্দকার বলেন, ‘কম বরাদ্দের লজ্জা থেকে বাঁচতে সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সবসময় বড় করে দেখাতে চায় সরকার। মূল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে ধরা হলে বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি হবে না। সরকার এ খাতে যে বরাদ্দের কথা বলে থাকে, সেটা বিবেচনায় নিলেও দেখা যাচ্ছে জিডিপির তুলনায় বরাদ্দ কমে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা উচিত, তাদের অনেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন; আবার যাদের থাকা উচিত নয়, তারা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন। এ কারণেও এই খাতের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হচ্ছে না।’

অনিয়ম হয়েছে, প্রমাণও আছে, তবুও জড়িতদের আড়াল করার চেষ্টা!

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পন্থা। দারিদ্র্য দূর করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকার বরাদ্দ দিলেও তা দারিদ্র্য হার হ্রাসে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়নি বলে আলোচনা আছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি, পিপিআরসি ও বিআইজিডির মতে, করোনা মহামারির কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরে দারিদ্র্য হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশে। অর্থমন্ত্রী ২০২১ সালের ৯ জুন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণার ফলাফলে প্রাপ্ত দারিদ্র্য হারের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও করোনাকালীন তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে সরকার এখন পর্যন্ত জনগণকে জানায়নি দেশে দারিদ্র্যের হার কত।

সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল বলেন, ‘সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আনতে না পারার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- অর্থ বরাদ্দের স্বল্পতা। ভাতাভোগীদের মাথাপিছু বরাদ্দকৃত অর্থ তাদের জীবনধারণের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে পারছে না। ফলে তারা ‘দারিদ্র্যচক্র’ থেকে বের হতে পারছেন না। জীবনমানের উন্নতি না হওয়ায় তাদের শ্রেণিগত পরিবর্তন হচ্ছে না। অর্থাৎ তারা অতিদরিদ্র অথবা দরিদ্রই থেকে যাচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপকারভোগী নির্বাচন। উপকারভোগী নির্বাচনের দায়িত্বে থাকেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। তারা ভোট, ভোটারের চিন্তা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি মাথায় রেখে তালিকা তৈরি করেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তিরা তালিকাভুক্তি থেকে বাদ পড়েন, যার ফলে তারা কর্মসূচির সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন।’

ভাতাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে অনিয়ম হয়, তার বড় প্রমাণ চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হালিমা বেগম। স্বামী-সন্তান সব থাকার পরও এক যুগের বেশি সময় ধরে বিধবা ভাতা নিয়ে আসছিলেন তিনি। এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আয়ুব খান বলেন, ‘হালিমার স্বামী থাকলেও বিএনপি সরকারের আমল থেকে তিনি ভাতা পাচ্ছেন। সেই সময়ে বিএনপির নেতারা তাকে তালিকাভুক্ত করেছিলেন। গত বছরের মে মাসে বিষয়টি জানতে পেরে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিতরণ করা সুবিধার ৭৫ শতাংশই পেয়েছেন সচ্ছলরা। এছাড়া সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে ২০২০ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের (এনএসএসএস) মধ্যবর্তী উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, যোগ্য না হয়েও ভাতা নিচ্ছেন ৪৬ শতাংশ। আর বয়স্ক ভাতায় শর্ত পূরণ করেননি ৫৯ শতাংশ। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতায় অনিয়ম ধরা পড়েছে ২৩ শতাংশ। তবে ওই প্রতিবেদনে একে ‘অনিয়ম’ না বলে বলা হয়েছে, ‘তালিকাভুক্তির ভুল’। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসন এই সব তালিকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। এসব অনিয়মের কারণে তাদেরকে আইনের আওতায় আনার নজির নেই বললেই চলে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগের (জিইডি) অধীনস্থ এনএসএসএস’র প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, “উচ্চ ‘ভুলের’ (অনিয়ম) কারণে দরিদ্র নয় এমন লোকের কাছে সরকারি সহায়তার টাকা চলে যাচ্ছে। ফলে কর্মসূচিগুলো খুব কমই প্রভাব ফেলতে পারছে। যথাযথ ব্যক্তির কাছে এই সহায়তা গেলে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৩ থেকে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসবে। প্রকল্পের অনিয়ম বা ‘ভুল’ দূর করলে কোনো বাড়তি ব্যয় ছাড়াই ২৬ লাখ পরিবারের ১ কোটি ৭ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে আনা যাবে।”

পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এ এ মান্নান বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম হয়েছে। এখন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এসব সংশোধন করা হচ্ছে। এ কাজটি শেষ করতে অনেক সময় লাগবে।’

অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় বলা হয়, সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য ভাণ্ডারে নাম অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ১০০ থেকে ২০০ টাকা ঘুষ দিতে হয় উপকারভোগীদের। অতি দরিদ্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কাছ থেকেও ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে অনেক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে সুবর্ণ কার্ডের জন্য এক থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যে নতুন দুই লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভাতার আওতায় এসেছেন, ক্ষেত্রবিশেষে তাদের ভাতার অর্থের অংশ বিশেষ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে এসেছে গবেষণায়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সরকারের একটি অগ্রাধিকার বিষয়। কিন্তু এ কাজেও অনিয়ম-দুর্নীতি হয়। এই খাতের উদ্দেশ্য যেন ভেস্তে না যায় সেজন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।’

এদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বরাদ্দ থেকে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও সঞ্চয়পত্রের সুদ প্রদান নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। বলা হচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের পেনশন প্রদানে এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা অতি গরিব ও গরিব ভাতাভোগীদের বরাদ্দের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। পেনশনের অর্থ বাদ দিলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের পরিমাণ মোট বাজেটের ১২ দশমিক ৬২ শতাংশে দাঁড়াবে; যা গত অর্থবছরের ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কম। সঞ্চয়পত্রের লেনদেনের সঙ্গে গরিব ভাতাভোগীদের কোনো সম্পর্ক নেই। এ ব্যয়টিও গরিব ভাতাভোগীদের বরাদ্দের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘পেনশনের টাকা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দেখানো উচিত নয়। কারণ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীরা হতদরিদ্র নন। তাদেরকে কেন সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে? সামাজিক সুরক্ষা শুধু তাদেরকেই দিতে হবে, যারা হতদরিদ্র। এছাড়া উপকারভোগী বাছাইয়ে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একই সঙ্গে আমি ভাতার পরিমাণটা বাড়ানোরও অনুরোধ করছি। কেননা এই বাজারে মাসে ৫০০ টাকা দিয়ে আসলেই তেমন কিছু হয় না। এই টাকা দিয়ে দারিদ্র্যমুক্ত করা দূরের কথা, অনেক মানুষের দুইদিনের খাবারের খরচও হবে না।’

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু বলেন, ‘ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হবে নাকি টাকার অংক বাড়ানো হবে, এটা নিয়ে আলোচনা চলছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্দেশনা দেবেন, সেভাবে হবে। তবে আপাতত ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো গেলে ভালো। কারণ গ্রামের মানুষের কাছে ৫০০ টাকা অনেক। সেখানে খরচ কম।’

শহরে বসবাসের ‘অপরাধে’ ভাতা নেই

৬৫ বছরের বৃদ্ধা রাজিয়া বেগম। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গন্ডামারা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। সেখানে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার কারণে গৃহহীন হয়ে পড়েন রাজিয়া। এরপর বেঁচে থাকার তাগিদে ছুটে আসেন চট্টগ্রাম শহরে। বসবাস শুরু করেন বাকলিয়া থানাধীন জাইল্যার চর বস্তিতে। জীবিকার সন্ধানে জাল নিয়ে তাকে নামতে হয় কর্ণফুলীতে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিধবা হিসেবে ভাতা পাওয়ার উপযুক্ত হলেও মহানগর এলাকায় থাকার কারণে এ সুবিধা থেকে তিনি বঞ্চিত। কারণ ‘বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা’ শিরোনামের ভাতা কর্মসূচিটি মহানগর এলাকায় বাস্তবায়ন হয় না।

রাজিয়া বেগমের প্রশ্ন, ‘ভিক্ষা করার চাইতে মাছ ধরে খাওয়া, ভালো না?’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০১৮’ অনুসারে দেশে বিধবার সংখ্যা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং তালাকপ্রাপ্ত বা বিচ্ছিন্ন নারীর সংখ্যা ১ দশমিক ৪ শতাংশ। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ৬৬ শতাংশের বেশি বিধবা। মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লাখ। নারী-পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান।

বস্তিশুমারি ২০১৪ অনুসারে, ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৪ সালে শহরাঞ্চলে বস্তির সংখ্যা ২ হাজার ৯৯১টি থেকে বেড়ে ১৩ হাজার ৯৯৫টি হয়েছে। জনসংখ্যা ২২ লাখ ৩২ হাজারের বেশি। নারীর সংখ্যা ১০ লাখ ৩২ হাজারের বেশি। তৃতীয় লিঙ্গ ১ হাজার ৮৫২ জন। বস্তিবাসীদের প্রায় ৫ শতাংশ বিধবা। শুমারি অনুসারে ভাসমান মানুষের সংখ্যা সাড়ে ১৬ হাজারের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ বিধবা এবং ১ শতাংশের বেশি নারী তালাকপ্রাপ্ত বা বিচ্ছিন্ন।

চট্টগ্রাম শহরে বস্তিবাসী হওয়ায় কুলসুমা বেগমও (৫০) বঞ্চিত ভাতা পাওয়া থেকে। তুলাপুকুর বস্তির বাসিন্দা এ নারীর স্বামী জসিম উদ্দিন ১৫ বছর আগে দুই মেয়েকেসহ ফেলে চলে যান। এরপর থেকে জসিমের আর খোঁজ নেই।

শুধু শহরে বসবাস করার কারণে কুলসুমা ‘স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা’ পান না। অথচ গ্রামে বসবাসকারী নারীরা দুই বছর স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেই ওই ভাতা পাওয়ার যোগ্য হন। কুলসুমা জানালেন, গৃহকর্মী হিসেবে আয় করে মেয়েদের বড় করেছেন। একার আয়ে আর পারছেন না। তাই এক বছর ধরে মেয়েদেরকে গার্মেন্টসের চাকরিতে পাঠাচ্ছেন।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক-২ (বিধবা ও স্বামী নিগৃহিতা মহিলা ভাতা শাখা) এম এম মাহমুদুল্লাহ বলেন, ‘বস্তিতে শুধু বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী, এ দুটি ভাতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়। মহানগর এলাকায় ভাসমান লোকের সংখ্যা বেশি। এছাড়া শহরে কাজের ক্ষেত্র তুলনামূলক বেশি। এ কারণে মহানগরে বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতাটি কার্যকর রাখেনি সরকার।’

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে শহরের দরিদ্রদের অনেকেই বঞ্চিত

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে যে পরিমাণ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সে তুলনায় শহরাঞ্চলের দরিদ্রদের মধ্যে এর সুবিধা ভোগীদের সংখ্যা অনেকটাই কম। ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় পরিচালিত ‘বাংলাদেশ সোশ্যাল প্রোটেকশন পাবলিক এক্সপেনডিচার রিভিউ’ শীর্ষক গবেষণায়ও এমন তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার ২৬ শতাংশের কিছু ওপরে হলেও তাঁদের ৩৬ শতাংশের বেশি মানুষ সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আছেন। অন্যদিকে শহরাঞ্চলের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন বলে গবেষণায় উল্লেখ করে বলা হয়েছে, শহরে দারিদ্রের হার প্রায় ১৯ শতাংশ কিন্তু তাঁদের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পেয়ে থাকেন মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ।

এতে বলা হয়, শহর এলাকায় প্রতি ৫ জনে একজন দরিদ্র এবং শহরবাসীদের প্রায় অর্ধেক দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ ও শহর এলাকার মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বেড়েছে যার ফলে দেশের ১০টি পরিবারের মধ্যে তিনটি পরিবার এখন এই কর্মসূচির আওতায় আছে। কিন্তু এর কার্যকারিতা এখনো আশানুরূপ নয় বলে উল্লেখ করে বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা বাড়লেও দারিদ্র্যের হার আনুপাতিক হারে কমে নাই।

কর্মসূচির নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতা দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার তথ্য উল্লেখ করে গবেষণায় বলা হয়, এর ফলে এর কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে যারা দরিদ্র নন তাঁদের অনেকে এই কর্মসূচির সুফল ভোগ করছেন, যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত দরিদ্ররা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আগে গ্রামকেই দেশের দারিদ্র্য প্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হত। কিন্তু এখন শহরে দরিদ্র বাড়ছে। শহরে ভাসমান মানুষও অনেক বেশি। এখনকার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শহরের দরিদ্রদের দিকে নজর দিতে হবে এবং সে কারণে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পুনর্বিন্যাস করতে হবে। ভাতার টাকা ও ভাতাভোগীর সংখ্যা আরও অনেক বাড়াতে হবে। নয়তো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য ভেস্তে যাবে।’