
একুশে প্রতিবেদক : ‘আমি নিশ্চিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় সমস্ত কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ট্রমায় ভুগবেন। বিচারিক কাজ তো বটেই, এমনকি দৈনন্দিন জীবনযাপনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।’- হৃদয়ে রক্তক্ষরণ নিয়ে ফেসবুকে কথাগুলো লিখেছেন বান্দরবানের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান।
গত ১ ডিসেম্বর শীতকালীন ছুটির আগে আদালতের শেষ কার্যদিবস ছিল। ওই দিন তিনটি মামলা না নেওয়ায় গত ১ জানুয়ারি থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ ফারুকের আদালত বর্জন করেন আইনজীবীরা। এরপর ২ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর এজলাস চলাকালে বিচারক মোহাম্মদ ফারুকের সঙ্গে আইনজীবীদের বাদানুবাদের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, আদালতের মধ্যেই কয়েকজন আইনজীবী একজন বিচারককে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছেন এবং তাঁকে এজলাস থেকে নেমে যাওয়ার জন্য বলছেন। আদালতের এজলাসে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, ভিডিও ফুটেজটি না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। আইনজীবী সমিতির সভাপতি, যিনি আবার ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতাও বটে, ভিডিও ফুটেজে তাঁর আচরণ ও কথাবার্তা দেখে মনে হতে পারে, জোর যার মুল্লুক তার।
ওই ঘটনা নিয়ে ১০ জানুয়ারি ফেসবুকে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা জজ ম্যাম আমাদের মা’ শিরোনামে একটি পোস্ট দিয়েছেন বান্দরবানের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান।
তিনি লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাইরাল ভিডিও দু’টি চরম নৈরাজ্য, বিশৃংখলা ও অশ্লীলতার বহিঃপ্রকাশ। এতে সম্মানিত বিচারকরা অপমানিত ও অপদস্ত হয়েছেন। তাঁদের ও তাঁদের পরিবার পরিজনদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমাদের সদাশয় কর্তৃপক্ষ ও সম্মানিত অভিভাবকগণ
বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। কাজেই বিচার হবে এবং তা দৃষ্টান্তমূলকই হবে-সে ব্যাপারে আমি সর্বোচ্চ আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু আমার ভাবনায় আরো বেশি কিছু কাজ করছে।’
‘আমি ভাবছি -আমরা প্রতিদিন যাঁদেরকে নিয়ে বিচারের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করি, সেই মানুষগুলো আমাদের নিয়ে কী জঘন্য ভাবনাটুকুই না ভাবেন, আর কতটাই না নিচু ধারণা পোষণ করেন! যদি তা না হয়, তবে এই ধরণের কুরুচিপূর্ণ অশ্লীল ভাষা কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন? দীর্ঘদিন কোন ভাবনা এভাবে মনের গভীরে ধারণ না করলে এমন ভাষা হঠাৎ করে আসতে পারে না। অনেকেই বলবেন- এটা বিশেষ বারের ত্রুটি। কিন্তু সে কথা মন মানছে না। কারণ এ ধরণের ন্যাক্কারজনক ঘটনাটায় দেশের ছোট বড় কোন বার (আইনজীবী সমিতি) থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সম্মিলিত কোন নিন্দা বা প্রতিবাদ জানানো হয়নি। এ ধরণের ঘটনায় চুপ বা নির্লিপ্ত থাকা সমাজ ও সম্মানিত বিচারকগণকে ভিন্ন কোনো ম্যাসেজ দেয়।’
‘ইউনিভার্সেল নর্মস (সর্বজনীন নিয়ম) বলে কিছু একটা যে আছে তা কি বারগুলো পরিত্যাগ করেছে? এই মৌনতা কি ইতিহাসে সমগোত্রীয়দের গর্হিত কাজে নীরব সমর্থন বলে গণ্য হবে না? একটি বিশেষ বারের কুরুচিপূর্ণ আচরণ কি অন্য বারগুলোকে ছোট করেনি? নাকি এই অন্য বারগুলোর বিজ্ঞ আইনজীবীরা তাঁদের স্ব স্ব জেলার বিচারক মহোদয়গণ নিয়ে ঠিক একই ধারণা পোষণ করেন? আমরা জানি- পরিবারের একজন সদস্য যদি কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করে, তবে তা সবার জন্য লজ্জার। আমরা তো বিশ্বাস করতাম এবং এখনো করি- দেশের সমস্ত বার ও বেঞ্চ একই পরিবারভুক্ত। আমি চাই, আমাদের এই বিশ্বাস আজীবন অটুট থাকুক।’ লিখেছেন বিচারক মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান।
‘তাই আমি আশা করি, দেশের অন্য সমস্ত বার ঐক্যবদ্ধভাবে অভদ্রতা, অসভ্যতা, বিশৃংখলা ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান জানান দিবে। আমার সহকর্মীদের হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বারগুলোর সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট ঘোষণা সম্মানিত বিচারকদের ভাঙা মনকে কিছুটা হলেও প্রশান্তি দিবে। আমি নিশ্চিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় সমস্ত কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ট্রমায় ভুগবেন। বিচারিক কাজ তো বটেই, এমনকি দৈনন্দিন জীবনযাপনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।’
বান্দরবানের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান আরও লিখেছেন, ‘আমাদের সহকর্মীরা জানেন- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা জজ ম্যাম আচার, ব্যবহার, স্নেহ, ভালোবাসা ও যত্নে মাতৃসুলভ। হ্যাঁ, উনি আমাদের কাছে কেবল মায়ের মত নন, উনি আমাদের মা-ই। হ্যাঁ, মা, মা, মা। এবার বুঝুন- আমার মায়ের সাথে কী আচরণ করা হয়েছে? উনার বাবা-মা, মেয়েকে কষ্ট করে বড় করে কি এই ন্যাক্কারজনক প্রাপ্তির জন্য বিচার বিভাগে পাঠিয়েছিলেন? আর আমার এই মা আজীবন নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে গেছেন এই বিচার বিভাগেই। কেন? তা কেবল এদেশের গরীব অসহায় বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিটা নিশ্চিত করতে। ঐ ধরণের ভয়ংকর ভয়াবহ ভয়ানক ও দুঃস্বপ্নের মতো অশ্রাব্য অশালীনতা তিনি ডিজার্ভ করেন না।’
‘এদেশের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এখনো একজন নারীর জেলা জজ হয়ে উঠা কোন ছোটখাটো বিষয় নয়। এটা একটা মহাকাব্যিক সংগ্রামী যাত্রা। এ আলোকোজ্জ্বল যাত্রাপথ তৈরি হয়েছে বাবা-মায়ের অসংখ্য নির্ঘুম রাত ও মহান প্রভুর দরবারে তাঁদের অজস্র চোখের পানি, আর ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও শুভার্থীদের নিরন্তর শুভকামনায়। এ যাত্রাপথে তো পুষ্প বিছানো থাকার কথা ছিল। সৌভাগ্যবান জাতিরা তাই করে! কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের!’
‘মাননীয় ম্যাম, আপনি কেবল একজন জেলা জজ নন। আপনি এদেশের নারীদের গর্ব। সম্মানের মুকুট। আপনি আমাদের মা। আপনি আমাদের গৌরব। আমাদের অহংকার। আমাদের অভিভাবক। আমাদের ছায়া। আমাদের আশ্রয়। আপনার সম্মানহানি হয়নি। এ জাতির সম্মান হানি হয়েছে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের প্রতি অবমাননা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কোন মাকে কেউই ছোট করতে পারে না। যাঁরা মাকে ছোট করতে চায় তাঁরাই ছোট হয়ে যায়। নিঃশেষ হয়ে যায়। ধ্বংস হয়ে যায়। মায়ের সম্মান ঠিকই অটুট থাকে, কেউই টলাতে পারে না।’
‘যাঁরা এই ঘৃণিত কাজটি করেছেন তাঁরা না মায়ের সম্মান টলাতে পেরেছেন, না জজের সম্মান কমাতে পেরেছেন। বিচারকদের সম্মান স্বয়ং আল্লাহপাক সমুন্নত করেছেন, আর তিনিই সমুন্নত রাখবেন। বরং আপনারা নিজেরাই নিজেদেরকে, নিজেদের পরিবারকে ও পূর্বপুরুষদের ছোট করে ফেলেছেন। পরবর্তী বংশধরদের গায়ে ভবিষ্যতের জন্য লজ্জাজনক কালিমা লাগিয়ে দিয়ে গেলেন। এসব ভাইরাল রেকর্ড প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সংরক্ষিত থেকে যাবে। আপনাদের এসব অভদ্রতা ও বেয়াদবির কারণে পরবর্তী বংশধরদের মাথা হেঁট হয়ে থাকবে।’ লিখেছেন বান্দরবানের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান।
