এলবিয়নের রাইসুল-ইনোভেটিভের শাহিদুলের পাল্টাপাল্টি মামলা, নেপথ্যে কী


চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত ও তার সাবেক ব্যবসায়িক অংশীদার ইনোভেটিভ ফার্মার মালিক কাজী মো. শাহিদুল হাসানের মধ্যে দুটি পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে।

রোববার (১৫ জানুয়ারি) কাজী মো. শাহিদুল হাসান (৪৩) এলবিয়নের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকতসহ তিনজনকে আসামি করে প্রতারণার অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন- রাইসুলের ছোট ভাই ও প্রতিষ্ঠানটির ডিরেক্টর মোহাম্মদ মুনতাহার উদ্দিন সাকিব (৩৭) ও বাবা নিজাম উদ্দিন (৬৫)।

একদিন পর ওই মামলার বাদীসহ ৫ জনকে আসামি করে চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনালে এলবিয়নের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকতের পক্ষে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আরেকটি মামলা দায়ের করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ম্যানেজার মো. রফিক আহমদ।

এলবিয়নের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকতের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের দক্ষিণ রহমতনগর গ্রামে হলেও দীর্ঘদিন ধরে তার পরিবার নগরীর নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকায় বসবাস করে আসছেন।

অপরদিকে এলবিয়নের সাবেক কর্মকর্তা কাজী মো. শাহিদুল হাসান চট্টগ্রামের হাটহাজারীর কাটিরহাট ধলই এলাকার কাজী মোহাম্মদ হাশেমের ছেলে। তিনি বর্তমানে ইনোভেটিভ ফার্মা নামে একটি ওষুধ বাজারজাতকরণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তিনি দীর্ঘ ৯ বছর এলবিয়নের সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন।

জানা যায়, রোববার (১৫ জানুয়ারি) প্রতারণার অভিযোগ এনে কাজী মো. শাহিদুল হাসানের করা মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিটকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, মামলার বাদী কাজী মো. শাহিদুল হাসান ইনোভেটিভ ফার্মার মালিক হন। ২০১৪ সালে ওষুধ বাজারজাতকরণের শর্তে এলবিয়নের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তিতে আবদ্ধ হন তিনি। চুক্তিতে শর্ত ছিলো, এলবিয়নের উৎপাদিত ওষুধের বিক্রয়লব্ধ অর্থের ৪০ শতাংশ প্রাপ্ত হবেন এলবিয়ন কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে ৬০ শতাংশ প্রাপ্ত হবেন ইনোভেটিভ ফার্মার মালিক কাজী মো. শাহিদুল হাসান। এলবিয়ন ইনোভেটিভ ফার্মা ব্যতিত অন্য কোন প্রতিষ্ঠানকে তাদের পরিবেশক নিয়োগ দিতে পারবে না। কিন্তু চুক্তির মেয়াদকালীন সময়ে এলবিয়ন শর্ত ভঙ্গ করে এবং বাদীকে বড় ধরণের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, ২০১৬ সালের আগস্টে এলবিয়ন কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিদর্শন আসার সময় ট্যাক্স ফাঁকির অজুহাতে প্রতিষ্ঠানটির মালিকরা আনুমানিক ৫-৬ কোটি টাকার ওষুধ ইনোভেটিভ ফার্মার গুদামে সংরক্ষণ করেন। ওইসময় এলবিয়ন কর্তৃপক্ষ ওষুধগুলোর বিপরীতে কাজী মো. শাহিদুল হাসানের কাছ থেকে ৪০ শতাংশ হিসেবে ৯টি খালি চেক গ্রহণ করেন। একই সাথে আশ্বাস দেন যে, ওষুধগুলো বিক্রির পর চেকগুলো ফেরত দেবেন এবং কাজী মো. শাহিদুল হাসানকে কোম্পানির ৬০ শতাংশ শেয়ার প্রদান করবেন। কিন্তু সব শর্ত ভঙ্গ করে এলবিয়ন কোম্পানি সংরক্ষিত ওষুধ ফেরত নেয় এবং আগে নেওয়া চেকগুলো হাতিয়ে নেয়।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, সম্প্রতি মামলার বাদী মুঠোফোনে কল করে এলবিয়ন চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকতকে চেকগুলো ফেরত দেয়ার কথা জানালে রাইসুল তাকে জেলের ভাত খাওয়ানোর হুমকি দেয় এবং চেকগুলো ফেরত নিতে ২ কোটি টাকা দাবি করেন৷

এদিকে আজ সোমবার (১৬ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনালে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এলবিয়ন চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকতের পক্ষে একটি মামলা দায়ের করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ম্যানেজার মো. রফিক আহমদ। মামলায় ইনোভেটিভ ফার্মার মালিক কাজী মো. শাহিদুল হাসানকে (৪২) প্রধান আসামি করা হয়েছে।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- পাঁচলাইশ আমিন জুট মিলস হামজারবাগ কলোনীর মো. ফজলুল করিমের ছেলে মো. জাহিদুল করিম ওরফে রিমন (৩০), একই এলাকার বড়বাড়ি গলির মো. আজগর আলীর ছেলে শওকত আলী ওরফে রিফাত (২৯), হাটহাজারীর কাটিরহাট ধলই এলাকার কাজী মোহাম্মদ হাশেমের ছেলে কাজী মোহাম্মদ রুবাইদুল হাসান (৩৫) । মামলার অপর আসামি কামাল হোসাইনের (৩৮) বাবার নাম ও ঠিকানা অজ্ঞাত উল্লেখ করা হয়েছে।

এ মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, কাজী মো. শাহিদুল হাসানের কাছে এলবিয়ন পাওনা টাকা চাইলে তিনি এলবিয়নকে ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বিপরীতে ৫টি চেক প্রদান করেন। কিন্তু সময়মতো চেকের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন তিনি। পরবর্তীতে এলবিয়ন তার বিরুদ্ধে ৫টি পৃথক মামলা দায়ের করেন। এসব মামলায় ক্ষুব্ধ হয়ে কাজী মো. শাহিদুল হাসান এলবিয়নের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।

তারই অংশ হিসেবে গত ৫ জানুয়ারি গভীর রাতে নগরীর নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির ১ নং রোড, সানসাইন গ্রামার স্কুলের দেয়ালে, রুপনগর ক্লাবের পাশে, জেনারেল হাসপাতালের ওয়ালে ও প্রবর্তক মোড়ের সিএসসিআরের সামনে আসামি কাজী মো. শাহিদুল হাসান অন্য আসামিদের সঙ্গে নিয়ে কোম্পানি ও কোম্পানির চেয়ারম্যানের ছবি দিয়ে ‘ভেজাল ওষুধ সেবন থেকে মুক্তি চাই’ শিরোনামে পোস্টারিং করে। এ ধরণের কাজ কোম্পানির বিরুদ্ধে জনসম্মুখে আক্রমণাত্বক, মিথ্যা ও ভীতিকর তথ্য প্রদর্শনের সামিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।

মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে, একই কায়দায় গত ৭ জানুয়ারি নগরীর সেভরন, ডেল্টা হাসপাতাল, ইবনে সিনা, পার্কভিউ, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ও প্রবর্তক মোড়ে আসামিরা পোস্টারিং করে কোম্পানি ও চেয়ারম্যানের মান ক্ষুন্ন করে। একই সাথে মামলার ২ নং আসামি জাহিদুল করিম রিমন তার ব্যবহৃত ফেসবুক আইডি থেকে এলবিয়নের উৎপাদিত ওষুধ প্রেগাবিড-৫০ এর ছবি দিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও বানিয়ে অপপ্রচার করে। ওই পোস্টের ক্যাপশনে রিমন লিখেছেন, যেই কোম্পানি প্রোডাক্টের গায়ে ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট, এক্সপায়ার ডেট ও ব্যাচ নম্বর লিখতে ভুলে যায়, আর এই ছাগল কোম্পানির পক্ষে আর যাই হোক ভালো প্রোডাক্ট উৎপাদন সম্ভব নয়। বিদেশে ওষুধ রপ্তানি দূরে থাক।

আদালত উক্ত মামলাটি গ্রহণ করে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।

এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড’র সিনিয়র ম্যানেজার মো. রফিক আহমদ বলেন, এটি আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এটি মূলত তারা নিজেদের প্রতারণা ঢাকতে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। এ নিয়ে আমরা আদালতে মামলা দায়ের করেছি।

অভিযোগের বিষয়ে কাজী মো. শাহিদুল হাসান বলেন, এলবিয়ন আমার সঙ্গে হওয়া চুক্তির সব শর্ত ভঙ্গ করেছে। আমাকে কোম্পানির শেয়ার দেবে বলেও দেয়নি। প্রতারণা করেছে। তাই আমি আদালতে মামলা করেছি। তবে পোস্টার লাগানোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমি কেনো পোস্টার লাগাতে যাব? এসব বিষয়ে আমি জানি না।