বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১৪ মাঘ ১৪২৮

জলবায়ু পরিবর্তনে নারীদের ওপর বিরূপ প্রভাব

প্রকাশিতঃ বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০১৫, ৬:৩৫ অপরাহ্ণ

:: রেহানা বেগম রানু ::

climate changeমানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র আমিনুদ্দির কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। এক ঝড়ের রাতে আমিনুদ্দির মাছ মারতে পদ্মায় গিয়েছিল। ঝড়ের তান্ডব শেষে বাসায় ফিরে দেখতে পায় তার স্ত্রী গাছের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে। ঝড়ো হওয়ার রুদ্ররোষের কবলে পড়ে বিশাল মোটা আম গাছটা আমিনুদ্দির ঘর ভেঙে পড়ে। তার স্ত্রী গাছ চাপা পড়ে তাৎক্ষণিক মারা যায়। আমিনুদ্দির স্ত্রীর মতো অসংখ্য নারী দুর্যোগের প্রথম শিকার হয়। জলবায়ু পরিবর্তন বা ক্লাইমেট চেঞ্জ এখন খুবই পরিচিত দুটো শব্দ। বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের কর্মকান্ড এখন দুই শব্দকে ঘিরে।

জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম শিকারের তালিকার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কিছু না করেই সাজা পাওয়ার মতো অবস্থা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগের বিভিন্নতায়ও এখন পেয়েছে নতুন মাত্রা। আর এই বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের প্রথম অসহায় শিকারে পরিণত আমাদের প্রান্তিক নারী ও শিশুরা। বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা মোটামুটিভাবে একমত হয়েছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আগে যা আশঙ্কা করা হয়েছিল তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ হবে। সে ক্ষেত্রে বলা যায় নারী ও শিশুরা আরো বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ রয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ডায়রিয়া, অপুষ্টি, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বাড়ছে। আর এসব রোগের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে শিশুরা। বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। অর্ধেক জনগোষ্ঠী হলো নারী। গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখা যায় পুরুষরা বিভিন্ন ধরনের কাজে বাইরে যায় আর নারীরা ঘর গৃহস্থালির কাজ, বাচ্চা লালন-পালনসহ অন্যান্য হরেক রকমের কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তন কিভাবে নারীর জীবনে প্রভাব ফেলছে তার একটি চমৎকার উদাহরণ খুলনা সাতক্ষীরা অঞ্চল।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য বর্তমানে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের অনেক নারীকে লবণমুক্ত খাবার পানি সংগ্রহ করার জন্য প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে করে তার মূল্যবান শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, কায়িক শ্রম বেশি হচ্ছে, পানি কম খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লে পাশাপাশি শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতায় সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশুদ্ধ খাবার, পানীয় জল, নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে নারীদের পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি ভোগান্তির শিকার হতে হয়। দুর্যোগের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের নারীদের বিশুদ্ধ পানির অভাবে লবণাক্ত পানি পান করতে হয়। এতে করে নারীদের উচ্চ রক্তচাপে ভুগতে হয়।

এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের লবণাক্ত পানি পানের কারণে শিশুস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গ্রামাঞ্চলে এখনো কিছু কুসংস্কার টিকে আছে। নারীরা এখনো অনেক কুসংস্কার ও অন্ধ সামাজিক মূল্যবোধের শিকার। এ কারণে গ্রামের কিছু বিবেকহীন মানুষ দুর্যোগের মধ্যে নারীদের ঘরে রেখে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিতে রাজি থাকে, কিন্তু আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যায় না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের ভালোমতো বেঁচে থাকার দৈনন্দিন অনুষঙ্গগুলোর গুণগত মান খারাপ করে দেয়। ফলে নারী ও শিশু নানারকম স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মুখে পড়ে। বৈশ্বিক এই বিপর্যয়ের কারণে মানুষের সুপেয় পানির জোগান কমে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর আবাসও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। সুপেয় পানি, দূষণমুক্ত বাতাস, পুষ্টিকর খাবার ইত্যাদির মাত্রা ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। এতে করে নারী ও শিশুর ভোগান্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইদানীংকালে খুব বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা নয় তখনো বৃষ্টি হচ্ছে এ দেশে।

শীতকাল এখন খুবই সংক্ষিপ্ত এখানে। জলবায়ুর এই যে পরিবর্তন এই পরিবর্তনে অভিযোজন করতে গিয়ে বেশি দুর্যোগ পোহায় নারী ও শিশুরা। বাংলাদেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলার ৮৭টি উপজেলার মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল সরাসরি ভোগ করে। আবহাওয়ার এরকম বিরূপ অবস্থা নারী ও শিশুদের যতটা না ভোগান্তিতে ফেলে তার চেয়েও অনেকগুণ বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে। নদীভাঙন বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিও পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের অসহায় করে তোলে। ঘন ঘন সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় আবাদি ফসল নষ্ট হয়। সুপেয় পানির অভাব দেখা দেয়। এসব ঘটনা দুর্ভোগ বাড়ায় নারীদের। কারণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের খাবার তৈরি এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার দায়িত্ব পড়ে অসহায় নারীর কাঁধে।

এ সময় সংসারের প্রাত্যহিক কাজকর্মের বাইরেও আরো নানা ধরনের কাজে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয় নারীদের। দুর্যোগের পর অনেক নারী শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। তখন নারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন ত্রাণ সংগ্রহের কাজে। এরপর তারা কাজের খোঁজে শহরে ছোটেন। পুরাতন আবাসস্থল আর কাজ ছেড়ে অনেক নারী শহরে ভাসমান জীবনযুদ্ধে লিপ্ত হন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অপ্রতুল চিকিৎসাসেবার কারণেও দুর্ভোগ বাড়ে নারী ও শিশুদের। খড়ার সময় পানির অভাবে নারীরা নিজের স্বাস্থ্যগত দিকের ঠিকমতো যতœ নিতে পারেন না। বিশেষ করে রজঃচক্র চলার সময় তারা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পারেন না।

দুর্যোগের পর আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া নারীরা অনেক সময়ই আলাদা ব্যবস্থা না থাকার কারণে প্রস্রাব-পায়খানা করতে গিয়েও বৈষম্যের শিকার হন। লজ্জায় অনেকে  প্রস্রাব চেপে রাখেন। এ কারণে অনেক মূত্রনালীর প্রদাহে ভোগেন। তাদের কষ্ট বাড়তেই থাকে। জনসংখ্যার তুলনায় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে গাদাগাদি করে থাকতে গিয়েও নানা ধরনের বৈষম্য এবং হয়রানির শিকার হন নারীরা। মাঝে মাঝে যৌন হয়রানির মতো ভয়ঙ্কর ঘটনাও ঘটে থাকে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে। অধিকাংশ নারী লোকলজ্জার ভয়ে এসব চেপে যান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের পরিচালক ড. মোহাম্মদ আল-আমীনের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার মানুষ আর্থ-সামাজিক নানা সমস্যায় ভুগছে। নানা অপ্রতুলতায় সেসব এলাকার মানুষজন বিশেষ করে নারী ও শিশুরা পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে বা অভিযোজন ঘটাতে পারছে না তার মতে বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তুু’র সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। এতে করে আর্থ-সামাজিক নানা অসঙ্গতি দেখা দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। খাবারের অভাবে বেশি কষ্ট করে নারী ও শিশুরা। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দুর্বল মেধাসম্পন্ন হয়ে বেড়ে উঠবে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশের শিশুরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে এবং একই সঙ্গে শিশুশ্রম বাড়তেই থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে শিশু পাচার এবং বাল্যবিয়ের হার বেড়ে চলছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ অতীতে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। আর এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত যারা সেই নারী ও শিশুদের কথা মাথায় রেখে দুর্যোগ মোকাবেলার পরিকল্পনা সাজাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে নারী ও শিশুদের রক্ষা করতে হলে চাই সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ।