
ঢাকা : বাইশ বছর আগের এক সকাল। রমনা বটমূলে সবাই যখন একটি নতুন বর্ষকে বরণ করতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে বোমা। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে রমনা বটমূল। জীবন বাঁচাতে দিগবিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে মানুষ। নারকীয় এই বোমা হামলায় ১০ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন অনেকেই।
তবে ২২ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা মামলার। হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলার রায় নিম্ন আদালত থেকে ঘোষণা করা হলেও অপর মামলাটির তেমন অগ্রগতি নেই। ৯ বছর ধরে হাইকোর্টে ঝুলে থাকা হত্যা মামলাটির শুনানির তারিখ পিছিয়েছে ৩৭৫ বার।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলা দুটির বিচার প্রক্রিয়ার সব ধাপ শেষ হয়নি। হত্যা মামলায় আট বছর আগে ২০১৪ সালে ঢাকার বিচারিক আদালত আট জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন। পরে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় হাইকোর্টে। এখনো মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন ও আসামিদের করা আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এদিকে একই ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলার বিচারও এখনো শেষ করতে পারেনি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল।
এ ব্যাপারে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘দ্রুতই হত্যা মামলাটির আপিল শুনানি শুরু হবে।’
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালানো হয়। হামলায় ঘটনাস্থলেই ৯ জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে মারা যান একজন। এ ঘটনায় জঙ্গিগোষ্ঠী হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানসহ ১৪ জঙ্গিকে আসামি করা হয়। মামলার ১৩ বছরের মাথায় ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত মুফতি হান্নানসহ আটজনের মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, ১৪ আসামির মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পাঁচ আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন।
২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর শীর্ষ হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে সিআইডির পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. রুহুল আমিন হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মুফতি হান্নান, বিএনপি নেতা ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ আটজনের মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন বিচারক।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন- মাওলানা তাজউদ্দিন (পলাতক), মাওলানা আকবর হোসাইন, মুফতি আব্দুল হাই (পলাতক), হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর (পলাতক), মাওলানা আবু বকর, মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক) ও আরিফ হাসান সুমন। দণ্ডপ্রাপ্ত এ আট আসামিকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেন আদালত। এছাড়াও তাদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
এ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা সাব্বির, হাফেজ ইয়াহিয়া, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আব্দুর রউফ ও মাওলানা শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল। ৩০২/৩৪ ধারায় তাদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিস্ফোরক মামলার সবশেষ
বিস্ফোরক আইনের আলোচিত এ মামলাটি ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় ৮৪ জনের মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন ৫৪ জন। আগামী ১৬ মে আসামিদের পরীক্ষা করার দিন ধার্য করা হয়েছে।
বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন মামলার অন্যতম আসামি মুফতি হান্নানসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এ মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- মুফতি আব্দুল হান্নান, মাওলানা আকবর হোসাইন, মুফতি আব্দুল হাই, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর, মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা তাজউদ্দিন, আরিফ হাসান সুমন, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা সাব্বির, হাফেজ ইয়াহিয়া, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আব্দুর রউফ ও মাওলানা শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল।
এর মধ্যে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল রাতে মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ফলে বিস্ফোরক আইনের এ মামলা থেকে অব্যাহতি পান হরকাতুল জিহাদের এ শীর্ষ নেতা।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর আবু আবদুল্লাহ বলেন, ১৬ মে মামলাটির পরবর্তী তারিখ রয়েছে। ওইদিন আসামিদের আদালতে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে।
