
এম কে মনির : দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে সেবা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্য তালিকা জনসম্মুখে টাঙাতে হবে এমন নির্দেশনা আছে উচ্চ আদালত ও সরকারের। এরপরও চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলো এ নির্দেশ উপেক্ষা করছে। ফলে কোন প্রতিষ্ঠানে কোন পরীক্ষার কত দাম, তা সহজে জানতে পারছেন না রোগীরা। ইচ্ছেমতো যত টাকা বিল করা হচ্ছে সেবাগ্রহীতারা তত টাকাই পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সম্প্রতি নগরীর বেসরকারি এপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে মূল্য তালিকা জনসম্মুখে প্রদর্শন করা হয়নি। পুরো হাসপাতাল ঘুরে মূল্য তালিকা চোখে পড়েনি। অথচ হাসপাতালের অভ্যন্তরে ডাক্তারদের চেম্বার সিডিউল ও অন্যান্য বিষয়ের তথ্য প্রদর্শন করা হয়েছে বেশ ফলাও করে।
ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের তথ্য কেন্দ্রে দায়িত্বরত ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলে তিনি পরীক্ষার মূল্য তালিকা হাসপাতালে নেই বলে জানান। একই উত্তর দেন এই হাসপাতালের কর্মরত আরও কয়েকজন স্টাফ। তবে তারা জানান, রোগীরা যখন কোনো পরীক্ষার দাম জানতে চান তখন তারা জানিয়ে দেন। এজন্য কাউন্টারের শরণাপন্ন হতে হয় সেবাগ্রহীতাকে।
এসময় ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে সেবা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও রোগীর স্বজনের সাথে কথা হয়। তাদের একজন মো. সোলাইমান। তিনি বলেন, এখানে কোনো মূল্য তালিকা নেই। ফলে ডাক্তার দেখালেও আমরা কোন টেস্ট কত টাকা তা জানতে পারছি না। মূল্য তালিকা জনসম্মুখে টাঙানো থাকলে আমরা জানতে পারতাম, কোন পরীক্ষার দাম কত হতে পারে। সুস্পষ্ট ধারণা পেতাম।
রবিউল ইসলাম নামে আরেকজন রোগীর স্বজন বলেন, হাসপাতালগুলোতে সাধারণত ডাক্তারদের তালিকা টাঙানো হয় বড় করে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পরীক্ষার দামের তালিকা। যেটি আসল প্রয়োজন সেটিই নেই। কাউন্টারে গেলাম বেশ কিছু পরীক্ষার দাম জানতে। আমাকে একসঙ্গে সবগুলো পরীক্ষার দাম বলা হলো। এতে আমি আলাদাভাবে কোন টেস্টের দাম কত তা জানতে পারলাম না। কাউন্টারে যে সংখ্যক মানুষের ভিড় থাকে বেশি জানতে চাইলে তারা বিরক্তবোধ করেন।
দৃশ্যমান স্থানে মূল্য তালিকা না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন সেবাগ্রহীতা আব্দুর রহমান লিটন। সিটিস্ক্যান করতে আসা এ ব্যক্তি বলেন, ‘আমি জানি না, কোন পরীক্ষার দাম কত। সরকার নির্ধারিত মূল্য তালিকা থাকলে আমি জানতে পারতাম, আমার কাছ থেকে তুলনামূলক কম না বেশি নিচ্ছে। এ তালিকা না থাকাতে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ রয়ে গেছে।
জানতে চাইলে ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের হেড অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট কর্মকর্তা মানস মজুমদার একুশে পত্রিকাকে বলেন, উচ্চ আদালতে আদেশের বিষয়টি আমি অবগত আছি। কিন্তু সেটি আমাদের হাসপাতালে টাঙানো না হলেও টিভি স্ক্রিনে প্রদর্শন করা হয়। আলাদাভাবে টেস্টের চার্ট আমরা করিনি। যদিও এ প্রতিবেদক ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের টিভি স্ক্রিনে সেবার মূল্য তালিকা দেখতে পাননি।
তবে শুধু ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল নয়। একই চিত্র দেখা গেছে নগরীর গোলপাহাড়, কাতালগঞ্জস্থ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে।
কাতালগঞ্জের ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মূল্য তালিকা প্রকাশ্যে রাখা হয়নি। কাউন্টারে দায়িত্বরতদের কাছে জানতে চাইলে তারা মূল্য তালিকা প্রকাশ্যে রাখা হয়নি বলে স্বীকার করেন। ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাউন্টারে দায়িত্বরত একজন বলেন, টেস্টের দাম জানতে হলে আমাদের কাছে আসতে হয়। তখন আমরা বলে দিই।
এ বিষয়ে জানতে ইবনে সিনার মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তা আজহারুল ইসলাম ফয়সালকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
নগরীর জামালখানের ল্যাবওয়ান ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও মূল্য তালিকা টাঙানো হয়নি।
এদিকে, নগরীর ম্যাক্স ও শেভরন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে মূল্য তালিকা টাঙানো হয়েছে। তবে সেগুলো বেশ পুরোনো এবং লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে। হাসপাতালের খোলা জায়গায় ডাক্তারদের তালিকা দেয়া হলেও মূল্য তালিকা এমন জায়গায় রাখা হয়েছে, ফলে কারও চোখে পড়ছে না।
প্রবর্তক মোড়ে অবস্থিত বেসরকারি শেভরনে রাখা মূল্য তালিকা একটি পুরোনো টেবিলে দৃষ্টির অগোচরে একেবারে এককোণায় রেখে দেয়া হয়েছে। তাও আবার কয়েকটি ময়লা কাগজ দিয়ে ঢাকা। একইভাবে ম্যাক্স হাসপাতালের কাউন্টারের পাশের দেয়ালে ফটোকপির কাগজে খুবই ছোট অক্ষরে একটি পুরোনো মূল্য তালিকা টাঙানো হয়েছে। কিন্তু সেটির সামনে অন্য একটি যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। এতে করে সেই মূল্য তালিকাটিও তেমন চোখে পড়ছে না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন একুশে পত্রিকাকে বলেন, হাইকোর্ট শতশত আদেশ দেয় কিন্তু সেগুলো কেউ তোয়াক্কা করছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরও তদারকির অভাব আছে। তা না হলে তো তালিকা থাকত। এটি না টাঙানো মানে আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা। আর লোকচক্ষুর আড়ালে তালিকা রাখা মানে হচ্ছে গ্রাহকের সাথে প্রতারণা করার উদ্দেশ্য এ কৌশল। এটি সবার সামনে রাখলে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। অথচ সেটিকে আড়ালে রাখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মূল্য তালিকা না থাকলে একজন সেবাগ্রহীতা জানতেই পারেন না যে কোন টেস্টের কত টাকা। অনেক সময় চিকিৎসা পরিকল্পনায়ও ব্যাঘাত ঘটে। রোগীর যদি আর্থিক সমস্যা থাকে তিনি যদি সবচেয়ে এসেনশিয়াল টেস্টটা করাতে চায় তাহলে তো পারবে না। কারণ তিনি দাম জানতে পারছেন না। পরিশোধের পর প্রকৃত দাম কত তাও বুঝতে পারছেন না।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ডা. লিয়াকত হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, মূল্য তালিকা টাঙানোর ব্যাপারে সবাইকে বলা হয়েছে। কেউ যদি সেটি না করে আমাদের কিছু করার নেই। এটি লোকচক্ষুর আড়ালে কেন রাখবে? আমরা পরের মিটিংয়ে বিষয়টি সবাইকে বলে দেব।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. ইলিয়াছ হোসেন চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, মূল্য তালিকা খোলা জায়গায় টাঙানোর ব্যাপারে হাইকোর্ট ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশ আছে। যারা এ নির্দেশ মানছেন না আমরা দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। এটি অগোচরে রাখার বা না টাঙানোর কোনো সুযোগ নেই।
