দুয়ারে ঘূর্ণিঝড় ‘মোকা’, প্রস্তুতি নেই


ঢাকা : ‘মোকা’ আজ বুধবারই ঘূর্ণিঝড় রূপে আবির্ভূত হয়ে ক্রমেই শক্তি বাড়িয়ে ভয়ঙ্কর রূপ নেবে। ঘূর্ণিঝড়টির সম্ভাব্য গতিপথ বিশ্লেষণ করে আবহাওয়াবিদরা বলেছেন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাণ্ডব চালাবে ‘মোকা’। আজ থেকে ঠিক তিনদিন পর রবিবার সকাল থেকে সোমবার সকালের মধ্যে ২৪ ঘণ্টা ধরে মোকার তাণ্ডবরূপ দেখা যাবে। এতে জলোচ্ছ্বাসসহ বাতাসের গতি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দুয়ারে ভয়ঙ্কর এই ঘূর্ণিঝড়ের পদধ্বনি পাওয়া গেলেও সরকারের দুর্যোগ মন্ত্রণালয় এখনো এ বিষয়ে কোনো প্রস্তুতিমূলক সভা করেনি। সঙ্গত কারণেই উপদ্রুত অঞ্চলে কীভাবে ‘মোকা’ তাণ্ডব মোকাবিলা করা হবে তার গাইডলাইনও তৈরি হয়নি। সবমিলিয়ে উপকূলে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করেছেন আবহাওয়াবিদরা। তবে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ঘূর্ণিঝড়ের কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি।

অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন জানান, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ আন্দামান সাগর এলাকায় লঘূচাপ সৃষ্টি এবং এটি ঘণীভূত হওয়ার সম্ভাবনার আছে। লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ এবং এর কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান করছে।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে আজ বুধবার সামুদ্রিক ঝড়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার পূর্ণাঙ্গ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, ঘূর্ণিঝড়টি প্রাথমিকভাবে ১১ মে উত্তর ও উত্তর পশ্চিম দিকে অগ্রসর হবে। এরপর ধীরে ধীরে দিক পরিবর্তন করে উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন মডেলও নির্দেশ করছে, ঘূর্ণিঝড়টি ১২ মে উত্তর-পূর্ব দিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উপকূলের দিয়ে অগ্রসর হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

কখন ও কোথায় আঘাত হানতে পারে : বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বলছে, ঘূর্ণিঝড় মোকা আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উপকূলে ধেয়ে আসতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল বিশ্লেষণ করে কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় মোকা আগামী রবিবার সকাল ৬টার পর থেকে সোমবার সকাল ৬ টার মধ্যে অত্যন্ত তীব্র ঘূর্ণিঝড় হিসেবে ঘণ্টায় ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার বেগে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যের মংডু জেলার ওপর দিয়ে স্থলভাগে আঘাত করবে।

সম্ভাব্য এই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে উপকূলীয় এলাকাগুলো জলোচ্ছ¡াসে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা বিষয়ে মোস্তফা কামাল পলাশের পূর্বাভাস, উল্লেখিত গতিবেগে ঘূর্ণিঝড় মোকা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার উপকূলের ওপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় এই দুই জেলার উপকূলীয় এলাকাগুলো ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ৭ থেকে ১০ ফুট ও খুলনা বিভাগের উপকূলীয় জেলাগুলো ৫ থেকে ৮ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সম্ভব্য এই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে দেশের কোন কোন এলাকার মানুষের জীবন ও সম্পদ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকার কেন্দ্র কক্সবাজার জেলার সেন্টমার্টিন দ্বীপ, টেকনাফ, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলার ওপর দিয়ে অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টি টেকনাফ উপজেলায় অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোর ওপর দিয়ে অতিক্রম করার আশঙ্কা প্রবল।

তবে ঘূর্ণিঝড়টি স্থলভাগে আঘাতের স্থান নিয়ে এখনো ক্ষীণ অনিশ্চয়তা আছে। পলাশ জানান, ঘূর্ণিঝড়টি মিয়ানমার বা বরিশাল বিভাগের দিকে সামান্য পরিমাণ ঝুঁকে পড়তে পারে। অর্থাৎ, ঘূর্ণিঝড়টির চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার ওপর দিয়ে অতিক্রম করার কিছু সম্ভাবনা রয়েছে। আবার ঘূর্ণিঝড়টি কিছুটা ডান দিকে সরে গিয়ে কক্সবাজার ও মায়ানমারে রাখাই রাজ্যের মংডু জেলার ওপর দিয়ে স্থলভাগে আঘাত করার কিছু সম্ভাবনা রয়েছে।

মোকার সম্ভব্য শক্তি : দেশের উপকূলের স্থলভাবে আঘাতের সময় মোকার ঘণ্টায় বাতাসের গতি সম্ভব্য ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার থাকতে পারে। মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, মোকা তীব্র ঘূর্ণিঝড় হিসেবে ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার বেগে পূর্ব বঙ্গোপসাগর উপকূলে আঘাত করতে যাচ্ছে। এই বিষয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল থেকে প্রাপ্ত আবহাওয়া পূর্বাভাসের ওপর আমি পূর্ণ আস্থা রাখছি। এই ঘূর্ণিঝড়টি যে খুবই শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হবে সেই আশঙ্কার কথা আমি গত ২৬ এপ্রিল থেকে প্রচারিত প্রত্যেকটি আপডেটের মাধ্যমে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছি। উপকূলে আঘাত হানার সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ওঠার আশঙ্কা রয়েছে ১৩০ থেকে ১৭০ কিলোমিটার।

ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আইএমডি প্রধান মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র বলেছেন, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হতে যাওয়া ঝড়টি আগামী ১১মে পর্যন্ত উত্তর-উত্তর পশ্চিম দিকে কেন্দ্রীয় বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হতে পারে। এটি খুবই মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। ১১ মে বঙ্গোপসাগরে ঝড়টির বাতাসের গতি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার হতে পারে। এরপর ঝড়টির দিক পরিবর্তন হয়ে উত্তর-উত্তর পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার উপকূলের কাছে পৌঁছে যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছর মার্চ ও এপ্রিল মাসে মধ্য ও উত্তর বঙ্গোপাসগরে কোনো লঘুচাপ, নি¤œচাপ বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়নি। চলতি বছরে প্রথম এই ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। সেকারণে পুরো মৌসুমটায় সূর্য থেকে আগত রশ্মি পুরোটাই বঙ্গোপসাগরের পানি উত্তপ্ত করেছে, ফলে প্রচুর শক্তি সঞ্চিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরের পানিতে।

আমেরিকার নৌবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টার থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, এখন যেই স্থানে লঘুচাপটি অবস্থান করছে সেখানকার পানির তাপমাত্রা এখন ৩১ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। গত কয়েক বছর ধরে যে কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে এই ঘূর্ণিঝড়টি সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রার পানির মধ্যে। এখন বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রের পানির তাপমাত্রার যে মানচিত্র দেখা যাচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, যত উত্তর দিকে ঘূর্ণিঝড়টি অগ্রসর হবে, তত বেশি এটি উত্তপ্ত পানির সংস্পর্শে আসবে। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে আঘাত করার সময় এটি তীব্র ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এতে ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে।