বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০

ভারতকে বহুমাত্রিক ট্রানজিট ও বাংলাদেশের প্রাপ্তি-প্রত্যাশা

প্রকাশিতঃ ১০ মে ২০২৩ | ৯:৪৮ অপরাহ্ন


ফারুক আবদুল্লাহ : চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে নিজ দেশে পণ্য পরিবহনের বাণিজ্যিক অনুমতি পেয়েছে ভারত। গত ২৫ এপ্রিল এই বিষয়ে স্থায়ী ট্রানজিট আদেশ জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ আদেশ জারির মাধ্যমে ভারত এখন থেকে এই বন্দর দুটো ব্যবহার করে নিজ দেশে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। এর ফলে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ কমবে।

এতোদিন ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে পণ্য পরিবহন সময় ও খরচ বেশি লাগত। এ প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালে দুই দেশের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন দি ইউজ অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্ট ফর মুভমেন্ট অব গুডস টু অ্যান্ড ফ্রম ইন্ডিয়া’ চুক্তি হয়। এর আওতায় ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্যের পরিচালন পদ্ধতির মান (এসওপি) সই হয় ২০১৯ সালে। এরপর ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট বিধিমালা জারি হয় ২০২১ সালে। যার আলোকেই সবশেষ ২৪ এপ্রিল জারি হয়েছে স্থায়ী আদেশ।

এনবিআরের স্থায়ী আদেশে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে সম্পাদিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ইউজ অফ চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্ট ফর মুভমেন্ট অফ গুডস টু অ্যান্ড ফ্রম ইন্ডিয়া’-এর আওতায় উভয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট পণ্যের কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এ আদেশ জারি করা হয়েছে। ফলে ভারত এখন থেকে বন্দর দুটি ব্যবহার করে নিজ দেশে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। চট্টগ্রাম-আখাউড়া-আগরতলা, মোংলা-আখাউড়া-আগরতলা, তামাবিল-ডাউকি, শেওলা-সুতারকান্দি এবং বিবিরবাজার-শ্রীমন্তপুর রুটে ১৬টি ট্রানজিট রুট খোলা হয়েছে।”

আদেশে আরও বলা হয়েছে, ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য অপারেটরকে বাংলাদেশ কাস্টমস থেকে পাঁচ বছরের জন্য লাইসেন্স নিতে হবে। বাংলাদেশের আইনে নিষিদ্ধ কোনো পণ্য পরিবহন করা যাবে না। বাংলাদেশের বন্দরে সাত দিনের বেশি ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্য রাখা যাবে না। বন্দরে পণ্য পৌঁছার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা বাংলাদেশ কাস্টমসকে জানাতে হবে। বিল অফ এন্ট্রি, কমার্শিয়াল ইনভয়েস এবং প্যাকিং লিস্টসহ সম্পূর্ণ ডকুমেন্টেশন কাস্টমসের কাছে জমা দিতে হবে এবং ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে কাস্টমস ডিউটি পরিশোধ করতে হবে, চার্জ, ফি এবং চার্জের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। সমস্ত চালান পণ্য ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সিল করতে হবে।

প্রতি চালান ডকুমেন্ট প্রসেসিংয়ের জন্য ৩০ টাকা, ট্রান্স-শিপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রতিটন পণ্যের জন্য ২০ টাকা, টনপ্রতি সিকিউরিটি চার্জ ১০০ টাকা, প্রতি কন্টেইনার এসকর্ট চার্জ ৮৫ টাকা, টনপ্রতি অন্যান্য প্রশাসনিক চার্জ ১০০ টাকা এবং প্রতি কন্টেইনার স্ক্যানিং চার্জ বাবদ ২৫৪ টাকা পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া, ইলেকট্রিক লক এবং সিলের জন্যেও নিয়ম অনুযায়ী চার্জ প্রদান করতে হবে।

জানা গেছে, ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তির আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে সবশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে দুটি চালান আনা নেয়া করা হয়। ট্রানজিট পণ্য বোঝাই করতে বাংলাদেশী জাহাজ এমভি ট্রান্স সামুদেরা কলকাতার শ্যামপ্রসাদ মুখার্জি বন্দরে যায়। সেখান থেকে রডবাহী পণ্যের চালান নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। চালানটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস করে সড়কপথে শ্যাওলা (সিলেট)-সুতারকান্দি (ভারত) স্থলবন্দরের মাধ্যমে ভারতের আসামে নেয়া হয়। সর্বশেষ আরেকটি চালান ভারতের মেঘালয় থেকে ডাউকি (ভারত)-তামাবিল (বাংলাদেশ) স্থলবন্দর হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজে করে এ পণ্যবাহী চালান কলকাতায় যায়। এ দুটি চালানের মাধ্যমে পাঁচটি রুট বা পথে ট্রানজিট পণ্য আদান-প্রদান সম্পন্ন হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তিটির মৌলিক বিষয় হলো যে পণ্যগুলো আসবে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম বা বহুপদ্ধতির যানবাহনের প্রয়োজন রয়েছে। শুধু বন্দরে জাহাজ এসে ভিড়ল, এতটুকুতে হবে না। এরপর খালাস করে স্থলপথে নেয়ার বিষয় আছে। সেই স্থলপথে নেয়ার ক্ষেত্রে একটা বড় বিষয় থাকে, এখান থেকে যে পরিবহনগুলো যায়, সেগুলো যদি আবার খালি ফিরে আসে, সে ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লোকসানের শঙ্কা থেকে যায়। ফলে নতুন ব্যবস্থায় পূর্ণভাবে সুবিধা অর্জন করতে চাইলে অন্য যেসব পরিবহন ব্যবস্থা আছে, সেগুলোও সহজীকরণ করতে হবে।

ভারতকে দেয়া ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তির বিষয়টি সেভাবে দৃশ্যমান নয়৷ তবে এই ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পণ্য-পরিবহন তথা লজিস্টিক ব্যবসা সম্প্রসারণের একটা সুযোগও তৈরি হয়েছে৷ কারণ, ট্রান্সশিপমেন্টের ট্রাক বা যানবাহন বাংলাদেশের৷ তাছাড়া ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্ট দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থার খানিক উন্নতি হয়েছে যা আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পথের বাধা অনেকটা কমিয়েছে৷ তবে আঞ্চলিক সম্পৃকক্তাকে অর্থবহ করার জন্য ভারতের দিক থেকে আরো ইতিবাচক ও সক্রিয় উদ্যোগ প্রয়োজন৷

লেখক : সাংবাদিক।