বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

দেনায় ডুবে থাকা ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ভবিষ্যৎ কী?

প্রকাশিতঃ ১৯ মে ২০২৩ | ৯:১৯ অপরাহ্ন


কাউছার আলম, পটিয়া (চট্টগ্রাম): চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে পটিয়ার কোলাগাঁও এলাকায় ৪০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছিল জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির ভেতর পরিচালকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, উচ্চ সুদে স্বল্পমেয়াদী ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পে বিনিয়োগের ফলে দ্রুত লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড।

ওয়েস্টার্ন মেরিন যখন ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের ভারে বিপর্যস্ত, ঠিক এমন অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানসহ পরিচালকদের বিরুদ্ধে ৯৩৯ কোটি টাকা ঋণ খেলাপির মামলা দায়ের করেছে ন্যাশনাল ব্যাংক। গত ৩ মে ন্যাশনাল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার সুজা উদ্দিন আল মামুন চট্টগ্রামের অর্থ ঋণ আদালতে মামলাটি দায়ের করেছেন বলে একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন আদালতের পেশকার রেজাউল করিম। এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা!’

মামলার আসামিরা হলেন- ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান, পরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেন, আবু মো. ফজলে রশীদ, মনজুর মোরশেদ চৌধুরী, সাঈদুল ইসলাম, এ কে এম রেজাউর রহমান, আরিফুর রহমান খান, শাহ আলম, মোহাম্মদ আবদুল মোবিন ও ক্যাপ্টেন এবিএম ফজলে রাব্বি।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ ন্যাশনাল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখায় ৪০২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণের জন্য আবেদন করে। এ প্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৩ মার্চ প্রতিষ্ঠানটিকে টার্ম লোন খাতে ১৫০ কোটি টাকা, লোন (জি) খাতে ৫০ কোটি টাকা এবং ক্যাশ ক্রেডিট (হাইপো) খাতে ৬০ কোটি টাকাসহ মোট ২৬০ কোটি ঋণ সুবিধা মঞ্জুর করা হয়। ঋণ মঞ্জুর হওয়ার দিন ওয়েস্টার্ন মেরিন কর্তৃপক্ষ ক্যাশ ক্রেডিট খাতের ঋণ ৬০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১০ কোটি, নতুন করে ব্যাংক গ্যারান্টি খাতে ৭৫ কোটি, এলসি খাতে ৪৫ কোটিসহ মোট ১৫০ কোটি টাকা ঋণ সুবিধার জন্য ব্যাংকে আবেদন করেন।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ১৯ মে এলসি খাতে ৪৫ কোটি, ব্যাংক গ্যারান্টি খাতে ৭৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা মঞ্জুর করে এবং ক্যাশ ক্রেডিট (হাইপো) খাতের ঋণ ৬০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০৫ কোটি বাড়িয়ে মোট ১৬৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ঋণ সুবিধা মঞ্জুর করে। ঋণ সুবিধা চলাকালে বিবাদীরা নতুনভাবে টার্ম লোন খাতে ৫০ কোটি টাকা ও আগের মঞ্জুরীকৃত টার্ম লোন ১৫০ কোটি টাকা এবং আগের মঞ্জুরীকৃত লোন (জি) ৫০ কোটি টাকার সুদের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৪ শতাংশ করার আবেদন করলে ব্যাংক ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি টার্ম লোন ২৫ কোটি মঞ্জুর ও সুদের হার ১ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এজন্য মর্টগেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির জমি জমা দেয়া হয়।

এভাবে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫২৮ কোটি ৬৮ লাখ ৬৮ লাখ ৭৬ হাজার ৬৫০ টাকা। এর সঙ্গে ৪০৯ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৭৪৪ টাকা সুদ, ২৪ লাখ ৫৯০ টাকা অন্যান্য চার্জসহ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট পাওনা ৯৩৮ কোটি ৭২ লাখ ৯৩ হাজার ৯৮৫ টাকা। এর মধ্যে ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে ঋণ কয়েক দফায় পুনঃতফসিল করলেও ব্যাংকের দায় পরিশোধ করেনি ওয়েস্টার্ন মেরিন।

ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, করোনা মহামারীর সময় বিআরপিডি সার্কুলার ১৩, ১৯, ৫১, ৫৩, ৩ অনুসারে ঋণের টাকা পরিশোধের সময় বাড়ানো হলেও ওয়েস্টার্ন মেরিন কর্তৃপক্ষ ঋণ পরিশোধ না করায় ঋণখেলাপী হিসেবে গণ্য হয়। এজন্য ২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর ঋণ পরিশোধে লিগ্যাল নোটিশ দিলেও কোনো টাকা পরিশোধ করেনি। এজন্য অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩ এর ১২(৩) ধারায় চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও কেউই নিলামে অংশ নেয়নি। এ কারণে বাধ্য হয়ে অনাদায়ী ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। মামলার বিষয়টি ন্যাশনাল ব্যাংক চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখার সিনিয়র অফিসার মোহাম্মদ মোনায়েম একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, দেশের প্রথম সারির রফতানিমুখী জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ২০০০ সালে যাত্রার পর প্রায় দেড় দশক ধরে বিভিন্ন ক্যাটাগরির জাহাজ নির্মাণ ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জাহাজ রফতানির মাধ্যমে নিজেদের এ খাতের বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও উদার হস্তে ঋণ দিয়েছে কোম্পানিটিকে। পুঁজিবাজার থেকেও ২০১৪ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ারপ্রতি ২৫ টাকা প্রিমিয়ামে ১৫৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। তবে অনিয়ম, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অদূরদর্শী পরিকল্পনায় দেশের অন্তত ১০ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ওয়েস্টার্ন মেরিনের খেলাপী ঋণের পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে শিপইয়ার্ডটিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২টি ল্যান্ডিং ক্রাপ, এভারগ্রিন শিপিং লিমিটেডের জন্য ৮টি কার্গো ভ্যাসেল, বিআইডাব্লিউটিসির জন্য ২টি প্যাসেঞ্জার ভ্যাসেল ও জে কে গ্রুপের ১টি ফিশিং বোড নির্মাণ কাজ চলছে ওয়েস্ট্রার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডে।

অপরদিকে, চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি সংসদে দেওয়া খেলাপির তালিকা অনুযায়ী ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। এটি গড়ে তুলেছিলেন ৭ জন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারেও তালিকাভুক্ত ছিল। তবে আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে এখন প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের ঋণ খেলাপির তালিকায়।

এদিকে, গত ২২ বছরে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড দেশে ও বিদেশে ১৫০টি জাহাজ সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে ১২টি দেশে ৩৩টি জাহাজ রফতানির মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও এনেছে বাংলাদেশে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে পটিয়া উপজেলার কোলাগাঁও ইউনিয়ন এলাকায় অবস্থিত শিপইয়ার্ডে দিন-রাত তিন হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমানে কাজ করছেন ২শ’ থেকে আড়াইশ শ্রমিক।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ওয়েস্টার্ন মেরিনের ১ হাজার ৭৮৭ কোটি ১৪ লাখ ৩২ হাজার ২২৫ টাকা অনাদায়ী রয়েছে। বর্তমানে এই দেনার পরিমাণ বেড়ে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এছাড়া ব্যক্তিগত অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণসহ দায় দুই হাজার কোটি ছাড়িয়েছে। খেলাপী থাকা এসব ঋণের কারণে কোনো ব্যাংকই নতুন করে এই প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন না করায় কার্যত বন্ধের পথে রফতানি জাহাজ তৈরির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের নতুন খাত হিসাবে আশা জাগানিয়া দেশের অন্যতম শীর্ষ জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড।

প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট, দূরবস্থার জন্য কর্ণধাররা বাংলাদেশের প্রচলিত ঋণের সুদের হারকে দায়ী করলেও খাত সংশ্লিষ্টরা প্রতিষ্ঠানটির অদূরদর্শীতা ও উদ্যোক্তাদের পারস্পরিক দ্বন্ধই মূল কারণ বলে মনে করেন। ২০০০ সালে যাত্রা শুরু হলেও ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতিটি জাহাজ নির্মাণ ও বিদেশী ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর অনুষ্ঠান করা হয়েছিল জমকালোভাবে। মূলত জাহাজের বৈশ্বিক বাজার বিপুল চাহিদা থাকলেও ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড সর্বোচ্চ ৫ হাজার টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ নির্মাণ ও রফতানি করেছে। যদিও ফলাও করে বিষয়টিকে অতিমাত্রায় প্রচোরণা চালিয়েছে। এই খাত থেকে বাংলাদেশ জাহাজ রফতানির মাধ্যমে গার্মেন্টস ও প্রবাসী আয়ের পর সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছে ওয়েস্টার্ন মেরিন। যদিও শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়িক পরিধি ও বিনিয়োগ অনুযায়ী আশানুরূপ কার্যাদেশ না পাওয়া, যথাসময়ে অর্ডার হওয়া জাহাজ সরবরাহ করতে না পারা এবং পরিচালকদের মধ্যে দ্বন্ধ ধীরে ধীরে নিম্নমুখী করে ওয়েস্টার্ন মেরিনের ব্যবসা।

এদিকে নিজেদের ব্যবসাকে ধরে রাখা ও ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় হতাশ হয়ে ২০১৭ সাল থেকে রাইট শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন বাড়ানোর কৌশলে হাঁটে ২০১৪ সাথে পূঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। ২০১৭ সালের নভেম্বরে রাইট আবদেনে বিশেষ ধরনের জাহাজ নির্মাণে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ১.২৫ আর:১ অনুপাতে (বিদ্যমান একটি শেয়ারের বিপরীতে ১ দশমিক ২৫টি শেয়ার) রাইট শেয়ার ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানিটির পর্ষদ। এক্ষেত্রে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সঙ্গে শেয়ার প্রতি ১০ টাকা প্রিমিয়াম নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব সংশোধন করে ১আর:১ অনুপাতে (বিদ্যমান একটি শেয়ারের বিপরীতে একটি রাইট শেয়ার) ৫ টাকা প্রিমিয়ামে রাইট শেয়ার ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেয় ওয়েস্টার্ন মেরিন।

অবশ্য আবেদন সংশোধনের মাত্র দুইদিন পর কোম্পানিটি সংশোধনীর মাধ্যমে জানান যে, তাদের পর্ষদ রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাবে আংশিক পরিবর্তন আনে। পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত অনুসারে ১আর:২ অনুপাতে (বিদ্যমান দুইটি শেয়ারের বিপরীতে একটি রাইট শেয়ার) ৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ শেয়ার প্রতি ১৫ টাকায় রাইট শেয়ার ইস্যু করার কথা জানানো হয়। সর্বশেষ গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আরেক দফায় রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাবে পরিবর্তন আনে কোম্পানিটি। সর্বশেষ প্রস্তাবে কোন ধরনের প্রিমিয়াম ছাড়াই ১০ টাকা অভিহিতমূল্যে ১আর:২ অনুপাতে ৯ কোটি ৯৭ লাখ ৬৮ হাজার ৩০১টি সাধারণ শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৯৯ কোটি ৭৬ লাখ ৮৩ হাজার ১০ টাকা সংগ্রহের ঘোষণা দেয়া হয়।

২০১৪ সালের আগস্টে ৪ কোটি ৫০ লাখ শেয়ার ১০ টাকা অবিহিত মূল্যের সাথে ২৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ অর্থাৎ ৩৫ টাকা প্রতিটি শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে ইস্যু করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ওয়েস্টার্ন মেরিন। তালিকাভুক্তির প্রথম কয়েকবছর নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদান করলেও পরবর্তীতে ২০১৭ সালেই প্রিমিয়ামসহ রাইট শেয়ার ইস্যুর আবেদন করে কোম্পানিটি। রাইট ইস্যু সংক্রান্ত বিভিন্ন ডিফিসিয়েন্সির বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে কোয়ারি করা হলেও কোম্পানিটি সেগুলোর জবাব না দিয়ে বার বার সময় বাড়ানোর আবেদন করলে সেটি বাতিল করা হয়। মূলত অর্থ সংকটে থাকা ওয়েস্টার্ন মেরিন ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে দ্বিতীয় দফায় রাইট শেয়ারের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের দ্বারস্থ হয়েছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ওয়েস্টার্ন মেরিনের কাছে বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৭২১ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়া ৪২৬ কোটি, সোনালী ব্যাংক ১১৭ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১১১ কোটি, এনসিসি ব্যাংকের ৪০ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ৭২ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংকের ৫৮ কোটি টাকা, মাইডাস ফিন্যান্স ৪৫ কোটি, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল ৩৬ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার লিজিং এন্ড ফাইন্যান্স ৩২ কোটি টাকা, রিলাইন্স ফাইন্যান্স ২২ কোটি টাকা, ফারইস্ট ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট ১৭ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স ১৩ কোটি টাকা, উত্তরা ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট ১১ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক সাড়ে ৫ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক ৫ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক সাড়ে ৩ কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট দুই কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

ব্যাংক ছাড়াও ওয়েস্টার্ন মেরিনের কাছে খাত সংশ্লিষ্ট ১৫ থেকে ২০ ব্যবসায়ীর অন্তত ৫০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এরমধ্যে আটলান্টিক মেরিনের কর্ণধার নাছির উদ্দিন ৮০ লাখ টাকা, দেশ শিপ বিল্ডিংয়ের কর্ণধার মো সরওয়ার আড়াই কোটি টাকাসহ আরো কয়েকজন ব্যবসায়ী ওয়েস্টার্ন মেরিনের বিরম্নদ্ধে ৮-১০ টি চেক ডিজঅনার মামলা দায়ের করেছে।

দুই দশক ধরে ভালো ব্যবসা করলেও বর্তমান আর্থিক দূরাবস্থার বিষয়ে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের নির্বাহী পরিচালক ক্যাপটেন তারেক মো. নসরুল্লাহ একুশে পত্রিকাকে বলেন, জাহাজ নির্মাণ শিল্প বাংলাদেশে নতুন। ওয়েস্টার্ন মেরিনের যাত্রা শুরুর পর দেশি-বিদেশি ১৫০টির অধিক জাহাজ নির্মাণ হয়েছে ও ৩৩টি জাহাজ ১২টি দেশে রফতানি করা হয়েছে। বৈশ্বিক সংকট ও করোনাকালীন সময়ে অর্থনৈতিক সংকটে ওয়েস্টার্ন মেরিনও চলতি মূলধন সংকটে ছিল। আমরা ইতোমধ্যে সরকারের কাছে প্রণোদনা ঋণের জন্য আবেদন করেছি। জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বিশেষ নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে খাতটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে বলে জানান তিনি।

ওয়েস্টার্ন মেরিন কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, ইতোমধ্যে সরকার শিপ বিল্ডিং খাতের উন্নয়নে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। ‘বাংলাদেশ শিপ বিল্ডিং ইন্ড্রাস্ট্রিজ ডেভলপমেন্ট পলিসি’ নামে এই নীতিমালা এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। মূলত শিপ বিল্ডিং খাত ভারী শিল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হওয়ায় দেশের অপরাপর খাতের মতো ঋণ প্রদান ও আদায় এই খাতে সম্ভব নয়। তাছাড়া কার্যক্রম শুরুর পর দেশি বিদেশি বেশ কিছু সার্টিফিকেট অর্জনের পর বিদেশি কার্যাদেশ আসতে শুরু করে। যার কারণে নতুন নীতিমালাটি বাস্তবায়নের পর স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে জাহাজ নির্মাণ শিল্প নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় ৪০ একর জমির উপর শিপইয়ার্ড নির্মাণ করলেও তাদের নিজস্ব জমি রয়েছে ২৮ একর। বাকি ১২ একর জমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৩০ বছর মেয়াদী লিজ নেওয়া। কয়েকবছর ধরে ইজারার ভাড়া বকেয়া থাকায় স্থানীয় ছাবের আহমেদ নামে এক ইজারাদাতা ওয়েস্টার্ন মেরিনের জায়গায় সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছেন। এছাড়া আরও একজন ইজারাদাতা ওয়েস্টার্ন মেরিনকে শিপইয়ার্ডের জন্য ইজারা নেওয়া জমি ছেড়ে দিতে নোটিশও দিয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানটির শুরুতেই ভালো ব্যবসা করায় প্রতিষ্ঠানটিকে সহজে ঋণ দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। কিন্তু সম্প্রতি পরিচালকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আশানুরূপ কার্যাদেশ না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যবসা নিয়ে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি এখন ঋণ শোধ করতে পারছে না।

জানা গেছে, ওয়েস্টার্ন মেরিনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনো বকেয়া বেতন ভাতা পাবেন। সম্প্রতি শ্রমিকদের পাওনা কিছুটা পরিশোধ করা হলেও এখনো বেতন-ভাতা অনেক বকেয়া রয়েছে। অর্থ সংকটের কারণে বিদ্যমান জাহাজগুলো নির্মাণ করে সরবরাহ করাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ দিতে না পারায় সম্প্রতি দুবাইয়ের আল রশিদ শিপিং লিমিটেড ওয়েস্টার্ন মেরিনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এতে ওয়েস্টার্ন মেরিনের আন্তর্জাতিক সুনামও ক্ষুন্ন হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার (ফিন্যান্স) আবুল মনসুর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড একটি আন্তর্জাতিক মানের শিপইয়ার্ড। শুরু থেকেই ভারত আমাদের কাছ থেকে ৪টি জাহাজ বানিয়ে তাদের দেশে নিয়ে গেছে। এ শিপইয়ার্ডটি বাস্তবায়ন করতে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা ব্যাংক লোন নিতে হয়েছে। এরপর আমরা ধারাবাহিকভাবে যে সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে লোন নিয়েছি তাদেরকে সে টাকা সময়মতো পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই লোন কমছে না। বছরের পর বছর বাড়ছেই। যা এখন ২ হাজার কোটি টাকার উপরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ২০১০-২০১১ সালের দিকে আমাদের ইউরোপিয়ান অর্ডার আসে। তাদের কাজগুলো শেষ করতে করতেই সারা পৃথিবীতেই শিপ বিল্ডিংয়ের উপর ধস নেমে আসে। তখন নতুন করে আর কোনো জাহাজের অর্ডার হয়নি। লোকাল অর্ডারগুলো নিয়ে কোনোভাবেই চলছিল ওয়েস্টার্ন মেরিন।

আবুল মনসুর বলেন, এ খাতকে বাচিয়ে রাখতে খাতের সংশ্লিষ্ট সকলকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকগুলোকে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে বছরের পর বছর ব্যাংক লোনের বোঝা বাড়বে।