চট্টগ্রামে ‘ইটিপিবিহীন’ ৯৬ হাসপাতাল ছড়াচ্ছে রোগ

আবছার রাফি : চট্টগ্রামে মহানগরে সরকারি-বেসরকারি ৯৯টি হাসপাতাল-ক্লিনিকের মধ্যে ৯৬টিরই নেই নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। হাসপাতালে তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), ডব্লিউটিপি (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), এসটিপি (স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এসব হাসপাতালে তা নেই। ফলে পরিবেশ ছাড়পত্র পাচ্ছে না হাসপাতালগুলো। এর মধ্যে নগরীর সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও রয়েছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় হাসপাতালগুলো তরল বর্জ্য ফেলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। রোগমুক্তির প্রতিষ্ঠান হয়ে উল্টো ছড়িয়ে দিচ্ছে রোগ। ইটিপি ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা থাকলেও কেন তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না এবং হাসপাতালে উৎপাদিত তরল বর্জ্য কীভাবে পরিশোধন করা হচ্ছে তা জানতে চেষ্টা করে একুশে পত্রিকা।

চারজন বর্জ্যকর্মী কাজ করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বর্জ্য মজুদকরণ কক্ষে। তারা প্রতিদিন বিভিন্ন ওয়ার্ডের আয়া ও পরিচ্ছন্নকর্মীদের কাছ থেকে কঠিন ও তরল বর্জ্য সংগ্রহ করে কনটেইনারে ভরেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, কাগজ, টিস্যু, প্যাকেট, প্যাথলজিক্যাল নমুনা, ব্যবহৃত রক্তমাখা গজ, ব্যান্ডেজ, মোজা, ন্যাকড়া, রক্ত, দেহরস, সিরামসহ সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন বর্জ্য কনটেইনারে বোঝাই করছেন বর্জ্যকর্মীরা। এ কাজে তারা কোনোরকম সুরক্ষাসামগ্রী যেমন পিপিই, হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক, স্যানিটাইজার, হেলমেট, জুতা ব্যবহার করছেন না।

সুরক্ষাসামগ্রী নেই কেন জানতে চাইলে বর্জ্যকর্মী রুবেল বলেন, ‘আমাদের এসব লাগে না। পরলে আরও গরম লাগে। করোনার সময়ও পরিনি। আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে।’

চিকিৎসাবর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা ২০০৮-এ বলা হয়েছে, চিকিৎসাবর্জ্যের সাথে অন্যান্য বর্জ্য মেশানো যাবে না। বর্জ্যকর্মীদের নিরপত্তামূলক পোশাক ও অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী দিতে হবে। চিকিৎসাবর্জ্য আবার ব্যবহার রোধে রাবার বা প্লাস্টিক নল ও বিভিন্ন ব্যাগ টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলতে হবে।

সরেজমিন দেখা গেছে, চমেক হাসপাতালের বর্জ্য মজুদকরণ কক্ষের বাইরে একপাশে কিছু বর্জ্য আলাদাভাবে ফেলে রাখা হয়েছে। সেখানে প্লাস্টিক, পলিথিন ব্যাগ, পানির বোতল, কাগজপত্র, স্যালাইন ব্যাগ, ওষুধের প্যাকেটসহ নানারকম বর্জ্য রয়েছে। আবার অন্যপাশে আরও কয়েকটি বস্তা ভর্তি ওষুধের শিশি-বোতল আলাদাভাবে রাখতে দেখা যায়।

এসব এখানে কেন আলাদাভাবে রাখা হয়েছে, জানতে চাইলে বর্জ্যকর্মী রুবেল বলেন, ‘এগুলো আমরা আলাদা করে রেখেছি। এসব বাইরে বিক্রি করে কিছু টাকা পাই। দৈনিক ৪-৫শ’ টাকা করে পাই, বেশি না।’

এ সময় বর্জ্যকর্মী সবুজ জানান, তিনি এখানে ২০০১ সাল থেকে বর্জ্যকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিদিন তার হাতে ২০-৩০টা সুঁই ঢুকে যায়। সবুজ বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে বর্জ্যের ড্রামে করে সুইও আসে। সুই না আসলে আমাদের জন্য ভালো হতো। আমার মা ছোটবেলায় এখানে এসেছে। আজ অবধি এখানে কাজ করছে। তিনিও সুঁইয়ের কম গুতা খাননি।’

চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন ২০১৫-১৬ অনুযায়ী, পুনঃব্যবহার রোধ করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত সুঁই ব্যবহারের পরপরই কেটে বা গলিয়ে দিতে হয়। ‘নিডল ডেস্ট্রয়ারে’ এসব ধ্বংস করে দিতে হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চমেক হাসপাতালে কোনো নিডল ডেস্ট্রয়ার নেই।

বর্জ্যকর্মী সবুজ আরও বলেন, ‘আমরা কনটেইনারে সব বর্জ্য লোড করে দিই। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬-৭টায় গাড়ি এসে তিন শতাধিক ড্রামে তরল ময়লা নিয়ে যায়। আর শুকনো ময়লা নিয়ে যায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) গাড়ি। চসিকের গাড়ি প্রতিদিন ৮ ড্রাম ময়লা নিয়ে যায়। ময়লাগুলো তারা আরেফিননগর পাহাড়ে ফেলে দেয়।’

সবুজের কথার সূত্র ধরে সরেজমিন নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার আরেফিননগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড ঘেঁষে সমতল থেকে ২শ’ থেকে ৩শ’ ফুট উচ্চতার কয়েকটি বর্জ্যরে পাহাড়। এখানে সিটি করপোরেশনের গাড়ি থেকে নগরের সমস্ত ময়লা ফেলা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বর্জ্যরে পাহাড়ে আগুন জ্বলছে। আর একটিতে দফায় দফায় ফেলা হচ্ছে নগরের সমস্ত ময়লা। এখানেই নগরীর অন্যান্য গৃহস্থালী বর্জ্যরে সাথে ফেলে দেওয়া হচ্ছে মেডিকেল বর্জ্য।

প্রতিটি গাড়ি থেকে বর্জ্য ফেলামাত্র ময়লা ঘাটতে দৌঁড়ে আসছে কিছু মানুষ। এদের মধ্যে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত আছেন। ৬০ থেকে ৮০ জন বর্জ্য থেকে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বস্তু সংগ্রহ করছেন। এদের কারও কাছে নেই সুরক্ষাসামগ্রী। সাথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে একদল গরু ও হাঁস মুরগি। ময়লার স্তুপে উড়ছে শতাধিক পাখি। তারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খাচ্ছে পঁচা খাবার।

এ সময় কথা হয় বর্জ্য থেকে প্লাস্টিকসহ অন্যান্য জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে আসা নাজমা বেগমের সাথে। তিনি বলেন, ‘এখান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে প্রতিদিন ৩-৪শ’ টাকা আয় করি। পরিবারের উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় আমাকে এই কাজ করে চলতে হয়। আগে মেডিকেলের ময়লার মধ্যে বিক্রির মতো অনেক জিনিস (কঠিন বর্জ্য) থাকতো, এখন কম। তরলবর্জ্যই বেশি। রোগীর রক্ত, ব্যান্ডেজ, প্যাথলজিকাল নমুনা; এসব বেশি থাকে। আর এখন অনেক কিছুই (কঠিন বর্জ্য) মেডিকেলের কর্মীরা হাসপাতালেই বিক্রি করে দেয়।’

এখানে কয়েকজন লোককে দেখা যায় কুড়িয়ে সংগ্রহ করা এসব বর্জ্য পণ্যের বস্তা জমা নিচ্ছেন। পরিচয় জানতে চাইলে তারা জানান, তারা সবাই বর্জ্য ব্যবসায়ী।

ইউনুছ নামের এক বর্জ্য ব্যবসায়ী বলেন, ‘মাসে ৫ কেজির মতো মেডিক্যালের শুকনো বর্জ্য পাওয়া যায়। আগে বেশি পাওয়া যেত। আমরা এখান থেকে কিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার ফ্যাক্টরিতে বিক্রি করে দিই। আবার অনেক ব্যবসায়ী এখানে এসেও কিনে নিয়ে যায়।’

এ সময় বর্জ্য সংগ্রহ করতে আসা ইয়াসিন নামের একজন জানান, শুধু এই কয়েকটা পাহাড়েই নয়, নগরের হালিশহরের আনন্দবাজারে টিজি কলোনির পাহাড়েও ফেলা হয় মেডিকেল বর্জ্যসহ অন্যান্য ময়লা।

সরেজমিন হালিশহরের টিজি কলোনি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও বেশ বড় বড় কয়েকটি বর্জ্যের পাহাড়। চতুর্দিকে উৎকট গন্ধ। সেখানেও একদল নিম্নআয়ের মানুষ বর্জ্য ঘাঁটছেন।

এ সময় কথা হয় বর্জ্য থেকে প্লাস্টিকসহ অন্যান্য জিনিসপত্র সংগ্রহ করা আনন্দবাজারের বাসিন্দা আমিরের সাথে। তিনি একটু আগে গাড়ি থেকে ফেলে যাওয়া ময়লা সংগ্রহ করে ধরণ অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যাগে ঢোকানোর কাজ করছেন। তাতে দেখা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধসহ ওষুধের শিশি ও বোতল, স্যালাইনের ব্যাগ ও সিরিঞ্জ।

জানতে চাইলে আমির বলেন, ‘প্রতি কেজি সিরিঞ্জ ৬০ টাকা ও প্রতি কেজি প্লাস্টিকের ওষুধের বোতল ২০ টাকা বিক্রি হয়। আমি প্রতিদিন ২০-২৩ কেজি জিনিসপত্র পাই। তা বিক্রি করে ৪-৫শ’ টাকা হয়।’

আমির আরও বলেন, ‘সপ্তাহে ১-২ বার মেডিক্যালের গাড়ি আসার সাথে সাথে এখানে দুই তিনজন আসে। তারা এগুলো খুঁজে নিয়ে যায়।’ তারা এসব কী করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা বিক্রি করে পেট চালায়।’

শুধু চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালই নয়, নগরীর সরকারি-বেসরকারি প্রায় সকল হাসপাতালের তরল ও কঠিন বর্জ্য প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব বর্জ্য রোদে শুকাচ্ছে, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে, মিশে যাচ্ছে পানিতে।

পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ এবং ২০২৩ অনুযায়ী হাসপাতাল ‘লাল’ শ্রেণিভুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং এ কারণে এতে পরিবেশগত প্রভাব যাচাইসহ নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) থাকা বাধ্যতামূলক। এটি স্থাপন না করলে পরিবেশ ছাড়পত্র না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। লাল শ্রেণিভুক্ত প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বলা হয়েছে, এগুলো পরিবেশ বা মানবস্বাস্থ্যের ওপর তীব্র প্রভাব ফেলে।

আবার চিকিৎসা বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী, ক্ষতিকারক চিকিৎসা বর্জ্য অসংক্রমিত অবস্থায় অপসারণ করার কথা বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে ইটিপি নেই। সিটি করপোরেশনকে বর্জ্য দেওয়া হয়, তারা হালিশহরে নিয়ে যায়। আর তরল বর্জ্য “সেবা সংস্থা” নামে একটি কোম্পানিকে দেওয়া হয়। সব মেডিকেল বর্জ্য ডিসপোজাল করে এই সেবা সংস্থা। আমাদের হাসপাতালে সব মিলিয়ে প্রতিদিন আনুমানিক ৫-৭ টন বর্জ্য তৈরি হয়।’

পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘৫-৭ বছর আগে পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হয়েছে। সেটা আমরা এখনও পাইনি।’

হালিশহরের আনন্দবাজারে যে ইনসিরেটর প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে তা কেবল হাসপাতালের কঠিন বর্জ্য পোড়ানোর জন্য, তরল বর্জ্যের জন্য নয়। আইন অনুযায়ী, তরল বর্জ্যকে ইটিপির মাধ্যমে পরিশোধন করে তারপর ফেলতে হবে।

এসব বিষয় জানানোর পর চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান বলেন, ‘সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো নিয়ে একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে সরকার। সেটা হচ্ছে, ওয়েস্ট ডিসপোজাল প্ল্যান্ট বসানো হবে। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যত স্থাপনা হচ্ছে, সেখানে প্ল্যান অনুযায়ী সব করা হচ্ছে।’

চমেক হাসপাতালের বর্জ্যকর্মীদের কোনো সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়া বর্জ্য অপসারণের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পরিচালক বলেন, ‘বর্জ্য ওয়ার্ড থেকে মজুদকরণ কক্ষে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমদের নির্দিষ্ট লোকজন আছে। এদের সুপারভিশন করার জন্য লোকজন আছে। আমরা সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করেছি। কিন্তু লোকজন এগুলো পরে না। এগুলো পরার প্রতি তাদের একটা অনাগ্রহ আছে। কিন্তু আমরা সুপারভাইজারদেরকে নিয়মিত নির্দেশনা দিচ্ছি, যাতে এগুলো ঠিকমতো লক্ষ্য রাখে। এসব আমাদের নজরদারিতে আছে। আর বর্জ্য বিক্রির বিষয়টা বন্ধ করার চেষ্টা করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালের জন্য যে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি), এটা আসলে বিশাল ব্যাপার। এটা হাসপাতাল তৈরি করার সময় না থাকলে পরে করা মুশকিল হয়ে যায়। এ হাসপাতাল তো করা হয়েছে ১৯৯৭ সালে, এ কারণে এটা নাই। ইতোমধ্যে আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে এসটিপির জন্য চিঠি লিখেছি। কিন্ত সেখান থেকে নির্দেশনা পুরোপুরিভাবে না আসলে তো সম্ভব হবে না। সেটার জন্য আমাদের পরিবেশ ছাড়পত্রও নেই।’

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক চালানোর জন্য ছাড়পত্র নিতে হলে ইটিপি স্থাপনসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিধিতেও বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর সরকারি হাসপাতালগুলোর একটিরও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। স্থাপন করা হয়নি ইটিপি। বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতালের আগে নেওয়া পরিবেশ ছাড়পত্র থাকলেও এখন আর নবায়ন করার সুযোগ হচ্ছে না। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর মধ্যে ২-৩ টি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ইটিপি ও পরিবেশ ছাড়পত্র।

যে কয়েকটি হাসপাতালের নিজস্ব ইটিপি আছে সেগুলোর একটি নগরের পাঁচলাইশে অবস্থিত পার্কভিউ হাসপাতাল। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বেজমেন্টে স্থাপন করা হয়েছে ইটিপি। সেখানে তরল বর্জ্যকে পরিশোধন করে পরিবেশসম্মত উপায়ে জীবাণুমুক্ত করে ড্রেনে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। পাঁচজন ইঞ্জিনিয়ার সার্বক্ষণিক কাজ করছেন এ প্ল্যান্টে।

জানতে চাইলে পার্কভিউ হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) তালুকদার জিয়াউর রহমান শরীফ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘২০১৮ সালে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার শুরুতেই ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। আমাদের ডব্লিউটিপিও আছে। ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি করা হয়েছে।’

হাসপাতালে ব্যবহৃত পানি শোধন করে পুনরায় ব্যবহার করার সুযোগও আছে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ওয়াজেদ চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ইটিপির বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের বিষয়, আমাদের নয়। আমরা দেখব হাসপাতাল-ক্লিনিকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের জনবল আছে কি না। সবকিছু পরিপূর্ণ আছে কি না। আর পরিবেশের বিষয়টা পরিবেশ অধিদপ্তর দেখবে। ক্লিনিকের পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে অনেক কিছুর সম্মুখীন হতে হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর মিলে ঢাকায় সেন্ট্রালি একটা মিটিং ছিল। ওই মিটিংয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে প্রথম লাইসেন্সের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করতে হবে। এরপর ওনারা পরিদর্শন করে বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী কোনো ভুলত্রুটি পেলে ওনারা লাইসেন্স দেবেন না।’

হাসপাতালের তরল বর্জ্য প্রকৃতির উপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইদানিং আমাদের রোগ বেড়ে গেছে। তরল বর্জ্য এভাবে ফেলে দেওয়ায় পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। ফলে প্রায়ই মারাত্মক রোগবালাই হচ্ছে। ময়লার পাহাড় থেকে বাতাসের মাধ্যমে রোগ ছড়াচ্ছে। আর বৃষ্টির সময় ধুয়ে নগরে ছড়িয়ে পড়ছে, নদীতে যাচ্ছে। আবার সেই নদী থেকে আমরা পানি ব্যবহার করছি। এ বিষয়টা নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের একটা জোরালো মুভমেন্ট দরকার। তারা যদি এটার বিরুদ্ধে অ্যাকশন না নেয়, তাহলে তো আমাদের ঝুঁকি আরও বাড়বে।’

ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ওয়াজেদ চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের একটা বৈঠকে আমি গিয়েছিলাম। সেখানে আমি বলেছি, এটার বিরুদ্ধে আপনাদের একটা জোরালো মুভমেন্ট দরকার। সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের। শুধু আপনারা গিয়ে ভিজিট করলেন, চলে আসলেন, তাহলে হবে না। আপনাদের কিন্তু জরিমানার বিষয় থাকতে হবে। তাহলে তারা সংশোধন হবে। যেমন আমরা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্ট করি।’

এদিকে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের তরল বর্জ্য শুধু সিটি করপোরেশনের পাহাড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে তা-ই নয়, গোপনে অনেক হাসপাতাল এসব তরল বর্জ্য সরাসরি নর্দমায় ফেলে দিচ্ছে। নগরের ফয়েজ লেক এলাকায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতালের (ইউএসটিসি) তরল বর্জ্য পাশের লেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শন করে সত্যতা পায় পরিবেশ অধিদপ্তরও। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশ ছাড়পত্র নবায়ন বন্ধ রাখা হয়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের উপ-পরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বেশ কয়েকবার হাসপাতালগুলোকে নোটিশ করা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ড্রয়িং ডিজাইন আমাদের এখানে সাবমিট করেছে। অনুমোদনও হয়েছে। অনেকে কনস্ট্রাকশনের কাজ করছে। এটা চলমান প্রক্রিয়া। যে সব হাসপাতাল ইটিপি ডিজাইন সাবমিট করবে না, তাদের পরিবেশ ছাড়পত্র আমরা নবায়ন করছি না। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। আমরা তাদের বেশ কয়েকবার চিঠি দিয়েছি। তারা ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছে।’