
এম কে মনির : মানুষের জীবনে বড় কিছু করার পেছনে ইচ্ছাশক্তি যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে তা আবারও প্রমাণ করেছেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের মেধাবী শিক্ষার্থী সারজানা আক্তার লিমানা। আর্থিক দৈন্যতা ও নানা ঘাত-প্রতিঘাতের কারণে যে মেয়েটির লেখাপড়া বেশ কয়েকবার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল সেই মেয়েটিই এবার প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। অদম্য মেধাবী এই মেয়েটি এখন পুরো উপজেলাজুড়ে সকলের প্রশংসায় ভাসছেন।
সারজানা আক্তার সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড দক্ষিণ মহাদেবপুর চৌধুরী পাড়ার হতদরিদ্র কৃষক মো. জরুরুল আলমের বড় মেয়ে। তিনি সীতাকুণ্ড সরকারি মহিলা কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছিলেন।
গত ৭ জুন দুপুর ১টায় ঘোষিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল। এতে সারজানা আক্তার বি ইউনিটে (কলা, আইন ও সমাজবিজ্ঞান) দ্বিতীয় হয়েছেন। ফলাফলে সারজানা নৈব্যক্তিক, লিখিত, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলের উপর ১২০ নম্বরের মধ্যে ৮৪.৭৫ নম্বর পেয়েছেন। যা ঢাবির বি ইউনিটের মেধাক্রমে দ্বিতীয়। এ ফলাফলে পাস করেছেন মাত্র ১১ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষার্থী। যা মোট শিক্ষার্থীর ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বাকি ৯০ দশমিক ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থীই ফেল করেছেন।
সারজানার এমন অভাবনীয় সাফল্যে খুশি তার পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, সহপাঠী, শুভাকাঙ্ক্ষী তথা গোটা সীতাকুণ্ডবাসী। কীভাবে নিজেকে এমন অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন তা জানতে কথা হয় সারজানার সঙ্গে। সারজানা জানান, ১২ বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন তিনি। উচ্চশিক্ষিত মা সবসময় তাকে পড়াশোনার জন্য বলতেন। মা বলতেন প্রয়োজনে রক্ত বিক্রি করে হলেও আমি আমার মেয়েকে পড়াশোনা করাব। কিন্তু সারজানাদের পরিবার ছিল টানাপোড়েনের। কৃষক বাবা তার সামান্য আয়ে সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতেন।
নুন আনতে পান্তা ফুরোয়- এমন অবস্থায় পড়াশোনা করাটা সারজানার জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কখনও প্রাইভেট পড়ার সুযোগ হয়নি তার। পঞ্চম শ্রেণি পাসের পর পড়াশোনায় উৎসাহ জুগিয়ে আসা মা রুমা আক্তার সন্তান প্রসবের সময় মারা যান। সেই থেকে একা হয়ে পড়েন সারজানা।
ছোট দুই ভাই-বোনকেও দেখাশোনার দায়িত্ব সারজানার কাঁধে পড়ে। পরীক্ষার ফি, কোচিংয়ের বেতন, বই-খাতার খরচ জোগাড় করতে দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো তাকে। এতোকিছুর পরও সারজানা হাল ছাড়েননি। শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা আর মৃত্যুর আগে বলে যাওয়া মায়ের কথাগুলো সারজানাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। সেই থেকে সংসারের পাশাপাশি নিয়মিত মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া করতেন তিনি। আর স্বপ্ন বুনতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার।
সারজানা জানান, তিনি কখনও স্কুল-কলেজের ক্লাসে ফাঁকি দেননি। শত কষ্টেও ক্লাস করেছেন। দৈনিক ৮-১০ ঘন্টা পড়াশোনা করতেন। না খেয়ে, না পরে, না ঘুমিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে নিয়েছেন। তার বিশ্বাস ছিল সাফল্য একদিন আসবেই। এভাবে প্রবল ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় আত্মবিশ্বাস আর কঠোর সাধনা সারজানাকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে।
সারাজানা আক্তার ২০১৪ সালে সীতাকুণ্ডের দত্তবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে পিএসসি পাস করেন। ২০২০ সালে তিনি সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় জিপিএ-৫ পেয়ে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ২০২২ সালে একই শাখায় সীতাকুণ্ড সরকারি মহিলা কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন সারজানা। পরে প্যাসিফিক জিন্স ফাউন্ডেশন পরিচালিত কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন।
সারজানা আক্তার লিবানা একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি সবচেয়ে বেশি প্রেরণা পেয়েছি মায়ের কাছ থেকে। আজ আমার মা বেঁচে নেই। তিনি বেঁচে থাকলে কতই না আনন্দিত হতেন। সারজানা আক্তার বলেন, আমি মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি আমাকে এ সাফল্য এনে দিয়েছেন। আমি মনে করি শিক্ষার্থীদের শুধু লেখাপড়া করলেই হয় না। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ চিত্তে চাইতে হয়। আল্লাহকে স্মরণ করতে হয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি ইবাদতে মনোযোগী হলে আল্লাহ পুরস্কৃত করেন।
তিনি আরও বলেন, আমি আমার শিক্ষকদের কাছেও কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে নানাভাবে প্রেরণা দিয়েছেন। পাশে ছিলেন। প্যাসিফিক জিন্স ফাউন্ডেশনের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ৮ম শ্রেণি থেকে এ প্রতিষ্ঠানটি আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। আমি তাদের অবদান কখনও ভুলবো না। লেখাপড়া শেষ করে সারজানা বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়ে দেশের সেবা করতে চান বলে জানান।
প্যাসিফিক জিন্স ফাউন্ডেশন পরিচালিত প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় ও নার্সিং ভর্তি কোচিং সেন্টারের কো-অর্ডিনেটর এমরান হোসাইন রাকিব একুশে পত্রিকাকে বলেন, সারজানা অত্যন্ত মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। লেখাপড়ার প্রতি তার আগ্রহ আমাকে অবাক করেছে। তার একবার গুটিবসন্ত হয়েছিল। প্রচণ্ড অসুস্থ হয়েও তিনি কোচিং মিস করেননি। অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও প্রবল ইচ্ছাশক্তিই তাকে সাফল্য এনে দিয়েছে।
সারজানা আক্তার ছাড়াও প্যাসিফিক জিন্স ফাউন্ডেশন পরিচালিত কোচিং থেকে এবার ঢাবির সি ইউনিটে ১২৯ তম হয়েছেন সীতাকুণ্ডের মেয়ে রোমানা তাবাসসুম। তিনি আবার চবির সি ইউনিটে হয়েছেন ৮০ তম। একই কোচিং সেন্টার থেকে সীতাকুণ্ডের মেয়ে নাহিদা সুলতানা রিয়া ঢাবির এ ইউনিটে ১৫৪৪ তম ও চবি সি২ ইউনিটে ৬৫ তম হয়েছেন।
