
ফারুক আবদুল্লাহ : পাকিস্তানের দুর্দশা বেড়েই চলেছে। আকাশ ছুঁয়েছে দ্রব্যমূল্য। এবার সামনে এলো দেশটির বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির তথ্য। এই মুহূর্তে বলা যায় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রতিবেশী দেশটি। সেখানে একদিকে যেমন রাজনৈতিক অস্থিরতা। তেমনি মুদ্রাস্ফীতিও নিচে নামার কোনও লক্ষণ নেই। টানা দ্বিতীয় মাসে দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। দারিদ্র্যের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো পাকিস্তানে, যেখানে এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩৬.৪ শতাংশ। যা মে মাসে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৯৭ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশেরই পরিস্থিতি পাকিস্তানের মতো খারাপ নয়।
ব্লুমবার্গের রিপোর্ট মোতাবেক, বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে পাকিস্তান। এরই মধ্যে এমন এক সময়ে মুদ্রাস্ফীতির রেকর্ড সামনে এলো, যখন সে দেশের সরকার বাজেট পেশ করার পরিকল্পনা করছে।
পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিকটিসের প্রকাশিত তথ্য অনুসারে পাকিস্তানে বার্ষিক ভিত্তিতে ২০২৩ সালের মে মাসে মুদ্রাস্ফীতির হার রয়েছে ৩৭.৯৭ শতাংশ। যা কিনা আগের মাসের তুলনায় বেশি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় এবং তামাকজাত দ্রব্যের দাম চলতি বছরের সর্বোচ্চ ১২৩.৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, তারপরে বিনোদন এবং সংস্কৃতি ৭২.১৭ শতাংশ এবং পরিবহন ৫২.৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে৷ অপচনশীল খাবারের দামও ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
পাকিস্তানে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে খাবারের দাম। এ ছাড়া, অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় এবং তামাক বিভাগে বছরে সর্বোচ্চ দাম বৃদ্ধি হয়েছে। এমনকি পরিবহনেও ৫২.৯২ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গিয়েছে। এর মূল কারণ অবশ্য পেট্রল, ডিজেলের দাম বৃদ্ধি।
পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিকটিসের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, মুদ্রাস্ফীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আলু, গমের আটা, দুধ, চা, গম, ডিম এবং চাল। খাদ্য নয় এমন জিনিসের ক্ষেত্রে বই, স্টেশনারি, সাবান-ডিটারজেন্ট এবং দেশলাইয়ের দাম বার্ষিক ভিত্তিতে বেড়ে গিয়েছে। এ ছাড়া সিগারেটের দামও ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
মূলকথা হচ্ছে, পাকিস্তানে মুদ্রাস্ফীতি এমন পর্যায়ে রয়েছে যে সাধারণ মানুষের পাতে তিন বেলা রুটি, ভাতও জোগাড় হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ ময়দা লুট করতে রাস্তায় নেমে পড়ছে। এমনকি বহু জায়গায় বাড়ির বউকে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। সাধারণ চাকুরিজীবীরা কাজ শেষে পরে বাইক চালিয়ে অর্থ উপার্জন করছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পাকিস্তানে আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতির পেছনে উচ্চ বৈদেশিক ঋণ, একটি দুর্বল মুদ্রা এবং হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। একটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং বিধ্বংসী বন্যা যা ২০২২ সালে দেশের এক তৃতীয়াংশ স্থান ডুবে ছিল তাও এই সংকটের জন্য দায়ী।
তারা আশঙ্কা করছেন, এ বছরে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৫০ বা তার বেশির ঘরে যেতে পারে। তবে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এমনটা আগেই জানিয়েছিল পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, আইএমএফ থেকে তহবিল পেতে দ্বিতীয় দফায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিহার এবং ডলারের বিপরীতে রুপির অবমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কারণে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে। এ ছাড়া মুদ্রাস্ফীতি প্রশমনে অকার্যকর নীতিগত ব্যবস্থা এবং কর্তৃপক্ষের অসহায়ত্বের কথাও স্বীকার করেছে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শাখা।
উল্লেখ্য, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের গ্রেপ্তারের কারণে দেশজুড়ে সহিংসতার সৃষ্টি হয়, যা চলমান চ্যালেঞ্জগুলোতে নতুন করে রাজনৈতিক সংকট যোগ করে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সরকার তার বার্ষিক বাজেট পেশ করার এক সপ্তাহ আগে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ প্রকাশ পায়।
