- স্বর্ণ হলো নিরাপদ সঞ্চয় এবং ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের অন্যতম পথ। কোনও দেশের স্বর্ণের ভান্ডার সেই দেশের অর্থনীতির উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বর্ণ রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শুল্ক-কর বৈষম্য ও নীতি সুবিধার অভাবে বেকায়দায় রয়েছে দেশের জুয়েলারি শিল্প। স্বর্ণ খাতের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রথম পর্ব।
শরীফুল রুকন : দেশে বর্তমানে এক ভরি স্বর্ণের দাম ৯৮ হাজার ৪৪৪ টাকা। এই পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে অলংকার তৈরিতে মজুরি দিতে হয় ৩ হাজার ৪৯৯ টাকা। স্বর্ণের দাম ও মজুরির ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয় ৫ হাজার ৯৭ টাকা। অথচ ভারতের কলকাতায় সমপরিমাণ স্বর্ণের দাম পড়ছে ৬৩ হাজার ৩৯৩ রুপি বা ৮৩ হাজার ৬১৯ টাকা; অলংকারে ৩ শতাংশ হারে ভ্যাট (জিএসটি) দিতে হয় ১ হাজার ৯০১ রুপি বা ২ হাজার ৫০৬ টাকা।
অর্থ্যাৎ বর্তমানের ভ্যাট হারের হিসাবে, বাংলাদেশ থেকে একজন ক্রেতা ১০ লাখ টাকার স্বর্ণের অলংকার কিনলে ৫০ হাজার টাকা ভ্যাট দিতে হয়। আর ভারত থেকে একই পরিমাণ সোনার অলংকারে ভ্যাট ৩০ হাজার টাকা। ভ্যাট কম ও নীতি সুবিধার কারণে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে স্বর্ণের দাম কম। এতে ক্রেতা হারাচ্ছেন দেশের জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা।
স্বর্ণ খাতের কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতেও তুলনামূলক উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাট আছে। যার কারণে অলংকারের দাম বেশি পড়ায় দেশের ক্রেতারা বিদেশ থেকেই স্বর্ণ কেনায় বেশ উৎসাহী। কারণ, বাংলাদেশের চেয়ে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ কম দামে ক্রেতারা দেশের বাইরে থেকে স্বর্ণ কিনতে পারেন। এভাবে দেশের সম্ভাবনাময় জুয়েলারি শিল্প খাতের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শুল্ক ও ভ্যাট।
এর ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে দেশের ব্যবসায়ীরা হারাচ্ছেন তাদের বিনিয়োগকৃত পুঁজি আর দেশ হারাচ্ছে রাজস্ব। এভাবে চলতে থাকলে এই খাতে নতুন বিনিয়োগে হতাশা বাড়বে।
গালফ নিউজের ওয়েবসাইট থেকেও দুবাইয়ের সোনার দাম ও টাকার বিনিময় মূল্য জানা যায়। ২৭ জুনের হিসাবে দুবাইতে ২২ ক্যারেটের এক গ্রাম সোনার দাম ২১৫.৭৫ দিরহাম। আর এক দিরহামে পাওয়া যায় ২৮.২৮ বাংলাদেশি টাকা। এক ভরি সোনা বলতে ১১.৬৬৪ গ্রাম সোনা বোঝায়। সে হিসেবে দুবাইতে এক ভরি সোনার দাম পড়ছে ৭১ হাজার ১৬৭ টাকা।
দুবাই প্রবাসী শওকত আকবর বলেন, ‘আমাদের দেশে তো সোনার দাম অনেক, লাখ ছুইছুই। কিন্তু দুবাইয়ে সোনার দাম অনেক কম, ৭২ হাজার টাকার মতো। এ কারণে প্রতিবারই দেশে যাওয়ার সময় সোনা কিনে নিয়ে যাই। আত্মীয়-স্বজনরাও দেশ থেকে হুন্ডিতে টাকা পাঠায় সোনা কিনে নিয়ে যেতে। শুধু আমি না, দুবাই প্রবাসী সবার ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটছে। অনেকেই দেশ থেকে হুন্ডিতে টাকা পাঠাচ্ছে, সোনা কিনে নিয়ে যেতে। এছাড়া বেড়াতে এসেও প্রায় সবাই সোনা নিয়ে যাচ্ছেন। আবার চোরাচালানিদের স্বর্ণের বার বহন করছেন কেউ কেউ, এক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পাওয়া যায়।’
শুধু দুবাই না, বাংলাদেশি ক্রেতারা সোনার অলংকার কেনার জন্য ভারতেও যাচ্ছেন। সেখান থেকে নতুন নতুন ডিজাইনের পাশাপাশি সাশ্রয়ী দামে গহনা কিনে আনছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৭ জুন কলকাতার বাজারে ২২ ক্যারেটের এক গ্রাম সোনার দাম ৫ হাজার ৪৩৫ রুপি (৭ হাজার ১৬৯ টাকা)। সে হিসেবে কলকাতার বাজারে এক ভরি (১১.৬৬ গ্রাম) সোনার দাম পড়ছে ৬৩ হাজার ৩৯৩ রুপি বা ৮৩ হাজার ৬১৯ টাকা।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের বাসিন্দা মো. ফারুক নিজের বিয়ের বাজার করতে সম্প্রতি কলকাতায় গিয়েছিলেন; তিনি বলেন, ‘কলকাতায় কাপড় যেমন অনেক সস্তা, তেমনি সোনার অলংকারও। বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমে সোনা কিনতে পেরেছি আমি।’
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে সোনার দাম কিছুটা বেশি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ভ্যাট। ভারতে জুয়েলারি খাতের জন্য বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় কম। সোনার জন্য সহজ শর্তে ঋণসহায়তা দেওয়া হয়। যে কারণে ভারতে স্বর্ণশিল্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
বাজুসের সাবেক সভাপতি দিলীপ কুমার রায় বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারে সোনার দামের পার্থক্যের কারণে বাংলাদেশের অনেক উচ্চবিত্ত ক্রেতা বিদেশ থেকে অলংকার কেনেন। এতে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। সরকারও প্রত্যাশিত রাজস্ব হারাচ্ছে। আবার দেশে যারা কেনাকাটা করেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চ করহারের কারণে ভ্যাট প্রদানে অনীহা প্রকাশ করে থাকেন। এতে ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েন।’
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে চট্টগ্রামের একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী বলেন, ‘ভ্যাট ও দাম বেশি হওয়ার কারণে এখন সোনার বেচাকেনা নেই বললেই চলে। গ্রামে এমন অনেক দোকান পাওয়া যাবে, যেখানে মাসে এক ভরি স্বর্ণ বিক্রি হয় না। ব্যবসার আড়ালে অনেকেই এখন সুদের কারবার করে টিকে আছেন। উচ্চ সুদের কারণে মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে, সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে। সোনার দাম ও ভ্যাট না কমলে মানুষ দেশ থেকে সোনা কিনবে না।’

সোনার অলংকারের ওপর ভ্যাটের হার কমানোর বিষয়ে বাজুসের যুক্তি হচ্ছে, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও থাইল্যান্ডে ভ্যাট ৫ শতাংশ হলেও বিমানবন্দর থেকে তা ফেরত পান আন্তর্জাতিক ক্রেতারা। অন্যদিকে ভারতে ভ্যাটের হার ৩ শতাংশ। দেশটির ভিসা সহজলভ্য হওয়ায় বাংলাদেশের ক্রেতারা ভারত থেকে সোনার অলংকার কিনতে উৎসাহিত হচ্ছেন।
বিদেশ থেকে সোনার অলংকার কিনতে নিরুৎসাহিত করার অংশ হিসেবে বিদেশ থেকে আসা একজন যাত্রীর স্বর্ণের বার আনার ক্ষেত্রে শুল্ক দ্বিগুণ করা হয়েছে এবারের বাজেটে। অর্থ্যাৎ ১ ভরি সোনার জন্য খরচ হবে ৪ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে একজন যাত্রী সঙ্গে করে কী পরিমাণ স্বর্ণ নিয়ে আসতে পারবেন তার সীমাও অর্ধেক করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ নতুন নিয়মে বিদেশ থেকে একজন যাত্রী শুল্ক পরিশোধ করে ১১৭ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণের বার আনতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুল্ক বাড়ানোর কারণে বিদেশে থেকে সোনার বার নিয়ে আসা অনেকটাই কমেছে। কিন্তু বেড়েছে তৈরিকৃত ১০০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ নিয়ে আসার প্রবণতা। কোনো শুল্ক-কর না দিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম পর্যন্ত স্বর্ণালংকার একজন যাত্রী আনতে পারেন।
বাজুসের তথ্যমতে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত জুয়েলারি আছে প্রায় ৪০ হাজার। স্বর্ণ নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশে সোনার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪০ টন। তবে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণে সরকারি সমীক্ষা হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-এর শুরু থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে সোনা আমদানি হয়েছে মাত্র ১৪৮ কেজির মতো। বাকি সোনার চাহিদার বড় অংশ মেটানো হয় বিদেশ থেকে আসা সাধারণ যাত্রীদের বহন করা সোনা দিয়ে।
চট্টগ্রামের সোনা ব্যবসায়ী কৃষ্ণ ধর জানান, বিদেশ থেকে বৈধভাবে কেউ ব্যাগে করে স্বর্ণ নিয়ে আসলে প্রতি ভরিতে ভ্যাট দিতে হয় ৪ হাজার টাকা। আর একজন ব্যবসায়ী স্বর্ণ আমদানি করলে ৭ হাজার টাকা ভ্যাট দিতে হয়। এই অসম প্রতিযোগিতার কারণেই দেশে বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি কম হচ্ছে।
বাজুসের সাবেক সভাপতি দিলীপ কুমার রায় বলেন, ‘দেশে বৈধভাবে সোনার চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রে বড় বাধা কাঁচামালের উচ্চ মূল্য, অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয়, শিল্পসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির উচ্চ আমদানি শুল্ক। বর্তমানে জুয়েলারি শিল্পের প্রায় সব ধরনের পণ্য ও যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ, যা স্থানীয় অন্যান্য শিল্পে আরোপিত শুল্কের চেয়ে অনেক বেশি। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সোনার অলংকার তৈরিতে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া উচিত। অপরিশোধিত আকরিক সোনা আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এছাড়া আংশিক পরিশোধিত সোনার আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ নির্ধারণ, সোনা পরিশোধনাগার শিল্পে ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া দরকার। তবেই সম্ভাবনাময় জুয়েলারি শিল্পের বিকাশ হবে।’
বর্তমানে স্বর্ণের মজুতের বৈশ্বিক তালিকায় পেছনের সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে মজুত কম বাংলাদেশের। গত এপ্রিলে প্রকাশিত বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা মজুতের তথ্য দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সোনা মজুতের পরিমাণ ১৪ দশমিক ৩০ টন। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সোনা মজুতের পরিমাণ বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, যথাক্রমে ৬৪ দশমিক ৬৫ ও ২১ দশমিক ৮৭ টন।
অন্যদিকে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অর্ধ-বার্ষিক প্রতিবেদন অক্টোবর ২০২২- মার্চ ২০২৩ অনুসারে, বর্তমানে ভারতের স্বর্ণ মজুতের পরিমাণ ৭৯৪.৬৪ টন।
বাজুস চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রণব সাহা বলেন, ‘ভোক্তাদের বিদেশমুখী বন্ধ করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক ভ্যাটের হার নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিবেশি দেশ ভারতের এত বড় বাজার হওয়ার পরও ক্রেতাদের জন্য ভ্যাট মাত্র ৩ শতাংশ। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করতে জুয়েলারি খাতে আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট হার কমানো এবং আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করতে হবে। এতে যেমন সরকারের বৈদেশিক আয় আসবে। তেমনি বাড়বে রাজস্ব আয়।’
এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘কম প্রয়োজনীয় বিলাস পণ্য বাছাই করে শুল্কায়ন আরোপ করা হয়। তবুও জুয়েলারি শিল্পে আমরা নানাভাবে নীতিসহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করি। এনবিআর স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়ে এক যোগে কাজ করছে। স্বর্ণ খাতকে আরও অগ্রসর করার জন্য যাবতীয় ইতিবাচক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বাজার গবেষণা এবং পরামর্শ কোম্পানি গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ এর তথ্যমতে, বিশ্বে ২০২২ সালে সব রকমের সোনার অলংকারের বাজারের মোট আকার ছিল ৩৪০ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারের ৬০ শতাংশ অংশীদার এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বর্ণ নীতিমালায় উল্লেখ আছে, হাতে তৈরি অলংকারের প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশ ও ভারতে উৎপাদিত হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে অলংকার রপ্তানিতে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। চাহিদার প্রায় পুরোটাই রপ্তানি করছে ভারত।
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে উল্লেখ আছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে অলংকার রপ্তানিতে ভারতের আয় ছিল ৩৯ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু সোনা থেকে রপ্তানি আয় ছিল ৯ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২০ সালে সোনা রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছিল ২২ লাখ ২০ হাজার ডলার মাত্র। পুরোটাই রপ্তানি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ওই বছর সোনা রপ্তানির তালিকায় বাংলাদেশ ছিল ১৪৬তম দেশ। দেশের রপ্তানি পণ্য থেকে আয় করার মধ্যে সোনায় আয় ছিল ১৮৫তম অবস্থানে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যবান ধাতু সোনার সঙ্গে তুলনা করা হয় শুধুই মুদ্রার। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে স্বর্ণের দাম অনেক বেশি। কারণ, এই স্বর্ণ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে চোরাচালান চক্র। তাই অনেকেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে স্বর্ণ কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এর প্রধান কারণ অবৈধভাবে দেশে স্বর্ণ আসছে এবং চোরাচালান চক্রের সদস্যরা নিজেদের প্রয়োজনে স্বর্ণের দাম বাড়িয়ে রেখে আর্থিক ফয়দা লুটছে। কিন্তু স্বর্ণকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করলে এটি হতে পারে দেশের সর্ববৃহৎ খাত। পণ্য হিসাবে স্বর্ণকে বিবেচনা করে অলংকারে রূপান্তরিত করে রপ্তানির সুযোগ করে দেওয়া উচিত। এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু নীতি সুবিধা না থাকায় সম্ভাবনাময় জুয়েলারি শিল্পের বিকাশ হুমকির মুখে পড়েছে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি শিল্পের সর্বশেষ উৎপাদিত পণ্যের দাম তখনই কমানো সম্ভব হয়, যখন তার সাথে সংশ্লিষ্ট মেশিনারিজ ও কাঁচামালের উপর আরোপিত শুল্কের পরিমাণ কম হয়। কিন্তু দেশে স্বর্ণের অলংকার তৈরির প্রত্যেক ধাপে মূল্য সংযোজন হতে হতে সর্বশেষ উৎপাদিত পণ্যের দামের পার্থক্য পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে দাঁড়ায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বা আরও বেশি।
২০২৬ সালের মধ্যে সরকার ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নিয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে জুয়েলারি শিল্প হতে পারে তুরুপের তাস। কারণ এই শিল্পের জন্য নতুন অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজন নেই, শুধু প্রয়োজন সরকারের নীতি নির্ধারকদের সুদৃষ্টি এবং শুল্ক হার কমানো ও কর অবকাশ প্রদান।
বাজুসের তথ্যমতে, বর্তমানে জুয়েলারি শিল্পের স্থানীয় বাজার ৫০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকার মূল্যমানে দাঁড়িয়েছে। জুয়েলারি খাতে ৩৪ লক্ষ লোক যুক্ত হয়ে আছে। সরকারের সঠিক নীতিমালা ও যথাযথ প্রণোদনা, এই শিল্পের স্থানীয় বাজারকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজারে উন্নীত করতে পারে। এর ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ রপ্তানি করা গেলে, এই খাত থেকেই রপ্তানি আয় দাঁড়াবে ৫০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে বাজুস ফেয়ারে অংশ নিয়ে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের রপ্তানির ৮৩ শতাংশ গার্মেন্ট। বাকি সব পণ্য মিলিয়ে ১৭ শতাংশ। ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করার যে টার্গেট, সেটা শুধু গার্মেন্ট টেক্সটাইল দিয়ে সম্ভব হবে না। জুয়েলারি শিল্পটা বিশাল সম্ভাবনাময় জায়গা। এই খাতের উন্নয়নের জন্য যত ধরনের নীতি সহায়তা দরকার, আমি আহ্বান জানাব সরকারের কাছে, সব ধরনের সহায়তা দিতে হবে। এখানে প্রচুর কর্মসংস্থান ও ভ্যালু অ্যাডিশনের সুযোগ আছে।’
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা জানান, বিশ্বের উন্নত দেশ হিসাবে কাতার, হংকং, চায়না, ভারত যেখানে সোনা কেন্দ্রিক পুঁজিবাজার তৈরি করেছে এবং নিজস্ব মুদ্রায় সোনার স্ট্যান্ডার্ড বানিয়ে আমদানি মূল্য পরিশোধ ও বিনিয়োগের একটি বড় মাধ্যম তৈরি করেছে, সেখানে বাংলাদেশে তেজাবি বা পিওর সোনা অবৈধ হিসাবে বিবেচিত হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুয়েলারি খাতকে উন্নত করার ক্ষেত্রে, প্রথমেই উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে দামের সমন্বয় করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। কাঁচামালের যোগান নিরবিচ্ছিন্ন রাখার ক্ষেত্রে, জুয়েলারি শিল্প সংশ্লিষ্ট সকল ধরণের প্রাথমিক কাঁচামাল এবং যন্ত্রপাতি আমদানির শুল্কের ক্ষেত্রে ১০ বছরের কর অবকাশ সহ; সকল যন্ত্রপাতি আমদানির শুল্ক হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশে নিয়ে আসতে হবে। আংশিক পরিশোধিত সোনা আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক হার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে, দেশ সোনা পরিশোধনের ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে যাবে।
বাজুসের সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা সহজে স্বর্ণ আমদানি করতে পারি না। দেশে যা স্বর্ণ আসে তার বেশিরভাগই ব্যাগেজ-রুলের মাধ্যমে আসে। কিন্তু আমাদের শুল্কের পরিমাণ অনেক বেশি। স্বর্ণ আমদানিতে প্রতি ভরিতে শুল্ক ১ হাজার টাকা করা উচিত। শুল্ক হ্রাস করা হলে আমদানি বৃদ্ধি পাবে। সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। কিন্তু বেশি মূল্য দিয়ে সোনা আনায় আমরা রপ্তানিও করতে পারি না। তাই স্বর্ণালংকার রপ্তানি করতে হলে নীতি পরিবর্তন করতে হবে।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘সোনা একটি মূল্যবান পণ্য, অল্প বিক্রি করলেই বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে। যারা রপ্তানির জন্য অলংকার উৎপাদন করবে তাদের শুল্ক-ভ্যাট কমিয়ে দিয়ে নগদ প্রণোদনা দিতে হবে। এতে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবে।’
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমাদের রাজস্ব বিভাগের একটা প্রবণতা ছিল, সোনাকে নিষিদ্ধ করা, এর মাধ্যমে আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। এই শিল্পের প্রসারে সরকারিভাবে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে৷’
তবে জুয়েলারি শিল্পকে শক্তিশালী করতে সব ধরনের নীতি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন; তিনি বলেন, ‘আমরা জুয়েলারি শিল্পে নেতিবাচক নই। এটা একটা বৃহৎ শিল্প। এ জন্য আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে যা যা করণীয় সব করা হবে। ভ্যাট-ট্যাক্সসহ যে জটিলতাগুলো আছে সেগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সবই মিলে বসে আলোচনা করে দ্রুতই একটা নীতি নির্ধারণ করা হবে।’

