- স্বর্ণ হলো নিরাপদ সঞ্চয় এবং ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের অন্যতম পথ। কোনও দেশের স্বর্ণের ভান্ডার সেই দেশের অর্থনীতির উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বর্ণ রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শুল্ক-কর বৈষম্য ও নীতি সুবিধার অভাবে বেকায়দায় রয়েছে দেশের জুয়েলারি শিল্প। স্বর্ণ খাতের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ দ্বিতীয় পর্ব।
শরীফুল রুকন : ১৯৭০ সালে দেশে প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) গিনি স্বর্ণের (২২ ক্যারেট) দাম ছিল ১৫০ টাকা। সেই একই মানের স্বর্ণ কিনতে এখন খরচ হচ্ছে ৯৮ হাজার ৪৪৪ টাকা। অর্থাৎ গত ৫৩ বছরে স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৬৫৬ শতাংশ। এসব কারণে স্বর্ণকে বলা হয় ‘সেফ হেভেন’, এর মানে হচ্ছে বড় ক্ষতির আশংকা ছাড়া বিনিয়োগ করা যায় যেখানে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) তথ্যমতে, ১৯৭০ সালে ১৫০ টাকায় পাওয়া যাওয়া প্রতি ভরি গিনি স্বর্ণের দাম ১০ বছরের ব্যবধানে ১৯৮০ সালে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫০ টাকায়; যেখানে বৃদ্ধির হার ২১৩ শতাংশ। এর পরবর্তী ১০ বছরে আরও দুইগুণ বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৬ হাজার ৪০০ টাকা।
২০০০ সালে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ৬ হাজার ৮০০ টাকা। সে হিসেবে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল ১০ বছরে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পায় মাত্র ৪০০ টাকা। বলা চলে এ সময়ে স্বর্ণের মূল্য অনেকটা স্থিতিশীল ছিল।
২০১০ সালে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ৩৬ হাজার ১০০ টাকা। অর্থাৎ ২০০০ সালের পরবর্তী ১০ বছরে আরেক দফা লাফ দেয় স্বর্ণের দাম। ভরি প্রতি দর বাড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। বৃদ্ধির হার প্রায় ছয়গুণ।
বাজুসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিশ্ব বাজারে অস্থিরতার কারণে ২০০৯ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বাড়ছে স্বর্ণের দাম। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ৫৯ হাজার ৮৭৪ টাকায়। এরপর থেকে আবার কমতে থাকে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে এসে হয় ৪১ হাজার ২৭৬ টাকা। এরপর ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২০ সালের মার্চ মাসে এসে মূল্য দাঁড়ায় ৬০ হাজার ৩৪০ টাকা।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের বাজারে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ৬১ হাজার ৫২৮ টাকা। তিন বছর পর দাম বেড়েছে ৩৬ হাজার ৯১৬ টাকা। বর্তমানে এক ভরি স্বর্ণের অলংকার কিনতে লাগছে ৯৮ হাজার ৪৪৪ টাকা।
বাজুস সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালে এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১৫৪ টাকা। তখন মাথাপিছু আয় ছিল ৭০ ডলার। সে সময় ডলারের বিনিময় হার ৭ টাকা ২৮ পয়সা ধরলে মাথাপিছু আয় ছিল ৫০৯ টাকা। অর্থাৎ বার্ষিক মাথাপিছু আয় দিয়ে ৩ দশমিক ৩১ ভরি সোনা কেনা যেত তখন। এখন বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৪ ডলার। প্রতি ডলার ১১০ টাকা ৫০ পয়সা (মানি এক্সচেঞ্জগুলোয় প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১১০ টাকা ৫০ পয়সা। তবে দেশের কোনো কোনো ব্যাংক আমদানিকারকদের কাছ থেকে ডলারপ্রতি ১১৫-১১৬ টাকাও নিচ্ছে) ধরলে আয় ৩ লাখ ১২ হাজার ৫২ টাকা। এখন সোনার ভরি কিনতে দিতে হয় ৯৮ হাজার ৪৪৪ টাকা। সুতরাং মাথাপিছু আয় দিয়ে ৩ দশমিক ১৭ ভরি সোনা কেনা সম্ভব।
স্বর্ণের দাম বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। স্বর্ণের বাজারে সাময়িক ওঠানামা থাকলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফলে স্বর্ণ ক্রেতার লোকসান হয় না। মূলত স্থিতিশীলতা ও নির্ভরযোগ্যতার কারণেই সব মানুষের পছন্দের ধাতু হয়ে উঠেছে স্বর্ণ। যার কারণে স্বর্ণের দাম ক্রমাগত বেড়ে চললেও বিশ্বজুড়ে এই ধাতু কেনার হার কিংবা চাহিদা কমেনি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু মানুষ নিরাপদ ভেবে স্বর্ণে বিনিয়োগ করে যান। এটি কিনে রাখলে লোকসানের ভয় নেই। ৫০ বছর আগে কেউ স্বর্ণ কিনে রাখলেও তা ভালো বিনিয়োগ হিসেবেই বিবেচিত। শেয়ারবাজার, ডলার বা অন্য কিছু- এই নিশ্চয়তা দেয় না।
স্বর্ণের নীতিমালার শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘প্রাচীনকাল থেকেই স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার মানুষের কাছে একটি মূল্যবান সম্পদ ও আভিজাত্যের অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। দ্রুত নগদ অর্থে রূপান্তরযোগ্য হওয়ায় স্বর্ণালংকার ব্যবহারের
পাশাপাশি উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নআয়ের মানুষ আপদকালীন সঞ্চয় হিসেবে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার ক্রয় এবং মজুদ করে থাকে। এছাড়া, উদ্বৃত্ত অর্থ, স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার ক্রয়ের মাধ্যমে সঞ্চিত রাখার প্রবণতাও মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।’
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে স্বর্ণের কেনাকাটা হয় গহনাসামগ্রীতে। এই শ্রেণির ক্রেতার কাছে গহনার চাহিদা ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে কমেছে ১৫ শতাংশেরও বেশি। বৈশ্বিকভাবে সোনার সরবরাহ কমেছে ৫ শতাংশের মতো। কিন্তু এর পরও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের আউন্সপ্রতি দামও বেড়েছে। আজ বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৯০৯ ডলার ৭৫ সেন্ট। ২০২২ সালের ২ নভেম্বর এর দাম ছিল ১ হাজার ৬২৯ ডলার ৮৮ সেন্ট।
স্বর্ণের দামের সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির একটি সম্পর্ক আছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে আগামী দিনগুলোতেও অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকি থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন। করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই অনিশ্চয়তার সময়টাই আসলে সোনার স্বর্ণসময়। যত বেশি অনিশ্চয়তা, তত বেশি স্বর্ণ বিক্রি। যত বেশি মূল্যস্ফীতি, তত বেশি স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি। ঐতিহাসিকভাবেও দেখা গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়েই স্বর্ণের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ে।
আর সব পণ্যের মতো স্বর্ণের দামও ঠিক হয় সরবরাহ ও চাহিদার ওপর। সরবরাহ আসে দুই ভাবে। নতুন উত্তোলন এবং পুরনো স্বর্ণ বিক্রি। স্বর্ণের খনিতে স্বর্ণ উত্তোলন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সাধারণত প্রতিবছর কত পরিমাণ স্বর্ণ উত্তোলন হবে, তার একটা হিসাব পাওয়া যায়। এই হিসাবে খুব একটা ওঠানামাও করে না। যেমন অতিমারির বছর ২০২০ সালেও স্বর্ণ উত্তোলন হয়েছিল আগের বছরগুলোর মতোই, ৩ হাজার ৪৭৬ টন। তবে সাধারণত স্বর্ণের সরবরাহ বাড়ে মূল্যবৃদ্ধির সময়টাতেই। দাম বাড়লে অনেকেই হাতে থাকা স্বর্ণ বেশি মুনাফার আশায় বিক্রি করে দেন, অনেকে আবার জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় মেটাতেও স্বর্ণ বিক্রি করেন।
আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিলের হিসাবে, সরবরাহকৃত মোট সোনার ৪৭ শতাংশই ব্যবহার করা হয় গহনায়, এর পরিমাণ ২ হাজার ২৩০ টন। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে সোনায় বিনিয়োগ করার জন্য বন্ডসহ নানা ধরনের আর্থিক সম্পদ আছে। অনিশ্চয়তার সময় এই খাতে বিনিয়োগ বাড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ভবিষ্যতের জন্য স্বর্ণের মজুত বাড়িয়ে দেয়। হিসাব অনুযায়ী, স্বর্ণের বার ও স্বর্ণের মুদ্রায় বিনিয়োগের পরিমাণ ১ হাজার টন। মোট সরবরাহের ২১ শতাংশই বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণের ব্যবহার হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের স্বর্ণের চাহিদা কত, এ নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই। স্বর্ণ নীতিমালায় বলা আছে, দেশে প্রতিবছর ২০ থেকে ৪০ মেট্রিক টন স্বর্ণের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। আবার বাজুস নেতা আনোয়ার হোসেনের ধারণা, প্রতিবছর সোনা চোরাচালানের আর্থিক পরিমাণ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। মূলত স্বর্ণের চোরাচালানের অর্থ লেনদেন হয় হুন্ডিতে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘স্বর্ণ কিনে কারও লোকসান হয়েছে বা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এমন নজির বিশ্বে নেই। একই কথা সাধারণ ভোক্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ কারণে করোনা মহামারি ও যুদ্ধের কারণে মানুষের আয় ও স্বাভাবিক বিনিয়োগ কমে গেলেও সামর্থ্যবানরা সোনা বা স্বর্ণালঙ্কার মজুতে বিনিয়োগ করছেন। শুধু বাংলাদেশে নয়, প্রায় সব দেশে বহুকাল ধরেই মানুষ নিরাপদ ভেবে স্বর্ণে বিনিয়োগ করছেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বর্ণে বিনিয়োগ বেশ জনপ্রিয়। গয়না হিসেবে এবং স্বর্ণের বার- দুইভাবেই বাংলাদেশে এ বিনিয়োগ হয়। এর বড় কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশে পুঁজিবাজারে অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের আস্থা অনেক কম। সে কারণে সাধারণ মানুষ স্বর্ণে বিনিয়োগ করেন। সাধারণ বিনিয়োগকারী অর্থাৎ স্বল্প আয়ের মানুষজনের কাছে স্বর্ণে বিনিয়োগের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, স্বর্ণের দাম বাড়লে বা কমলে তাতে আকাশ-পাতাল ফারাক হয় না। ফলে এটি ঝুঁকিমুক্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়া অল্প শিক্ষিত বিনিয়োগকারীরা মনে করেন পুঁজিবাজার বা সঞ্চয়পত্রের মত মুনাফার হারের দিকে নজর রাখার দরকার থাকে না স্বর্ণে বিনিয়োগের বেলায়। এছাড়া প্রয়োজনে স্বর্ণের একটি ব্যবহারিক উপযোগিতা রয়েছে। সেটাও এ খাতে বিনিয়োগ জনপ্রিয় হবার আরেকটি কারণ।’
এ প্রসঙ্গে বাজুসের সহ-সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ২০০৯ সাল থেকে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ডলারের দাম বেড়ে গেছে অনেক। এর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের দাম বেড়ে গেছে। আগে মানুষ ডলার রিজার্ভ হিসেবে রাখত। কিন্তু এখন স্বর্ণকে রিজার্ভ হিসেবে রাখতে নিরাপদ বোধ করছে। এজন্য স্বর্ণের দাম বাড়ছে।
স্বর্ণের দাম ও ভোক্তার আচরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুজন অর্থনীতিবিদ গবেষণা করেছেন। ‘গোল্ডেন ডিলেমা’ নামে ওই গবেষণায়ও দাবি করা হয়, ‘সংকটকালে সোনার দাম বাড়ে। ভয় বা আতঙ্কের কারণেই এটা হয়, যা ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর থেকে দৃশ্যমান হতে দেখা গেছে।’
সোনার কেনাকাটায় স্থানীয় বাজারে নিয়ন্ত্রণ খুব একটা না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে যাতে কোনো ‘বাবল’ তৈরি হতে না পারে সেজন্য সিলিং বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ১৯৯৯ সালে ওয়াশিংটন চুক্তি নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিও রয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বছরে ৪০০ টন বা ৪০০০ কেজির বেশি সোনা বিক্রি করতে পারবে না।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এখনো বিভিন্ন দেশের রিজার্ভের হিসাব তৈরির সময় সোনা মজুতের হিসাবটি বিবেচনায় রাখে।
বাজুস সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা বলেন, ‘বিশ্বে বিভিন্ন দেশের দায়িত্বশীল এজেন্ট ও বায়াররাই সোনার বাজারের মূল নিয়ন্ত্রক। বিশ্ব যখন স্থিতিশীল থাকে তখন সোনা কেনার প্রতি এদের চাহিদা কম থাকে। যখনই বিশ্ব সংকটের মুখোমুখি হয় তখন নিজ নিজ দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অনুমোদিত লোকাল এজেন্টরা ক্রেতা সেজে হাজার হাজার কেজি সোনা কিনে মজুত রাখেন। এভাবে সব দেশ যখন একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সোনা কেনার তৎপরতা চালায়, তখন চাহিদা ও জোগানের ফর্মুলা অনুযায়ীই সোনার দাম বাড়তে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘সোনার মজুত দেশকে নিরাপদ রাখে। ফলে এই ভয়-আতঙ্ক সামাল দিতেই যেকোনো সংকটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি অংশ সংরক্ষণ করে বলে সার্বিকভাবে সোনা কেনার প্রবণতা বাড়ে। আবার যাদের মজুত বেশি আছে তারা এই সময়ে বাড়তি দামে বিক্রিও করেন। করোনার পর যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও এখন তাই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। যার প্রভাব দেশেও পড়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘আমরা যে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করি, বিদেশে ধনীদের অনেকেই এই বিনিয়োগ করেন সোনার মার্কেটে। বিশ্ববাজার বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, সামনের দিনগুলোতে কাগজের মুদ্রার দাম কমে যাবে এবং স্বর্ণ ও হীরার দাম বাড়বে। কারণ হচ্ছে এগুলো সলিড অ্যাসেট।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ঘটছে। মূল্যস্ফীতির আশ্রয় হচ্ছে গোল্ড হোল্ড করা। সারা পৃথিবীতে সবাই তা-ই করে। সলিড অ্যাসেটের মধ্যে স্বর্ণ হচ্ছে প্রথম পছন্দ।’
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ওঠানামা ছাড়াও ডলারের দাম কম-বেশির কারণে স্বর্ণের দাম বাড়ে বা কমে। এ ছাড়া চাহিদার বিপরীতে জোগান কম-বেশি থাকলে, উৎসব আমেজের আগেপরে দাম বাড়ানো-কমানো হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি দাম কমে বা বাড়ে তাহলে দেশে ব্যবসায়ীরা তা কয়েক দিন পর্যবেক্ষণ করেন। পরে বৈঠকের মাধ্যমে দাম নতুন করে নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয় বাজুস। এ ছাড়া ডলারের দামের সাথেও স্বর্ণের দাম ওঠানামা করে। বিশ্ব বাজারে ডলারের দাম বাড়তি থাকলে স্বর্ণের দাম নিম্নমুখী হয়। আবার এমনো দেখা যায়, ডলার নিম্নমুখী হলে স্বর্ণের দাম হয় ঊর্ধ্বমুখী।
সোনা ব্যবসায়ী প্রণব সাহা বলেন, ‘স্বর্ণের গয়নার চেয়ে স্বর্ণের বারে বিনিয়োগ লাভজনক। কারণ হচ্ছে স্বর্ণের গয়না বিক্রি করতে হলে ২০ শতাংশ মূল্য কেটে রাখা হয়, আর বদল বা পরিবর্তন করলে ১০ শতাংশ কেটে রাখা হয়। কিন্তু স্বর্ণের বারে সেটা হবে না। অন্যদিকে, স্বর্ণের বার প্রতিদিন আন্তর্জাতিক বাজারের দর অনুযায়ী কেনাবেচা করা যায়। সাধারণত গয়নার দোকানে স্বর্ণের বার কিনতে পাওয়া যায় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বৈধ স্বর্ণ আমদানিকারক রয়েছেন, যাদের কাছ থেকে স্বর্ণের বার কেনা যায়।’
গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে বাজুস ফেয়ার উদ্বোধন করে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাজুস সভাপতি সায়েম সোবহান আনভীর বলেন, ‘বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের খাত বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ ক্ষেত্র। সবাই যদি স্বর্ণকে সম্পদ হিসেবে চিন্তা করেন তাহলে আগামী ২০ বছরে কী হতে পারে? এখন ৯০ হাজার, ৯ লাখও হতে পারে এটা। স্বর্ণ এবং ভূমিতে বিনিয়োগ পৃথিবীতে কখনো লোকসান হয়নি। যে বুদ্ধিমান, যার অলস অর্থ আছে… আপাতত বাংলাদেশে দুইটা জায়গা আছে নিরাপদ বিনিয়োগের। একটা হলো জমি, যা গত ২০ বছরেও দাম কমেনি। আর একটা হলো স্বর্ণ, এটাও গত ২০ বছরে দাম কমেনি।’
স্বর্ণ কেনা যে নিরাপদ বিনিয়োগ, তার আরেক প্রমাণ- বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ কেনা বাড়িয়েছে। ২০২২ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ১ হাজার ১৩৬ টন সোনা মজুত করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫০ টন বেশি। গত মার্চ মাসে ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা মজুতের এ পরিমাণ ১৯৬৭ সালের পর সর্বোচ্চ।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজারবিশ্লেষক লুইস স্ট্রিট বলেন, ‘বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বেশি পরিমাণ সোনা মজুতের ওপর জোর দিচ্ছে। এ কারণে সোনা কেনার পরিমাণও বেড়েছে। গত বছর ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ সোনা কিনেছে, তা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।’
সেই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনা কেনা বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
২০২২ সালে সবচেয়ে বেশি সোনা কিনেছে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের তথ্যানুসারে, ২০২২ সালে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৪৮ মেট্রিক টন সোনা কিনেছে। এরপরই আছে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তারা কিনেছে ৬২ মেট্রিক টন। এরপর আছে যথাক্রমে মিসর, কাতার, ইরাক, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তারা কিনেছে যথাক্রমে ৪৭, ৩৩, ৩৪, ৩৩ ও ২৫ মেট্রিক টন সোনা।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত বছর বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যত সোনা কিনেছে, তার দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৭৪১ টন সোনা বিক্রির রেকর্ড নেই। কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব কিনেছে, তার নথি নেই।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সম্ভবত এই সোনা কিনেছে। মূলত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে থোড়াই কেয়ার করে বিশ্ব বাণিজ্যকে ডলারের আধিপত্য থেকে বাঁচানোর জন্য তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাজুস সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘চীন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই স্বর্ণ মজুত করে রাখা হচ্ছে। স্বর্ণ মজুতের কারণ হচ্ছে- সবাই জানে স্বর্ণ মজুত করলে যত দিন যাবে দাম বাড়বে ছাড়া কমবে না। সভ্যতা যতদিন আছে, মানুষ যতদিন আছে- স্বর্ণ ততদিন কাজে লাগবেই। তাই স্বর্ণ মজুদ করে রাখা হচ্ছে। কারণ বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে স্বর্ণ। এ কারণে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে গেছে, কিন্তু সেই তুলনায় খনি থেকে স্বর্ণ তোলা হচ্ছে কম। যেটুকু তোলা হচ্ছে তা-ও অনেক গভীর থেকে তোলা হচ্ছে। এসব কারণে স্বর্ণের দাম বেড়ে গেছে। আগে যেমন সহজলভ্য ছিল স্বর্ণ, এখন আর তেমন নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বর্ণ এখন শুধু গহনা হিসেবে নয়, আরও নানা কাজে ব্যবহার হচ্ছে। ইলেকট্রোপ্লেটিংয়ের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উপকরণ হচ্ছে স্বর্ণ। স্বর্ণের ভেতর দিয়ে ইলেকট্রন খুব ভালোভাবে যেতে পারে। অন্য কোনো মেটাল দিয়ে এত সহজভাবে যেতে পারে না। স্বর্ণের এই ইলেকট্রোপ্লেট এখন বিমানের ইঞ্জিন, মিসাইল, ড্রোন, স্যাটেলাইট, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সরঞ্জাম, গাড়ির ইঞ্জিনসহ অনেক দামি দামি ইলেকট্রনিক্স পণ্যে ব্যবহার হচ্ছে। আগে এগুলোয় ইউরেনিয়াম, প্লাটিনাম ব্যবহার করা হতো। এখন নতুন খাতে স্বর্ণের ব্যবহার হওয়ায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের ব্যবহার বেড়ে গেছে।’
শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, ‘অলংকার ছাড়াও স্বর্ণ এক ধরনের চলমান কারেন্সি হিসেবে ব্যবহার হয়। মানুষের কাছে যখন টাকা থাকে, স্বর্ণ কিনে রাখে। যখন টাকার প্রয়োজন হয় তখন স্বর্ণ বিক্রি করে টাকায় পরিণত করে। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের জন্য সুবিধাজনক খাত স্বর্ণ।’

